বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ঘোষিত ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের কাজ ২০টি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় দিয়ে শুরু হবে শিগ্গিরই। পর্যায়ক্রমে প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের জন্য পৃথক পৃথক নেতাকে দায়িত্ব দেওয়া হবে। প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের ছায়া মন্ত্রীর সঙ্গে থাকবেন প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি। যার প্রত্যেকটি একটি টিম হিসাবে কাজ করবে এবং সরকারের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেবে। পরামর্শ না মানলে প্রতিবাদ জানাবে।

ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের কাজ চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে জানান জামায়াতের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান নিজেই। বুধবার সংসদ ভবনের এলডি হলে যুগান্তরের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যেমন ছায়া মন্ত্রিসভা আছে, আমাদেরটা তা থেকে একটু ব্যতিক্রম হবে। আমরা সরকারের ভুল ধরিয়ে দেব, প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেব। তাতে দেশ লাভবান হবে। কবে নাগাদ সেটা প্রকাশ করা হবে-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, শিগ্গিরই জানতে পারবেন।

দলের আমিরের সরাসরি তত্ত্বাবধানে এই মন্ত্রিসভা গঠনের কাজ চলছে। গত সপ্তাহে দলের নির্বাহী কমিটিতেও বিষয়টি আলোচিত হয়েছে। এই মন্ত্রিসভার একটি কাঠামো দাঁড় করানো হবে প্রথমে ১৮ থেকে ২০টি মন্ত্রণালয় দিয়ে। এমনটি জানিয়েছে জামায়াতের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র।

সূত্রমতে, প্রধানমন্ত্রী ও তার কার্যালয়ের কার্যক্রম সমান্তরাল হিসাবে বিরোধীদলীয় নেতা নিজেই পর্যবেক্ষণ করবেন। অবশ্য তার অধীনে থাকবে বড় এক্সপার্ট টিম। এছাড়াও যেসব মন্ত্রণালয়কে জামায়াত প্রথম পর্যায়ে সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছে তার মধ্যে রয়েছে পররাষ্ট্র; স্বরাষ্ট্র; স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়; শিক্ষা ও প্রাথমিক শিক্ষা; স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ; জনপ্রশাসন; কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ; অর্থ ও পরিকল্পনা; বাণিজ্য; তথ্য ও সংস্কৃতি; সড়ক পরিবহণ ও সেতু; নৌপরিবহণ; আইন ও বিচার; বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ; সমাজকল্যাণ; মহিলা ও শিশু; দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ; ধর্ম; ডাক টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়।

সূত্রমতে, জামায়াতে ইসলামীর সিনিয়র নেতারা মূল দায়িত্বে থাকবেন। সব সংসদ-সদস্যকে ছায়া মন্ত্রিসভার কোনো-না-কোনো টিমে যুক্ত করা হবে। সংসদ-সদস্য হননি-এমন শীর্ষনেতারাও এর সঙ্গে যুক্ত হবেন।

বর্তমান ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষে প্রধান বিরোধী দল হওয়ার পর থেকেই জামায়াতে ইসলামী ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের কথা বলে আসছে। সরকারি দলের পক্ষ থেকে বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখা হয়। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ বিরোধী দলের এ প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছায়া মন্ত্রিসভা আছে। তারা সরকারকে পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করে থাকে।

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ শনিবার যুগান্তরকে বলেন, ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের কাজ আমরা প্রায় চূড়ান্ত করে ফেলেছি। সেটা জামায়াত আমির আপনাদের বলেছেন। তিনি বলেন, সরকারের মন্ত্রণালয়গুলো যে ফরমেটে আছে, সেই ফরমেটেই আমরা ছায়া মন্ত্রিসভার চিন্তা করেছি।

দলের আরেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের যুগান্তরকে বলেন, বাংলাদেশে যেহেতু কনসেপ্টটা নতুন, তাই আমরা পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করছি। ছায়া মন্ত্রিসভার কাজ হবে মূলত প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ছায়ামন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর। তার অধীনে একটা ভালো বিশেষজ্ঞ টিম থাকবে। তারা সরকারের কার্যক্রম মনিটর করবেন এবং অসংগতিগুলো ধরিয়ে দেবেন। প্রয়োজনে বিবৃতি দেবেন বা অন্যভাবে সরকারের দৃষ্টিতে আনবেন। এর মাধ্যমে সরকারকেই সহযোগিতা করা হবে।

ছায়া মন্ত্রিসভার ধারণা পুরোনো হলেও বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন সংযোজন। একটি গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচিত সরকারকে জবাবদিহির মধ্যে রাখতে ‘ছায়া মন্ত্রিসভার’ ধারণাটি এসেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, এটা একটি ভালো উদ্যোগ। পৃথিবীর অনেক দেশে আছে। এটা যদি বিরোধী দল করতে পারে, তাহলে প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী সংসদে জবাবদিহির আওতায় আসবেন। কারণ, ছায়ামন্ত্রীরা তাদের নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের সরকারি কাজ পর্যবেক্ষণ বা মনিটর করবেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. আব্দুল লতিফ মাসুম বলেন, ছায়া মন্ত্রিসভা সংসদীয় গণতন্ত্রে একটি উচ্চতর বিষয়। ব্রিটেনসহ অনেক দেশ শত বছর এটা প্র্যাকটিস করছে। আমরা ৫৫ বছর হলো স্বাধীন হয়েছি। কিন্তু ছায়া মন্ত্রিসভা কোনো বিরোধী দল কখনোই করেনি। আমরা দেখেছি হয় গৃহপালিত বিরোধী দল অথবা চরম বৈরিতা। জামায়াতে ইসলামীর এ উদ্যোগ ভালো এবং ফলপ্রসূ হবে বলে জাতি আশা করে।

জামায়াতের ছায়া মন্ত্রিসভায় কে কোন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকবেন, তা এখনো নির্দিষ্ট করে কেউ কিছু বলছেন না। তবে দলীয় সংসদ-সদস্যদের প্রায় সবাই এতে যুক্ত হবেন বলে জানান এহসানুল মাহবুব যুবায়ের। এমপি নন-এমন নেতারাও থাকতে পারেন এ তালিকায়।

সূত্রমতে, গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলোর ছায়া মন্ত্রীর দায়িত্ব পেতে পারেন দলের নায়েবে আমির এটিএম আজহারুল ইসলাম এমপি, অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপি, ডা. সৈয়দ আব্দুলাহ মোহাম্মদ তাহের এমপি, দলের সেক্রেটারি জেনারেল সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম মাছুম, রফিকুল ইসলাম খান এমপি, সাবেক এমপি হামিদুর রহমান আযাদ, আব্দুল হালিম, এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, অ্যাডভোকেট মোয়াজ্জেম হোসেন হেলাল, সাইফুল আলম খান মিলন এমপি, শহজাহান চৌধুরী এমপি, অধ্যক্ষ ইজ্জত উল্লাহ এমপি, নুরুল ইসলাম বুলবুল এমপি, ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি, মাসুদ সাঈদী এমপি, ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন, মওলানা আবুল কালাম আজাদ এপি, মাহবুবুর রহমান বেলাল এমপি, কর্নেল (অব.) আব্দুল বাতেন এমপি, অ্যাডভোকেট কামাল হোসেন এমপি, সালাহ উদ্দিন আইয়ুবী এমপি, গাজী নজরুল ইসলাম এমপি, শ্রমিক নেতা অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান, ব্যারিস্টার মাহবুবুল আলম সালেহী প্রমুখ।

এছাড়াও থাকতে পারেন জুলাই যুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী ছাত্রশিবিরের অন্তত দুজন সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি এবং কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচিত ছাত্র সংসদের নেতা।