টানা এক সপ্তাহের বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে দেশের বিভিন্ন এলাকা তলিয়ে গেছে। লাখো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। কক্সবাজারের কুতুবদিয়া ও পেকুয়া উপজেলায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়নি পর্যাপ্ত শুকনো খাবার। এতে মানুষ জীবন পার করছে খেয়ে না খেয়ে। ভোলার মনপুরাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে খাবার সংকট দেখা দেওয়ায় মানুষের মাঝে ক্ষোভ বাড়ছে। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে এখনো পানি রয়েছে। নদীভাঙনে বিলীন হয়েছে ঘরবাড়ি। বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়িতে সেতুধস এবং মাগুরার শালিকায় কালভার্ট ভেঙে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়কে নৌকায় চলাচল করছে মানুষ। চট্টগ্রামে ১০ হাজার মৎস্যঘের, পুকুর, ডোবা, জলাশয় ডুবে মাছ ভেসে গিয়ে ৯১ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। জেলায় সেনাবাহিনী উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতা শুরু করেছে। আনোয়ারায় উপকূলে ভেসে এসেছে অজ্ঞাতনামা এক লাশ। রাঙ্গুনিয়ায় কর্ণফুলী নদীতে স্রোতে ভেসে নিখোঁজ রয়েছে যুবক। সাতকানিয়ায় বন্যার পানিতে ডুবে মারা গেছে এক শিশু। দুর্গত এলাকায় স্বাভাবিক মৃত্যু হলেও পারিবারিক কবরস্থানেও দাফনের জায়গা হচ্ছে না তাদের। ভেলায় ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে দূরবর্তী কোনো উঁচু জায়গায়।

রাঙামাটির কয়েকটি এলাকায় বন্যা পরিস্থিতি উন্নতি হলেও বিলাইছড়িতে হয়েছে অবনতি। খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রে যারা আশ্রয় নিয়েছেন, তাদের অনেকেই বাড়ি ফিরে গেছেন। শেরপুরে পাহাড়ধসে যানচলাচল ব্যাহত হয়েছে। সিলেটের সুরমা-কুশিয়ারার পানি কমছে, বাড়ছে সারি-গোয়াইনের। মৌলভীবাজারে নদীভাঙনে পানিবন্দি ২৬ হাজার মানুষ। সেখানে ত্রাণ অপ্রতুল। ফরিদপুর শহরের কয়েকটি সড়কে সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা। চাঁদপুরের মতলব সেতুর অ্যাপ্রোচ সড়ক ভেঙে গর্ত দেখা দিয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, বৃষ্টির এ ধারাবাহিকতা আরও দুদিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অব্যাহত থাকতে পারে। তবে মঙ্গলবার থেকে বৃষ্টির তীব্রতা কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। স্টাফ রিপোর্টার, ব্যুরো ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-

কুতুবদিয়া, চকরিয়া ও রামু (কক্সবাজার) : কুতুবদিয়া-পেকুয়ার বেঁড়িবাধ ভেঙে ঘরবাড়ি পানিতে তলিয়ে গেছে। বৃষ্টি কমলেও জোয়ার-ভাটায় পানি কমছে আর বাড়ছে। মানুষ খেয়ে-না-খেয়ে জীবন পার করছেন। কিন্তু দুই উপজেলায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়নি পর্যাপ্ত শুকনো খাবার। এতে চরম কষ্টে আছে মানুষ। কুতুবদিয়া উপজেলার অধিকাংশ গ্রাম এখনো পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে। সাধারণ মানুষের চলাচলের একমাত্র ভরসা নৌকা। উজানটিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দারা বলেন, শুক্রবার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসেছিলেন, কিন্তু সাধারণ মানুষের কোনো কথা শুনেননি। আমাদের ঘরবাড়ি কিছুই নেই, সব পানিতে ডুবে গেছে। আমারা রাতে ঘুমাতে পারছি না, আমাদের ছেলে-মেয়ে না খেয়ে রয়েছে। কেউ সাহায্য-সহযোগিতাও করছেন না। নেতারা চারপাশে বাঁধ দিয়ে রেখে আমাদের ডুবিয়ে মারছেন। পানি উন্নয়ন বোর্ডের যথেষ্ট পরিমাণ স্লুইস গেট দেওয়া আছে পানি নিষ্কাশনের জন্য। কিন্তু দখলবাজরা স্লুইস গেট দখল করে রাখায় দ্রুত পানি নিষ্কাশন হচ্ছে না।

রামু উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়ে প্রায় অর্ধলক্ষ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। অন্যদিকে তীব্র নদীভাঙনে মুহূর্তেই নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে বসতবাড়ি, আবাদি জমি ও গ্রামীণ সড়ক। কোথাও কোথাও কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়ক পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় যানবাহনের পরিবর্তে নৌকায় চলাচল করছেন।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গর্জনিয়া, কচ্ছপিয়া, কাউয়ারখোপ, রাজারকুল ও দক্ষিণ মিঠাছড়ি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল। রান্নাবান্না প্রায় বন্ধ, বিশুদ্ধ পানির সংকট এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রীর অভাবে বিপাকে পড়েছেন তারা। প্রবল স্রোতে নদীতীরবর্তী এলাকায় একের পর এক বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। স্থানীয় সড়ক, কাঁচা রাস্তা ও বিস্তীর্ণ ফসলি জমির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

মিঠাছড়ি ইউনিয়নের বাসিন্দা ক্রীড়াবিদ সাঈদ হোসেন আকাশ জানান, মিঠাছড়ির প্রায় ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি। রামু-টেকনাফ মহাসড়কের বেশ কয়েকটি অংশ পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ফলে সেখানে গাড়ির বদলে নৌকায় মানুষ চলাচল করছে।

চকরিয়া, মাতামুহুরী ও পেকুয়া উপজেলায় পানি কমতে শুরু করেছে। তবে পানি নামলেও শেষ হয়নি মানুষের দুর্ভোগ। হাজারো পরিবার এখনো পানিবন্দি, অনেক এলাকায় সড়ক যোগাযোগ আংশিক বিচ্ছিন্ন এবং কৃষি, মৎস্য ও বসতবাড়ির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র ধীরে ধীরে সামনে আসছে।

চট্টগ্রাম, হাটহাজারী, কর্ণফুলী, রাঙ্গুনিয়া ও লোহাগাড়া : টানা বৃষ্টি ও বন্যায় বিভিন্ন মৎস্যঘের, পুকুর-জলাশয় ডুবে অন্তত ৯১ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বন্যা উপদ্রুত বাঁশখালী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়াসহ ১৫টি উপজেলায় এই ক্ষয়ক্ষতি হয়। এসব এলাকায় ১০ হাজারের মতো মৎস্যঘের ডুবে সব মাছ বের হয়ে গেছে। এতে মৎস্যচাষিরা সর্বস্বান্ত হয়ে গেছেন। চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য অধিদপ্তর পরিচালিত এক জরিপে এই তথ্য উঠে এসেছে। জেলা মৎস্য অধিদপ্তর কার্যালয় পরিচালিত জরিপ বলছে, টানা এক সপ্তাহেরও বেশি সময়ের বৃষ্টি ও বন্যায় এ পর্যন্ত প্লাবিত হয়েছে ৯ হাজার ৯৩৩টি পুকুর ও জলাশয়। এর বাইরে তলিয়ে গেছে ৩২০টি মাছের ঘের। প্লাবিত হওয়া জলাশয়ের পরিমাণ ৪ হাজার ১১১ হেক্টর। সবচেয়ে বেশি জলাশয় ডুবে গেছে বাঁশখালীতে। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া। এ দুই উপজেলায় ৩ হাজারের বেশি পুকুর জলাশয় পানিতে ডুবে গেছে।

চট্টগ্রামের চার উপজেলায় অতিবর্ষণ ও প্লাবনের কারণে অন্তত চার লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। সাতকানিয়া-লোহাগাড়া, চন্দনাইশ ও বাঁশখালীর মানুষ ৫ দিন ধরে পানিবিন্দ। কলার ভেলা, নৌকা যেন তাদের চলাচলের ভরসা। বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। ভেলায় ভাসিয়ে রোগীকে নেওয়া হচ্ছে হাসপাতালে। লাশ কবর দিতেও ব্যবহার করা হচ্ছে ভেলা। সাতকানিয়ার শঙ্খ নদীতে পড়ে ভেসে যাওয়া আবদুল আলম নামের এক যুবকের লাশ তিন দিন পর আনোয়ারা উপকূল থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। আবদুল আলম স্থানীয় যুবদল নেতা বলে জানা গেছে।

শনিবার থেকে সেনাবাহিনী জেলার সাতটি উপজেলায় ত্রাণ ও উদ্ধার তৎপরতা শুরু করেছে। সাতকানিয়া লোহাগাড়া ও চন্দনাইশে সরে জমিনে গিয়ে দুর্গত মানুষের হাহাকার এবং সেনাবাহিনীর উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতা দেখা গেছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১০ পদাতিক ডিভিশন ও ২৪ পদাতিক ডিভিশনের সদস্যরা বন্যাদুর্গত এলাকায় অনুসন্ধান, উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। ভারি বর্ষণের কারণে বোয়ালখালী, হাটহাজারী ও ফটিকছড়ি উপজেলায়ও ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছে।

যুগান্তর প্রতিবেদক আহমেদ মুসা শনিবার সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত সরেজিমন সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া উপজেলার বন্যা উপদ্রুত কয়েকটি এলাকা ঘুরে বন্যার্তদের হাহাকার ও ত্রাণ তৎপরতার চিত্র তুলে এনেছেন। সকালে কথা হয় সাতকানিয়া পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বোয়ালিপাড়ার বাসিন্দা পঞ্চাশোর্ধ্ব সাইকুল আজিজের সঙ্গে। দুই ছেলে ও দুই মেয়ে নিয়ে তার সংসার। পৌরসভার একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী তিনি। জানান, ‘৫ দিন ধরে ঘরের মধ্যেই পানিবন্দি হয়ে আছেন। শুকনো খাবারই তাদের ভরসা। তবে সেই খাবারও জুটছে না। সরকারি-বেসরকারি কোনো ত্রাণ জোটেনি। বোয়ালিয়াপাড়া ও আশপাশের গ্রামের কয়েকশ পরিবারের মধ্যেই বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্যের সংকট চলছে।

দুর্গত এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, স্বাভাবিক মৃত্যু হলেও পারিবারিক কবরস্থানেও দাফনের জায়গা হচ্ছে না তাদের। ভেলায় ভাসিয়ে দূরবর্তী কোনো উঁচু জায়গায় নিয়ে লাশ দাফন করতে হচ্ছে। শুক্রবার উপজেলার কেউচিয়া ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা গাড়িচালক মোহাম্মদ ফোরকানের লাশ ভেলায় ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়।

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের চন্দনাইশ উপজেলার দক্ষিণ হাশিমপুর অংশে ঢলের পানি শনিবার সকালেও মহাসড়কের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। লোহাগাড়ার ৯টি ইউনিয়নের বেশির ভাগ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। সাতকানিয় ও লোহাগাড়া দুই উপজেলার পানিবন্দি মানুষ নৌকা ও কলার ভেলায় চড়ে বের হয়ে অতিপ্রয়োজনীয় কাজ কিংবা বাজার সদাই করে আবার বিপদগ্রস্ত পরিবারের কাছে ফিরছে।

আনোয়ারা উপজেলার রায়পুর ইউনিয়নের দক্ষিণ পরুয়াপাড়া সাত্তার মাঝির ঘাট এলাকা থেকে শনিবার সকালে সাগরের জোয়ারে ভেসে আসা অজ্ঞাত পরিচয় এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ।

রাঙ্গুনিয়া উপজেলার সরফভাটা ইউনিয়নের পূর্ব সরফভাটা এলাকায় কর্ণফুলী নদীতে লাকড়ি সংগ্রহ করতে গিয়ে পানির তীব্র স্রোতে ভেসে গিয়ে এক যুবক নিখোঁজ হয়েছেন। নিখোঁজ তরুণ সরফভাটা ইউনিয়নের বাসিন্দা বদিউল আলমের ছেলে। পদুয়া ইউনিয়নের দুধপুকুরিয়া এলাকায় টানা ভারি বর্ষণ ও বন্যার পানির তীব্র স্রোতে একটি সেতু ধসে পড়েছে। এতে বান্দরবান-রাঙামাটি সড়কপথে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে।

লোহাগাড়া উপজেলার আধুনগর ইউনিয়নের মছদিয়া গ্রামে বন্যার পানির তীব্র স্রোত ও ডলু নদীর ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাকপ্রতিবন্ধী প্রদীপ বড়ুয়ার একমাত্র বসতবাড়ি। দেয়াল ফেটে গেছে, ঘরের নিচের মাটি ধসে পড়েছে।

সাতকানিয়ায় বন্যার পানিতে ডুবে ইসমাইল হোসেন (২) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে সাতকানিয়া পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ রূপকানিয়া এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। চন্দনাইশে বন্যার পানি কমে পুনরায় বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে।

হাটহাজারী উপজেলার নাঙ্গলমোড়ায় শনিবার সাড়ে ৩ হাজার কেজি চাল বিতরণ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও হাটহাজারীর সংসদ-সদস্য এবং ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন নির্দেশ এসব চাল বিতরণ করেন সালাউদ্দীন আলী।

বান্দরবান, লামা ও নাইক্ষ্যংছড়ি : তৃতীয় দিনের মতো যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে বান্দরবান-চট্টগ্রাম ও বান্দরবান-রাঙামাটি সড়কসহ সারা দেশের সঙ্গে। পানি কিছুটা কমলেও শুক্রবার রাতে ও শনিবার সকালে ভারি বৃষ্টিতে বন্যার পানি ফের বৃষ্টি পেয়েছে। নাইক্ষ্যংছড়ি-রামু সড়কের জারুলিয়াছড়ি বেইলি ব্রিজের গাইডলাইনের মাটি সরে গিয়ে ব্রিজটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় প্রশাসন ব্রিজটির ওপর দিয়ে সব ধরনের যান চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে। ব্রিজটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নাইক্ষ্যংছড়ি সদর, দোছড়ি ইউনিয়ন এবং কক্সবাজারের রামু উপজেলার গর্জনিয়া ও কচ্ছপিয়া ইউনিয়নসহ প্রায় ৫ লাখ মানুষের চলাচলে চরম ভোগান্তির সৃষ্টি হয়েছে। লামা উপজেলার আজিজনগর ইউনিয়নের মিশনপাড়ায় পাহাড়ধসে মারা যাওয়া দুই পরিবারের সদস্য ও গুরুতর আহত এক ইউপি সদস্যকে আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন স্থানীয় সংসদ-সদস্য রাজপুত্র সাচিংপ্রু জেরী। শনিবার আজিজনগর ইউনিয়নে নিহতদের স্বজনদের হাতে এই সহায়তা তুলে দেওয়া হয়।

রাঙামাটি : ভারি বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় শনিবার সকাল থেকে জেলার বাঘাইছড়ি, বরকল ও জুরাছড়িসহ কয়েকটি এলাকায় বন্যার পরিস্থিতি উন্নতি হলেও বিলাইছড়ি উপজেলায় পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি হয়েছে। পাহাড়ি ঢলে উপজেলার ফারুয়া ইউনিয়নে নতুন করে ২০টি গ্রাম বন্যাকবলিত হয়েছে। পাহাড়ি ঢলে সড়ক ডুবে থাকায় এবং বাঘাইছড়ি-মারিশ্যা সড়কের তিন কিলোমিটার এলাকায় রাস্তা ধসে যাওয়ায় গত চার দিন ধরে সারা দেশের সঙ্গে সরাসরি বাঘাইছড়ির সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।

খাগড়াছড়ি : খাগড়াছড়িতে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। দীঘিনালার নিচু এলাকা থেকে পানি কমতে শুরু করেছে। শনিবার সকাল মাইনী নদীর পানি কমে যাওয়ায় ইতোমধ্যে বিভিন্ন নিচু এলাকা থেকে পানি নামতে শুরু করেছে। যারা আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন তাদের অনেকেই বাড়িঘরে ফিরে গেছেন।

মনপুরা ও চরফ্যাশন (ভোলা) : মনপুরা উপকূলে ১০ গ্রামের ২০ হাজারের ওপরে মানুষ পানিবন্দি হয়ে চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এক সপ্তাহ পার হলেও এখন পর্যন্ত ওই সব এলাকার মানুষের ভাগ্যে জুটেনি কোনো ত্রাণ কিংবা শুকনো খাবার। এতে এই উপকূলের বাসিন্দাদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও খাবারের হাহাকার তৈরি হয়েছে।

ভোলার সর্বদক্ষিণের উপজেলা চরফ্যাশনের চার থানা চরফ্যাশন, শশীভূষণ, দুলারহাট ও দক্ষিণ আইচাএলাকার ২১টি ইউনিয়নে মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীর তীরবর্তী গ্রামগুলোতে জোয়ারের পানি ঢুকে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। তলিয়ে গেছে আমনের বীজতলা, বিভিন্ন সবজি খেত ও মাছের ঘের। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ, কৃষক ও মৎস্যচাষিরা।

শেরপুর : শ্রীবরদী উপজেলার গারো পাহাড় এলাকার সীমান্ত সড়কের বালিজুরি গলাচিপা নামক স্থানের পাহাড় ও গাছ ধসের ঘটনা ঘটেছে। এতে সাময়িকভাবে যান চলাচল ব্যাহত হলে স্থানীয় বিভাগ গাছ কেটে সাময়িকভাবে চলাচল উপযোগী করে।

মাগুরা : শালিখা উপজেলার সীমাখালি-বুনাগাতি সড়কের গোবরা এলাকার একটি কালভার্ট ভেঙে গেছে। এতে করে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চরম ভোগান্তির মধ্যে পড়েছে সড়কে চলাচলকারী সাধারণ মানুষ।

অভয়নগর (যশোর) : অভয়নগর উপজেলার নওয়াপাড়া পৌরসভার চেঙ্গুটিয়া এলাকায় শনিবার পানিতে নেমে দুর্গত মানুষের খোঁজ নিয়েছেন যশোর-৪ আসনের সংসদ-সদস্য ও জামায়াতে ইসলামী যশোর জেলার আমির মো. গোলাম রছুল। এ সময় তিনি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মাঝে ত্রাণসামগ্রীও বিতরণ করেন।

চাঁদপুর : মতলব ধনাগোদা নদীর উপর নির্মিত ‘মতলব সেতু’র উত্তর পাশের অ্যাপ্রোচ সড়ক ভেঙে গর্ত দেখা দিয়েছে। যে কোনো সময় ঘটতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা।

ফরিদপুর : শহরের অধিকাংশ সড়ক পানিতে ডুবে গেছে। বৃষ্টি পানি শহরের কয়েকটি এলাকায় দোকানপাটসহ অনেক এলাকার বাড়ির ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ায় অবর্ণনীয় কষ্টের শিকার হয়েছেন অনেকে।

সিলেট : টানা দুই দিন বৃদ্ধির পর শনিবার সিলেট ও সুনামগঞ্জের প্রধান দুই নদী সুরমা ও কুশিয়ারার পানি কিছুটা কমেছে। তবে সীমান্তবর্তী সারি-গোয়াইন নদীর পানি বেড়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, পানি কমলেও দুই জেলাতেই এখনো বন্যার শঙ্কা কাটেনি।

মৌলভীবাজার : মনু নদীর পানি বিপৎসীমার ওপরে দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে। জেলার সদর, রাজনগর, কুলাউড়া ও কমলগঞ্জ উপজেলায় ১৭টি ইউনিয়নের মানুষ বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে। শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত জেলায় ২৬ হাজার ৫৪৪ মানুষ এবং ৭ হাজার ৩০৮টি পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। জেলায় ১৩টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। তবে অনেক মানুষ এখনও নদীর বাঁধে বসবাস করছেন। বন্যা কবলিতদের অভিযোগত্রাণ সামগ্রীও অপ্রতুল। রাজনগর উপজেলার কামারচাক ও টেংরা ইউনিয়নের বন্যাকবলিত মানুষ বিশুদ্ধ পানির সংকটে ভোগছেন। দুর্ভোগে দিন পার করছেন বানভাসি মানুষ।