কুমিল্লা নগরীতে জলাবদ্ধতার নেপথ্যে ঐতিহ্যবাহী কান্দিখালের অবৈধ দখল। নগরের জিরো পয়েন্ট থেকে গুরুত্বপূর্ণ এলাকার পানি অপসারণের একমাত্র ভরসা এ খাল। একসময়ের খরসে াতা এ খাল এখন শুধু কাগজে-কলমেই রয়েছে। সেখানে রয়েছে একটি সরু ড্রেন। ৯৫ ফুট প্রস্থের খাল এখন ১৫ ফুটে পরিণত হয়েছে। ফলে একটু বৃষ্টিতেই কান্দিরপাড়, বাদুরতলা, পুলিশ লাইনস, স্টেডিয়াম, বাগিচাগাঁও, শিক্ষাবোর্ড, ভিক্টোরিয়া কলেজ, সরকারি মহিলা কলেজ, টমছমব্রিজসহ আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় জলজট সৃষ্টি হচ্ছে। এদিকে খালটির দখলে জড়িত ৪০ দখলদারের বিরুদ্ধে এক যুগেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, শত বছর ধরে কুমিল্লা শহরের পানি প্রবাহের অন্যতম মাধ্যম ছিল কান্দিখাল। ৫ কিলোটার দৈর্ঘ্যরে খরস্রোতা এ খাল উত্তর চর্থার নবাববাড়ি চৌমুহনী এলাকা এবং নোয়াগাঁও হয়ে সদর দক্ষিণ উপজেলার পুরাতন ডাকাতিয়া নদীতে মিশেছে। সিএস নকশা অনুযায়ী একসময় কান্দিখালের প্রস্থ ৪৫ থেকে ৯৫ ফুট থাকলেও, অবৈধ দখলের কারণে তা বর্তমানে মাত্র ১৫ থেকে ২০ ফুটে নেমে এসেছে। এতে নগরীতে ক্রমেই জলাবদ্ধতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। স্থানীয়রা জানায়, কান্দিখাল আস্তে আস্তে দখলের পর থেকেই নগরীর জলাবদ্ধতা শুরু হয়। এদিকে এক যুগ ধরে কান্দিখালের দখলদারদের নাম প্রকাশ হচ্ছে। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে আইনগত কোনো ব্যবস্থা নেই। সবশেষ ২০২১ সালে তাদের নোটিশ দেওয়া হলেও কর্ণপাত করেনি দখলদার চক্র। কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের তথ্যানুযায়ী পানি উন্নয়ন বোর্ড খালের প্রায় ২ শতক জায়গার ওপর বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণ করেছে। সড়ক ও জনপথ (সওজ) অফিস খালের জায়গা দখল করে বাউন্ডারি তৈরি করেছে। শাকতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় খালের ১.৩২ শতক ভূমি দখল করে বিদ্যালয়ের প্রথম তলার পাকা ভবন নির্মাণ করেছে। একটি আঞ্চলিক সরকারি দপ্তর খালের জায়গা সীমানার ভেতরে অন্তর্ভুক্ত করেছে। এছাড়া নগরীর কান্দিরপাড় এলাকায় বহুতল ভবন, বাণিজ্যিক এবং আবাসিক স্থাপনা নির্মাণ করছেন ৩৬ প্রভাবশালী ব্যক্তি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। এতে ওই খাল দিয়ে পানি প্রবাহ সীমিত হয়ে যাওয়ায় এটি এখন বর্জ্য ফেলার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। সচেতন নাগরিকদের মতে, কান্দিখালের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করলেই নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসন হবে।
নগরীর প্রবীণ নাগরিক জহিরুল হক দুলাল বলেন, কান্দিখাল দিয়ে একসময় বাণিজ্যিক নৌযান চলাচল করত। আজ থেকে ৩০ বছর আগে আমরা এই নগরীতে কোনো জলাবদ্ধতা দেখিনি। এখন খালটি দখল হয়ে যাওয়ার কারণে পানি সরতে পারছে না। টমছমব্রিজ এলাকার বাসিন্দা আবুল বাশার বলেন, চারটি সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং ৩৬ জন প্রভাবশালী ব্যক্তি খালটি দখল করেছে। সিটি করপোরেশন এ পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি। মুষ্টিমেয় ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে গোটা নগরবাসী এভাবে জিম্মি থাকবে, তা হতে পারে না। অবিলম্বে কান্দিখাল দখলমুক্ত করতে হবে।
কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ইউসুফ মোল্লা টিপু বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং নগরবাসীর স্বার্থে কান্দিখালের ওপর থেকে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করতে আমরা কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছি। জলাবদ্ধতা নিরসনে অন্যান্য ড্রেনেজ এবং খালগুলোও সচল করা হচ্ছে।
টানা বর্ষণে কুমিল্লায় এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের দুর্ভোগ : এদিকে টানা বর্ষণে কুমিল্লা নগরীতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। এতে এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েন। অনেক পরীক্ষার্থী নির্ধারিত সময়ে কেন্দে প্রবেশ করতে পারেননি। যদিও কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আহসান পারভেজ বলেছেন, কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ বিষয়টি সহানুভূতির সঙ্গে দেখেছে। সোমবার মাত্র তিন ঘণ্টায় ১০৭ মিলিমিটার বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে নগরীর প্রধান সড়ক, অলিগলি ও আবাসিক এলাকা। কোথাও হাঁটুসমান, কোথাও কোমরসমান পানি। সকাল ১০টায় সদর হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, জরুরি বিভাগ ও রোগীদের শয্যার নিচেও পানি উঠেছে। এদিকে সোমবার সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের নৌকায় করে নিরাপদে পরীক্ষা কেন্দ্রে পৌঁছে দিয়েছেন সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ইউসুফ মোল্লা টিপু। কুসিক কর্মচারীদের সঙ্গে নিয়ে তিনি এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নেন।
প্রধানমন্ত্রীর ফোনে এইচএসসি পরীক্ষার কেন্দ্র পরিবর্তন : কুমিল্লায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের টেলিফোনে জলাবদ্ধ এইচএসসি পরীক্ষার কেন্দ্র পরিবর্তন করা হয়েছে। সোমবার ভারী বর্ষণে সৃষ্ট জলাবদ্ধতার কারণে কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজের এইচএসসি পরীক্ষাকেন্দ্র পরিবর্তন করা হয়। একই সঙ্গে নির্ধারিত সময়ে কেন্দ্রে পৌঁছাতে না পারা শিক্ষার্থীদের জন্য পরীক্ষার সময় ৩০ মিনিট বাড়ানো হয়। কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক মো. শফিকুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. ইউসুফ মোল্লা টিপু বলেন, জলাবদ্ধতার মধ্যে নৌকায় করে পরীক্ষার্থীদের কেন্দ্রে যাওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে আসে। পরে তিনি পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজ নেন। পরিস্থিতি জানানো হলে পরীক্ষাকেন্দ্র পরিবর্তন এবং পরীক্ষার্থীদের সুবিধার্থে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেন। পরে বোর্ড কর্তৃপক্ষ অতিরিক্ত ৩০ মিনিট সময় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।








