কাজে সফল হতে হলে দিন-রাত পরিশ্রম করতে হয়, এমন ধারণা এখনো অনেকের মধ্যে রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, যত বেশি সময় অফিসে বা কাজে দেওয়া যাবে, তত দ্রুত সফল হওয়া সম্ভব। আবার অনেক কর্মী প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও ছুটি নিতে দ্বিধা করেন, কারণ অনেক প্রতিষ্ঠানেই ছুটি নেওয়াকে ভালো চোখে দেখা হয় না। অথচ চিকিৎসাবিজ্ঞান ও সাম্প্রতিক মনস্তাত্ত্বিক গবেষণা বলছে, কর্মক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য ধরে রাখতে শুধু কঠোর পরিশ্রম নয়, প্রয়োজন নিয়মিত বিরতি ও পরিকল্পিত ছুটি।

ক্রমাগত বিশ্রামহীনভাবে কাজ করলে একসময় শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি তৈরি হয়। এর ফলে মনোযোগ কমে যায়, ভুল বাড়ে এবং কাজের প্রতি আগ্রহও ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ নিজেকে অতিরিক্ত চাপে রাখা একজন কর্মীকে আরও দক্ষ করে তোলে না, বরং দীর্ঘমেয়াদে তার ক্যারিয়ারের ক্ষতিই করে।

jagoকাজের পাশাপাশি নিজের জন্য সময় বের করাও কর্মজীবনের অংশ

বাড়ছে মানসিক চাপ

বর্তমানে করপোরেট সংস্কৃতিতে অতিরিক্ত কাজের চাপকে অনেক সময় স্বাভাবিক হিসেবে দেখানো হয়। ফলে বিশ্বজুড়ে বাড়ছে মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও কর্মক্ষেত্রের ক্লান্তি।

২০২৪ সালে আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশনের বার্ষিক মানসিক স্বাস্থ্য জরিপে দেখা যায়, অংশগ্রহণকারীদের ৫৩ শতাংশ মানসিক চাপ এবং ৪০ শতাংশ ঘুমের সমস্যাকে তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতির প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এমনকি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও ম্যানেজারদের অর্ধেকেরও বেশি ‘বার্নআউট’-এর মতো সমস্যায় ভুগছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে নিয়মিত ছুটি নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ছুটির উপকারিতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব জর্জিয়ার ফ্র্যাঙ্কলিন কলেজ অব আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সেসের মনস্তত্ত্ব বিভাগের গবেষকেরা বিশ্বের ৯টি দেশের ৩২টি গবেষণার ২৫৬টি তথ্য বিশ্লেষণ করেন। তাদের গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয় জার্নাল অব অ্যাপ্লাইড সাইকোলজি’-তে । গবেষণায় দেখা গেছে, ছুটি কাটানোর ফলে একজন কর্মীর মানসিক ও শারীরিক সুস্থতা শুধু সাময়িকভাবে নয়, দীর্ঘ সময় পর্যন্ত ইতিবাচক থাকে। অর্থাৎ ছুটির সুফল অফিসে ফেরার পরও কাজের দক্ষতায় প্রতিফলিত হয়।

মস্তিষ্কেরও প্রয়োজন বিশ্রাম

মানুষের মস্তিষ্ক সারাক্ষণ একই গতিতে কাজ করার জন্য তৈরি হয়নি। দিনের পর দিন একই রুটিনে কাজ করতে থাকলে মানসিক ক্লান্তি জমতে থাকে। শুরুতে বিষয়টি বোঝা না গেলেও ধীরে ধীরে মনোযোগ কমে, ছোট ছোট ভুল বাড়ে এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও দুর্বল হয়ে পড়ে।

কয়েক দিনের বিরতি মস্তিষ্ককে বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ দেয়। বিশ্রামের পর কাজে ফিরলে নতুন উদ্যম, বাড়তি মনোযোগ এবং ইতিবাচক মানসিকতা নিয়ে দায়িত্ব পালন করা সহজ হয়।

বার্নআউটের ঝুঁকি কমে

অতিরিক্ত কাজের চাপ, বিশ্রামের অভাব এবং দীর্ঘস্থায়ী মানসিক ক্লান্তি মিলেই তৈরি হয় বার্নআউট। এই অবস্থায় কর্মদক্ষতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি উদ্বেগ, হতাশা, অনিদ্রা এমনকি শারীরিক অসুস্থতাও দেখা দিতে পারে।
নিয়মিত ছুটি এই ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে সাহায্য করে। কারণ বিশ্রাম শরীর ও মন-দুটোকেই পুনরায় শক্তি সঞ্চয়ের সুযোগ দেয়।

সৃজনশীলতা বাড়াতে

একই পরিবেশে দীর্ঘদিন কাজ করলে নতুন চিন্তার সুযোগ কমে যায়। ছুটিতে নতুন জায়গায় ঘুরতে যাওয়া, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো কিংবা নিজের শখের কাজে সময় দেওয়া মস্তিষ্ককে নতুন অভিজ্ঞতা দেয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, কাজ থেকে কিছুদিন দূরে থাকার পর অনেকেই নতুন ধারণা ও সৃজনশীল চিন্তা নিয়ে কর্মস্থলে ফিরে আসেন। বিশেষ করে পরিকল্পনা, লেখা, ডিজাইন কিংবা সমস্যা সমাধানমূলক কাজে এটি বেশ কার্যকর।

সম্পর্কও হয় আরও দৃঢ়

কাজের ব্যস্ততায় পরিবার, বন্ধু কিংবা নিজের জন্য সময় বের করা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে ব্যক্তিগত সম্পর্কেও দূরত্ব তৈরি হতে পারে।

ছুটি সেই শূন্যতা পূরণের সুযোগ এনে দেয়। প্রিয়জনদের সঙ্গে সময় কাটানো মানসিক প্রশান্তি বাড়ায় এবং সেই ইতিবাচক অনুভূতি কর্মজীবনেও প্রভাব ফেলে।

jagoদীর্ঘমেয়াদি সফলতার জন্য ছুটির প্রয়োজন

উৎপাদনশীলতা বাড়ে

অনেকেই মনে করেন, ছুটি নিলে কাজ পিছিয়ে যাবে। বাস্তবে ঠিক উল্টোটা ঘটে। বিশ্রাম নিয়ে কাজে ফিরলে কর্মদক্ষতা, মনোযোগ ও কাজের মান-সবই উন্নত হয়। সতেজ মন নিয়ে কাজ করলে কম সময়ে বেশি কাজ করা সম্ভব হয় এবং ভুলের পরিমাণও কমে যায়।

শুধু ভ্রমণই নয়, বিশ্রামই আসল

ছুটি মানেই দূরে কোথাও ঘুরতে যাওয়া নয়। বাড়িতে থেকে বিশ্রাম নেওয়া, বই পড়া, সিনেমা দেখা, রান্না করা, বাগান করা কিংবা পরিবারের সঙ্গে নির্ভার সময় কাটানোও কার্যকর ছুটি হতে পারে। মূল বিষয় হলো, কাজের চাপ থেকে কিছু সময়ের জন্য নিজেকে দূরে রাখা এবং মানসিকভাবে সতেজ হয়ে ওঠা।

আরও পড়ুন

প্রবীণদের রিলস আসক্তি কি তাদের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর

পরিকল্পিতভাবে কাজে ফেরা

বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন, দীর্ঘ ছুটি কাটিয়ে ফিরেই তীব্র কাজের চাপে না ঝাঁপিয়ে পড়ে ১-২ দিনের একটি ‘বাফার টাইম’ রাখা ভালো। এতে কাজে ফেরার মানসিক প্রস্তুতি নেওয়া সহজ হয় এবং ছুটির ইতিবাচক প্রভাবও দীর্ঘস্থায়ী হয়।

আরও পড়ুন

ঘুম ভাঙতেই মন খারাপ, সকালে যেসব ভুলে বাড়ছে স্ট্রেস হরমোন

দীর্ঘমেয়াদে সফল ক্যারিয়ার গড়তে কঠোর পরিশ্রমের বিকল্প নেই, তবে বিশ্রামেরও বিকল্প নেই। তাই নিজের ভালো থাকার জন্য এবং কর্মক্ষেত্রে সর্বোচ্চ দক্ষতা ধরে রাখতে প্রয়োজনমতো ছুটি নিন। দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের জন্য এটাই সবচেয়ে কার্যকর পথ।

সূত্র: সাইকোলজি টুডে, ইউনিভার্সিটি অব জর্জিয়া, মেন্টাল হেলথ

এসএকেওয়াই