- পাঁচ বছরে আহরণ কমেছে ১ লাখ টনের বেশি
- জাটকা নিধনে হুমকিতে ভবিষ্যতের ইলিশ
- সরবরাহ কম, কেজিতে দাম বেড়েছে ৫০০-৭০০ টাকা
ইলিশের ভরা মৌসুম চলছে। কিন্তু বরিশাল অঞ্চলের নদ-নদী, মোহনা ও সাগরে প্রত্যাশিত পরিমাণ ইলিশের দেখা মিলছে না। মোকাম ও খুচরা বাজারে সরবরাহ সীমিত, দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। অথচ মৎস্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের জুন মাসেই দক্ষিণাঞ্চলে গত বছরের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি ইলিশ আহরণ হয়েছে। শুধু তাই নয়, গত ছয় বছরের মধ্যে জুন মাসে এটিই সর্বোচ্চ আহরণ।
সরকারি এই হিসাবের সঙ্গে বাজারের বাস্তবতার বড় ধরনের অমিল থাকায় প্রশ্ন তুলছেন জেলে, আড়তদার, ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা। তাদের দাবি, বড় ইলিশের পরিবর্তে ধরা পড়ছে ছোট মাছ ও জাটকা। নিষিদ্ধ ট্রলিংয়ের কারণে ইলিশের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
কাগজে রেকর্ড আহরণ, বাজারে উল্টো চিত্রবরিশাল বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, অতীতের রেকর্ড ভেঙে এবারের জুনে প্রায় তিন গুণ বেশি ইলিশ আহরণ হয়েছে। গত জুনে বিভাগের ছয় জেলায় মোট ৪০ হাজার ৫১৬ টন ইলিশ আহরিত হয়েছে। গত বছর এ সময় আহরিত হয় ১৪ হাজার ৪৯৬ টন। অর্থাৎ গত বছরের চেয়ে এবার ২৬ হাজার ৩২০ টন বেশি আহরিত হয়েছে।
এর আগে, ২০২৪ সালে ২১ হাজার ৮২৭ টন, ২০২৩ সালে ১৫ হাজার ৪৮২ টন, ২০২২ সালে ৩০ হাজার ৮২০ টন ও ২০২১ সালে ১৫ হাজার ৮৯২ টন। অথচ বাজারে সরবরাহ সীমিত।
আরও পড়ুন
ভরা মৌসুমেও ইলিশের আকাল
এদিকে জেলেরা বলছেন, ইলিশ আহরণ কিছুটা বেড়েছে। তবে যে পদ্ধতিতে এসব ইলিশ আরোহণ করা হচ্ছে, সেটা ইলিশ সম্পদকেই নষ্ট করছে। ইদানীং নিষিদ্ধ ট্রলিং জাহাজ দিয়ে মোহনায় থেকে জাটকা ইলিশ ছেঁকে তোলা হচ্ছে। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে কয়েক বছরের মধ্যে জাটকাও মিলবে না।
মৎস্যসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন জনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আহরিত হওয়া ইলিশের দুই-তৃতীয়াংশ জাটকা (১০ ইঞ্চির কম আকারের) ও ছোট আকারে ইলিশ। জাটকা নিধন ও বিক্রি দণ্ডযোগ্য অপরাধ। জাটকা নিধনও হচ্ছে নিষিদ্ধ ট্রলিং জাহাজ দিয়ে। আহরণ ও বিক্রয় নিষিদ্ধ ইলিশে মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাবে আহরণ বেড়েছে।
মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বর্ষা মৌসুমকে ইলিশ মৌসুম হিসেবে গণ্য করা হয়। প্রজনন ও জাটকা বড় হওয়া নিরাপদ করতে নদী-সাগরে পর্যায়ক্রমে বছরের আট মাস বিভিন্ন মেয়াদে আহরণে নিষেধাজ্ঞা পালিত হয়। সর্বশেষ সাগরে ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষ হয়েছে গত ১১ জুন। আগামী অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত নদী-সাগরে কোনো নিষেধাজ্ঞা থাকবে না। তাই এই চার মাস ইলিশের ভরা মৌসুম হিসেবে গণ্য হয়। দেশে মোট আহরিত ইলিশের ৭০ ভাগ পাওয়া যায় দক্ষিণাঞ্চলের নদী-সাগরে।
বার্ষিক আহরণ কমেছেজুন মাসের উৎপাদনের হিসাবের বাইরে দীর্ঘমেয়াদি চিত্র বলছে, বরিশাল বিভাগে ইলিশ আহরণ ধারাবাহিকভাবে কমছে। বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে বিভাগে যেখানে প্রায় ৩ লাখ ৬৯ হাজার টন ইলিশ আহরণ হয়েছিল, সেখানে সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা নেমে এসেছে প্রায় ২ লাখ ৬৬ হাজার টনে। অর্থাৎ পাঁচ বছরে আহরণ কমেছে এক লাখেরও বেশি টন।
এমনকি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তুলনায়ও সর্বশেষ অর্থবছরে প্রায় ৬৮ হাজার টন কম ইলিশ ধরা পড়েছে। অথচ ২০২২-২৩ অর্থবছরে পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ আহরণের রেকর্ড গড়েছিল বরিশাল বিভাগ। ফলে একদিকে জুন মাসে রেকর্ড উৎপাদনের দাবি, অন্যদিকে বার্ষিক আহরণে ধারাবাহিক পতন—দুটি চিত্র নিয়েই প্রশ্ন উঠছে।
আরও পড়ুন
ইলিশের উৎপাদন ও ওজন কমছে কেন?
একই সঙ্গে মৎস্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যানে আরেকটি বিষয়ও নজর কাড়ছে। গত দুই বছর ধরে বরিশাল বিভাগের মোট ইলিশ আহরণের অর্ধেকেরও বেশি ভোলা জেলার নামে দেখানো হয়েছে। চলতি বছরের জুন মাসে বিভাগের মোট উৎপাদনের বড় অংশই ভোলার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। গত বছরের জুন মাসেও একই ধরনের চিত্র ছিল। কিন্তু বাজারে ইলিশের সংকট, আড়তগুলোতে মাছের স্বল্পতা এবং ব্যবসায়ীদের বক্তব্যের সঙ্গে এই পরিসংখ্যানের সামঞ্জস্য খুঁজে পাচ্ছেন না সংশ্লিষ্টরা। তাই সরকারি হিসাবের নির্ভুলতা ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
জেলেদের দেওয়া তথ্যপর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটা-সংলগ্ন মহিপুর মৎস্য বন্দরের জেলে নাসির উদ্দিন। সাগরে দীর্ঘ সময় ধরে তার মাছ ধরার অভিজ্ঞতা থেকে জাগো নিউজকে বলেন, ‘আগে সাগরে বড় ইলিশের দেহা মিললেও এহন ধরা পড়ছে ছোড ছোড (ছোট) ইলিশ। আগে যেডা ছোড ইলিশ আছেলে হেইডারও ওজন আছেলে আধ কেজি। এহন যে পাই তাতে ছয়ডায় (৬) এক কেজি হয়।’
এ জেলের দেওয়া তথ্য মতে, আগে জেলেরা বড় ইলিশ ধরার জন্য চার ইঞ্চি ফাঁসের জাল ব্যবহার করতেন। এখন পর্যাপ্ত বড় ইলিশ থাকায় তিন থেকে সাড়ে তিন ইঞ্চি ফাঁসের জাল ব্যবহার করেন। এতে প্রচুর জাটকা পাচ্ছেন।
আরও পড়ুন
ইলিশ নেই, সরপুঁটি আছে স্যার
বরগুনা জেলার পাথরঘাটা উপজেলার জেলে রানা জানান, আগে সাগরে ইলিশের রেনু নিধন করা হত না। এখন সাগরে মাছ কমে যাওয়ায় কাঠের তৈরি ট্রলিং জাহাজের খরচ পোষাতে ইলিশের রেণুও নিধন করা হয়। এজন্য বড় ইলিশ কমে গেছে।
ভোলার মেঘনার মোহনায় অবস্থিত তুলাতলি আবদুল্লাহ মৎস্য আড়তের জাহিদুল ইসলাম জানান, ৪৭ বছর ধরে এ মাছ ঘাটে তিনি ইলিশের ব্যবসা করছেন। বর্তমানে মেঘনায় ইলিশের এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি তিনি আগে কখনো দেখেননি। পরিস্থিতি এমন যে ট্রলার সাগরে গিয়ে বাজার খরচও ওঠাতে পারে না। অথচ মৎস্য অধিদপ্তর আমলাতান্ত্রিক হিসাব দেখাচ্ছে।
আকাশছোঁয়া ইলিশের দামসরকারি হিসাবে ইলিশ আহরণ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ার দাবি থাকলেও তার কোনো ইতিবাচক প্রভাব পড়েনি বাজারে। বরং গত বছরের তুলনায় প্রায় সব আকারের ইলিশের দাম বেড়েছে কেজিপ্রতি ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা। ফলে ভরা মৌসুমেও সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে গেছে জাতীয় এই মাছ।
বর্তমানে পাইকারি বাজারে এক কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার টাকায়। ৭০০ থেকে ৯০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের কেজি ২ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ টাকা, ৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ প্রায় ১ হাজার ৮০০ টাকা এবং ৪০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকায়।
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, মোকামে সবচেয়ে বেশি আসছে ৩০০ গ্রামের কম ওজনের জাটকা। অথচ আইন অনুযায়ী, এ আকারের ইলিশ আহরণ ও বিক্রি নিষিদ্ধ। এরপরও এসব মাছ পাইকারিতে ৮০০ টাকা এবং খুচরা বাজারে ৯০০ টাকার বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। অথচ গত বছর একই আকারের মাছ ৫০০ টাকারও কম দামে বিক্রি হয়েছিল।
ফলে বাজারের বাস্তবতা বলছে, কাগজে-কলমে উৎপাদন বৃদ্ধির দাবি থাকলেও সরবরাহ সংকট ও উচ্চমূল্যের কারণে ভরা মৌসুমেও ইলিশ এখনও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে রয়ে গেছে।
সাইফুল নামের এক ক্রেতা বলেন, আগে যে ইলিশ ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকায় কেনা যেত, এখন একই ধরনের মাছ কিনতে হচ্ছে ২ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ টাকায়। তার অভিযোগ, সরবরাহ কম থাকার সুযোগে ব্যবসায়ীদের একটি অংশ অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়িয়ে রেখেছে।
আরও পড়ুন
নদী সাগর মানুষের চাপে বিপন্নের পথে ইলিশ
আরেক ক্রেতা মামুন জানান, খুচরা বাজারের তুলনায় কিছুটা কম দামে মাছ কিনতে পাইকারি বাজারে এসেছিলাম। কিন্তু এখানেও দাম প্রায় একই। শেষ পর্যন্ত ৭০০ থেকে ৮০০ গ্রাম ওজনের চারটি ইলিশ কিনতে খরচ হয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ টাকা।
সোহেল নামে আরেক ক্রেতা বলেন, ইলিশের দাম নাগালের বাইরে চলে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে পাঙ্গাশ কিনেছি। আগে ৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ ৮০০ থেকে ৯০০ টাকার মধ্যে পাওয়া গেলেও এখন সেই মাছের দাম দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকায়।
পেশা ছাড়ছেন অনেকবরিশাল পোর্ট রোড মৎস্য আড়তদার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. জহির শিকদার জাগো নিউজকে বলেন, ‘পোর্ট রোডের এ মোকাম মূলত ইলিশ নির্ভর। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে ইলিশ উৎপাদন কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়েছে। লোকসান গুনতে গুনতে গত দুই বছরে আমাদের সমিতির সদস্য ১৬০ জন থেকে কমে ১২০ জনে নেমে এসেছে। ওই ৪০ আড়তদার পেশা বদল করে অন্য কাজে যুক্ত হয়েছেন। আরও অনেকে এ পেশা ছাড়ার উদ্যোগ নিয়েছেন।’
পোর্ট রোডের ইলিশ ব্যবসায়ী আলতাফ হোসেন বলেন, ‘আগে মৌসুমের এমন সময় দম ফেলার ফুরসত থাকত না। এখন সারা দিন বসে থাকতে হয়। মাছ নেই, বেচাকেনাও নেই। এভাবে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। অবস্থা এমন চলতে থাকলে ব্যবসা ছেড়ে দিতে হবে।’
মৎস্য অধিদপ্তরের বক্তব্যবরিশালের জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. হাদিউজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, জুন থেকে ইলিশের মৌসুম শুরু হলেও প্রকৃত ভরা মৌসুম সাধারণত জুলাই থেকে শুরু হয়। পর্যাপ্ত বৃষ্টি হলে সাগর থেকে নদীতে ইলিশের আগমন বাড়বে। তখন ইলিশের দামও কমবে বলে তিনি আশাবাদী।
এদিকে মৎস্য অধিদপ্তরের বরিশালের উপ-পরিচালক মো. মহসীন জাটকা নিধনে ইলিশ কমেছে স্বীকার করে জাগো নিউজকে বলেন, তাদের দপ্তরের জনবল সংকটসহ নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তবে এ বছরে জুনে গত বছরের তিন গুণ ইলিশ আহরণ এবং বাজারে সংকটের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা না দিয়ে বলেছেন, মাঠ পর্যায় থেকে তারা তথ্য সংগ্রহ করেছেন।
এইচআরএস/কেএইচকে








