জোয়ারের পানি ঢোকার সময় ঘরের দরজা বন্ধ করেও লাভ হয় না। বঙ্গোপসাগরের লোনাপানি ভাঙা বেড়িবাঁধ ছাপিয়ে মুহূর্তেই ঢুকে পড়ে বসতঘরে। খাট, আলমারি, রান্নাঘর, উঠান—সবকিছু পানিতে তলিয়ে যায়। ভাটার সময় পানি নেমে গেলেও থেকে যায় লবণের আস্তরণ। নষ্ট হয় ফসল। ক্ষতির মুখে পড়ে পুকুরের মাছ ও নলকূপ। এমন বাস্তবতা এখন কক্সবাজারের দ্বীপ উপজেলা কুতুবদিয়ার হাজারো মানুষের নিত্যদিনের জীবন।

বিশেষ করে আলী আকবর ডেইল ­রোমাইপাড়াসহ বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষ সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছে। প্রতিটি জোয়ারের সময় আতঙ্কে থাকে তারা। রাতের জোয়ারে ঘুম ভেঙে পানি ঠেকানোর চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত ঘর রক্ষা করা সম্ভব হয় না।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) উপজেলা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, পাউবোর অধীনে ৪০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের কুতুবদিয়া রক্ষা বাঁধ রয়েছে। এই বেড়িবাঁধের মধ্যে প্রায় দুই কিলোমিটার অংশ বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ। ঠিকাদার নিয়োগ করে ১০টি পয়েন্টে এই বেড়িবাঁধ মেরামতের কাজ চলছে। তবে এরই মধ্যে নতুন করে ঝুঁকিপূর্ণ ৫টি পয়েন্ট চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে বরাদ্দ না পাওয়ায় সেসব স্থানে মেরামতকাজ শুরু করা যায়নি।

গতকাল রোববার পূর্ব তাবালেরচর, কাহারপাড়া ও রোমাইপাড়ায় সরেজমিনে দেখা যায়, কোথাও শিশুদের কোলে নিয়ে নিরাপদ স্থানে ছুটছেন মায়েরা, কোথাও বৃদ্ধরা কোমরপানি মাড়িয়ে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরিয়ে নিচ্ছেন। অনেক পরিবার উঁচু মাচায় চুলা বসিয়ে রান্না করছে। আবার কেউ কেউ আত্মীয়ের বাড়িতে অস্থায়ী আশ্রয় নিয়েছে।

পূর্ব তাবালেরচর এলাকার মৃত বদি আলমের স্ত্রী ছমুদা বেগম জানান, রোববার জোয়ারের পানিতে তাঁর বসতঘর ধসে গেছে। এখন তিনি অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। ছমুদা বেগমের একটাই চাওয়া—দ্রুত বেড়িবাঁধ মেরামত করে বসবাসের সুযোগ করে দেওয়ার।

তাবালেরচর এলাকার বাসিন্দা আবু তৈয়ব জানান, বেড়িবাঁধের কাছেই তাঁদের বসতভিটা। জোয়ারের পানিতে ঘরবাড়ি ভেঙে যাচ্ছে। আগামী পূর্ণিমার জোয়ারের আগে বেড়িবাঁধ মেরামত করা না হলে তাবালেরচর বায়তুশ শরফ কবরস্থান সমুদ্রে বিলীন হয়ে যাবে।

বেড়িবাঁধের দুর্ভোগে থাকা আলী আকবর ডেইল ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সাহাব উদ্দিন, স্থানীয় বাসিন্দা কাউছার হোছাইন রিপন, বড়ঘোপ ইউনিয়নের রোমাইপাড়া এলাকার জিয়াবুল, শুক্কুর, আলী হোছাইনসহ বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা হয়। তাঁদের অভিযোগ, বছরের পর বছর ভাঙা বেড়িবাঁধ স্থায়ীভাবে সংস্কার না হওয়ায় প্রতি বর্ষা ও পূর্ণিমার জোয়ারে দুর্ভোগের শিকার হতে হচ্ছে। সাময়িক মেরামত পরিস্থিতি সামাল দিলেও স্থায়ী সমাধান আনতে পারছে না।

আলী আকবর ডেইল ইউপির (ভারপ্রাপ্ত) চেয়ারম্যান আকতার কামাল সিকদার বলেন, ‘ভাঙা বেড়িবাঁধের কারণে ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামের মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করছে। আমরা বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দপ্তরে বারবার জানিয়েছি।’

পাউবোর কুতুবদিয়া উপজেলা কার্যালয়ের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘কুতুবদিয়ায় বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ মেরামতের কাজ চলমান রয়েছে। নতুনভাবে ৫টি ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্ট চিহ্নিত করা হয়েছে। শিগগির এসব স্থানে মেরামতকাজ শুরু করা হবে।’

কুতুবদিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘বেড়িবাঁধের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা আমরা একাধিকবার পরিদর্শন করেছি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে ত্রাণ ও মানবিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে সমন্বয় করে বাঁধের ভাঙা অংশ দ্রুত সংস্কারের বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’

জানতে চাইলে কক্সবাজার-২ (কুতুবদিয়া-মহেশখালী) আসনের সংসদ সদস্য আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘কুতুবদিয়ায় ১০টি পয়েন্টে ঠিকাদারের মাধ্যমে বেড়িবাঁধ মেরামতের কাজ চলমান রয়েছে।

নতুন করে ৫টি পয়েন্টে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ নিশ্চিত করে দ্রুত কাজ শুরুর চেষ্টা চলছে। কুতুবদিয়াবাসীর নিরাপত্তার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।’