একবার, দুইবার, তিনবার, তাই বলে চতুর্থবারও! এক বিশ্বকাপে এতগুলো ম্যাচে কামব্যাক কে কবে দেখেছে? আদৌ কি হয়েছে কখনো?

আর্জেন্টিনা, লিওনেল মেসির ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা এবারের বিশ্বকাপে সেটাই করে দেখালো। সেই পুঁচকে কেপ ভার্দে থেকে শুরু করে মিশর, সুইজারল্যান্ড হয়ে ইংল্যান্ড! হয়তো খেলার টেম্পো, না হয় স্কোর- কিছু না কিছুতে আর্জেন্টিনা পিছিয়েই ছিলো, তবে ম্যাচ শেষ করেছে জয়ী দল হিসেবেই।

টানা চারটি এমন প্রত্যাবর্তন ভাষায় ব্যাখ্যা করা সত্যিই কঠিন। মেসির মহত্ত্ব বোঝাতে যেমন শব্দ কম পড়ে যায়, তেমনি এবার তার দল আর্জেন্টিনাও যেন অসম্ভবকে সম্ভব করার নতুন এক অভিধান লিখছে। ম্যাচের আগে ইংল্যান্ডের সাবেক ফুটবলাররা আর্জেন্টিনাকে নিয়ে কম কটুক্তি করেনি। তাদের একের পর এক কটাক্ষের জবাবও মেসি দিয়েছেন নিজের ফুটবল দিয়েই। তিনি বরাবরই এভাবেই উত্তর দেন- আর এবার তার পুরো দলও যেন সেই ভাষাটাই শিখে নিয়েছে।

শুরুতে ধারণা করা হচ্ছিল, কোয়ার্টার ফাইনালে পর্তুগাল আর সেমিফাইনালে ব্রাজিলের মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা; কিন্তু পর্তুগাল গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হতে না পারা আর ব্রাজিলের আগেভাগেই বিদায় নেওয়ায় সেই সম্ভাবনা আর বাস্তব হয়নি। তখন নিন্দুকেরা বলতে শুরু করল, আর্জেন্টিনার সেমিফাইনালে ওঠার পথ নাকি ‘মামাবাড়ি যাওয়ার’ মতো সহজ!

অথচ যাদের এতটা হালকাভাবে দেখা হয়েছিল, সেই কেপ ভার্দে, মিশর আর সুইজারল্যান্ডই স্ক্যালোনির দলকে প্রতিটি ম্যাচে কঠিন পরীক্ষায় ফেলেছিল। আর্জেন্টিনা সব সময় দাপুটে ফুটবল খেলেছে- এ কথা হয়তো বলা যাবে না, কিন্তু প্রতিবারই শেষ পর্যন্ত লিখেছে অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের গল্প।

Messi

সেমিফাইনালে প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড। সুইজারল্যান্ডকে হারানোর পর থেকেই ইংল্যান্ডের সাবেক ফুটবলারদের আত্মবিশ্বাস যেন আকাশ ছুঁয়েছিল। কেউ বলছিলেন, এই আর্জেন্টিনা ইংল্যান্ডের সামনে দাঁড়াতেই পারবে না; কেউ আবার দাবি করছিলেন, মেসিকে ‘ঘুম পাড়িয়ে’ বাড়ি পাঠানো হবে। ম্যাচ শুরু হওয়ার আগেই যেন তারা নিজেদের ফাইনালে তুলে দিয়েছিলেন।

এমনিতেই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড দ্বৈরথ মানেই আলাদা উত্তাপ। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে ম্যারাডোনার ‘হাত দিয়ে করা গোল’ আর ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’, ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধ- পুরোনো সব ইতিহাস নতুন করে আলোচনায় ফিরেছিল। তার সঙ্গে ইংল্যান্ডের সাবেকদের একের পর এক দম্ভোক্তি ম্যাচের আবহকে আরও তপ্ত করে তোলে।

বিপরীতে আর্জেন্টিনা ছিল অস্বাভাবিক নীরব- বড় কোনো ঝড়ের আগে যেমনটা দেখা যায়। এমনকি ১৯৮৬ বিশ্বকাপজয়ী সেই নীল জার্সি পরার অনুমতিও ফিফার কাছ থেকে নিয়ে এসেছিল তারা। শেষ পর্যন্ত মাঠে মেসি-মার্টিনেজরা যেন শুধু জিতেই ক্ষান্ত হননি, ১৯৮৬ সালের সেই স্কোরলাইনও নতুন করে ফিরিয়ে এনেছেন।

ম্যাচের শুরু থেকেই যেন ফুটবলের চেয়ে ট্যাকলের লড়াইটাই বেশি জমে উঠেছিল। প্রথমার্ধে দুই দল মিলিয়ে ফাউল করে ১৯টি। প্রতিপক্ষের স্বাভাবিক খেলা ভাঙার পাশাপাশি নিজেদের ছন্দে ফেরার কৌশলও ছিল হয়তো। তবে আসল নাটকটা জমে দ্বিতীয়ার্ধে। ৫৫তম মিনিটে এগিয়ে যায় ইংল্যান্ড।

কিন্তু সেই গোলই যেন জাগিয়ে তোলে আর্জেন্টিনাকে। এই বিশ্বকাপে পিছিয়ে না পড়লে যেন তাদের গল্পই জমে না! গোল হজমের পর মুহূর্তেই বদলে যায় ম্যাচের চেহারা। অন্যদিকে এক গোলের লিড ধরে রাখতে টমাস টুখেল একের পর এক রক্ষণাত্মক বদলি আনতে থাকেন।

ফরোয়ার্ড তুলে ডিফেন্ডার নামালেও, ৫ ডিফেন্ডার নিয়ে আর্জেন্টিনার আক্রমণের ঢেউ থামাতে পারেননি। বেশ কয়েকবার সমতায় ফেরার দারুণ সুযোগও এলো, তবে দারুণ সব সেভ করে বাধা হয়ে দাঁড়ালেন ইংলিশ গোলরক্ষক জর্ডান পিকফোর্ড। আর্জেন্টিনার গোল হজম থেকে জয়সূচক গোল পাওয়া, এই ৪৭ মিনিটে তাদের দখলে বল ছিল ৮৮ শতাংস সময়ে। এই পরিসংখ্যান আরও স্পষ্ট করে গোল হজম করার পর আর্জেন্টিনা ঠিক কি পরিমাণ দাপট দেখিয়েছে।

প্রথমার্ধে ৪-৫-১ ফরমেশনে খেলতে নেমে ইংল্যান্ড কার্যত ম্যাচের বাইরে রেখেছিল লিওনেল মেসিকে। বল পেলেই তাকে ঘিরে ধরছিল একাধিক খেলোয়াড়, ফলে আর্জেন্টিনার আক্রমণের ধারও কমে গিয়েছিল। কিন্তু ইংল্যান্ড রক্ষণে গুটিয়ে যেতেই বদলে যায় সবকিছু। মাঝমাঠ ও ডি-বক্সের সামনে বাড়তি জায়গা পেয়ে ভয়ংকর হয়ে ওঠেন মেসি। শেষ আধাঘণ্টায় তাকে দেখে মনে হচ্ছিল, যেন অনুশীলনের মাঠে নিজের মতো করে পাস বিলিয়ে যাচ্ছেন। এতটা জায়গা দেওয়ার মাশুলও চুকাতে হয়েছে ইংল্যান্ডকে। ৮৫তম মিনিট থেকে যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিট- মাত্র আট মিনিটের ব্যবধানে দুটি গোল আদায় করে নেয় আর্জেন্টিনা, দুটোরই কারিগর মেসি।

Messi

৮৫তম মিনিটে সমতায় ফেরে আর্জেন্টিনা। ডান দিক থেকে মেসির পাস ডি-বক্সের অনেকটা বাইরে পেয়ে জোরাল শট নেন এনজো ফার্নান্দেজ, বল হাওয়ায় ভেসে খুঁজে নেয় ঠিকানা। যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে জয়সূচক গোলও পেয়ে যায় আর্জেন্টিনা। ডান দিকে বল পেয়ে ডি-বক্সে দারুণ ক্রস বাড়ান মেসি এবং অরক্ষিত লাউতারো মার্টিনেজ নিখুঁত হেডে গড়ে দেন ব্যবধান।

এই দুই অ্যাসিস্টের পর এবারের বিশ্বকাপে মেসির ঝুলিতে এখন ৮ গোল ও ৪ অ্যাসিস্ট। গোল্ডেন বুটের দৌড়েও সবার ওপরে। বিশ্বকাপ ইতিহাসেও নতুন উচ্চতায় উঠে গেছেন তিনি- ২১ গোল ও ১২ অ্যাসিস্ট, দুটোই এখন সর্বকালের সর্বোচ্চ। বয়স ৩৯, অথচ মাঠে তাকে দেখে সেটা বিশ্বাস করার উপায় নেই।

প্রায় দুই দশক ধরে একই ধারাবাহিকতায় বিশ্বের সেরা মঞ্চে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে চলেছেন তিনি। হয়তো এ কারণেই মেসিকে ঘিরে বিস্ময় কখনো ফুরায় না। যত বড় সমালোচকই হন না কেন, একসময় না একসময় তার ফুটবলের সামনে মাথা নত করতেই হয়। এখানেই ৫ ফুট ৫ ইঞ্চির এই ফুটবল জাদুকরের আসল মাহাত্ম্য।

ক্যারিয়ারে জেতেননি- এমন ট্রফি খুঁজে পাওয়া কঠিন। গত আসরেই পূরণ করেছেন বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নও। তবু ইংল্যান্ডকে হারিয়ে শেষ বাঁশির পর তার উদযাপন বলে দেয়, সাফল্যের ক্ষুধা এখনও একটুও কমেনি। হয়তো এই অদম্য জয়ের তাড়নাই তাকে আজকের লিওনেল মেসি বানিয়েছে।

ম্যাচের আগে জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ বলেছিলেন, সবাই ‘হ্যান্ড অব গড’ দেখেছে, এবার দেখবে ‘ঈশ্বরের বাঁ পা’। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ম্যাচের ভাগ্য লিখল মেসির তথাকথিত দুর্বল ডান পা। বক্সের সামনে মুহূর্তের মধ্যে বল নিয়ন্ত্রণে এনে ডান পায়ে এমন নিখুঁত এক ক্রস তুললেন, যা লাউতারো মার্টিনেজের শুধু জালে পাঠিয়ে দেওয়াই বাকি ছিল। সেই মুহূর্ত যেন আরেকবার মনে করিয়ে দিল- লিওনেল মেসির অভিধানে ‘দুর্বল পা’ বলে আসলে কিছু নেই।

আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড ম্যাচ শেষে খেলোয়াড়রা একটি ব্যানার প্রদর্শন করেন, যেখানে লেখা ছিল ‘Las Malvinas son Argentinas’- বাংলায় যার অর্থ, ‘মালভিনাস আর্জেন্টিনার।’

এই বার্তার মাধ্যমে তারা ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ (যা আর্জেন্টিনায় লাস মালভিনাস নামে পরিচিত) নিয়ে আর্জেন্টিনার দীর্ঘদিনের সার্বভৌমত্বের দাবির প্রতি সমর্থন জানালেন। যদিও দ্বীপপুঞ্জটি বর্তমানে ব্রিটিশ ওভারসিজ টেরিটরি হিসেবে যুক্তরাজ্যের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, বিষয়টি দুই দেশের মধ্যে বহু দশকের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু। এই ঘটনা আরও একবার প্রমাণ করলো এই ম্যাচটা শুধু মাঠেই সীমাবদ্ধ ছিল না, আবার মুখোমুখি হলেও থাকবে না।

এসকেডি/আইএইচএস/