সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে তারকাদের দিন শুরু হয় ইনস্টাগ্রাম স্টোরি দিয়ে, শেষ হয় লাখো লাইক-কমেন্ট গুনে। বিশেষ করে ফুটবলারদের-নতুন বুট, অনুশীলন, ছুটি, প্রেম, পরিবার-সবকিছুই যেন অনুসারীদের জন্য সাজানো এক প্রদর্শনী। কিন্তু এই প্রবণতার ঠিক উল্টো পথে হাঁটছেন স্পেনের মিডফিল্ডার, ম্যানচেস্টার সিটির তারকা, ২০২৪ সালে ব্যালন ডি'অর জয়ী এবং ২০২৬ বিশ্বকাপে গোল্ডেন বল জয়ী রদ্রি।
বিশ্বকাপে স্পেনের জার্সিতে মাঠ মাতানো এই ফুটবলারের ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামে কোনো ব্যক্তিগত ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্ট নেই। তিনি নিজের ব্যক্তিগত জীবনকে ইচ্ছাকৃতভাবেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বাইরে রেখেছেন। এমন সিদ্ধান্তের কারণে অনেকেই তাকে এখন ‘অ্যান্টি-ইনফ্লুয়েন্সার ফুটবলার’ বলেও ডাকছেন।
আলোচনার কেন্দ্র, তবু অনলাইনে নেই
বর্তমান সময়ে অনেক ফুটবলারের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোটি কোটি অনুসারী। তাদের পোস্ট, রিল বা স্টোরি নিয়মিত খবরের শিরোনাম হয়। অথচ রদ্রিকে ঘিরে আলোচনা হয় তার পাস, ট্যাকল, ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ কিংবা ট্রফি জয়ের জন্য সেলফি বা ভাইরাল ভিডিওর জন্য নয়। কিন্তু রদ্রি বিশ্বাস করেন, একজন ফুটবলারের আসল পরিচয় মাঠে, মোবাইল স্ক্রিনে নয়।
রদ্রি বহু বছর ধরে নিজের ব্যক্তিগত সম্পর্ককে সবার চোখের আড়ালেই রেখেছেন। প্রেম বা পারিবারিক জীবনের মুহূর্তগুলোকে তিনি কখনোই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট বানাননি। ডিজিটাল যুগে যেখানে অনেক সম্পর্কই লাইক, কমেন্ট আর রিলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, সেখানে রদ্রি যেন অন্য এক বার্তা দেন সব ভালোবাসা সবার সামনে দেখাতে হয় না।
অনেক মনোবিজ্ঞানীও মনে করেন, সম্পর্কের প্রতিটি মুহূর্ত প্রকাশ করার চেয়ে কিছু বিষয় ব্যক্তিগত থাকলে সেটি আরও স্বাভাবিক ও চাপমুক্ত থাকে।
আরও পড়ুন
সোশ্যাল মিডিয়ায় কেইন ইয়ামালের অনুসারী কত জানেন?
সাফল্যের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া কি জরুরি?
অনেকের ধারণা, জনপ্রিয় হতে হলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু রদ্রির ক্যারিয়ার সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানায়। তিনি ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলের অন্যতম সেরা ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার, ম্যানচেস্টার সিটির ট্রেবলজয়ী দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য, স্পেনের নির্ভরতার প্রতীক এবং ব্যালন ডি'অরের মালিক। এত বড় সাফল্যের পরও নিজের ব্যক্তিগত জীবনকে প্রচারের আলো থেকে দূরে রেখেছেন।
মাঠেই তার পরিচয়
রদ্রির খেলার ধরনও অনেকটা তার ব্যক্তিত্বের মতো। তিনি খুব কমই নাটকীয়তা দেখান। গোলের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে তার বল দখল, পাস, প্রতিপক্ষের আক্রমণ ভাঙা কিংবা পুরো ম্যাচের ছন্দ নিয়ন্ত্রণ। মাঠের বাইরে যেমন তিনি নিরব, মাঠেও তেমনি কাজ দিয়ে নিজের গুরুত্ব প্রমাণ করেন।
তরুণদের জন্য রদ্রির বার্তা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খারাপ নয়। বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ, তথ্য আদান-প্রদান কিংবা নিজের কাজ তুলে ধরার জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কিন্তু প্রতিটি মুহূর্তকে অনলাইনে প্রকাশ করাই যে সাফল্যের একমাত্র পথ নয়, রদ্রি তার বাস্তব উদাহরণ। তার জীবন দেখায়, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বজায় রেখেও বিশ্বসেরা হওয়া সম্ভব। জনপ্রিয়তার জন্য প্রতিদিন নতুন কনটেন্ট তৈরি করতে হয় না; দক্ষতা, পরিশ্রম ও ধারাবাহিকতাই শেষ পর্যন্ত মানুষের স্বীকৃতি এনে দেয়।
আরও পড়ুন
ইন্টারনেট বন্ধ হলে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করবেন যেভাবে
অফলাইন থেকেও বিশ্বজয়
ডিজিটাল যুগে যখন অনেকেই লাইক আর ফলোয়ারের সংখ্যা দিয়ে নিজের সাফল্য মাপেন, তখন রদ্রি যেন ভিন্ন এক দর্শনের প্রতিনিধি। তার কাছে সবচেয়ে বড় পরিচয় একজন ফুটবলার হিসেবে নিজের পারফরম্যান্স। ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামে উপস্থিত না থেকেও তিনি কোটি মানুষের শ্রদ্ধা অর্জন করেছেন। তাই রদ্রির গল্প শুধু একজন ফুটবলারের নয়, বরং এমন এক মানুষের, যিনি মনে করিয়ে দেন সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি আসে বাস্তব জীবন থেকে, ভার্চুয়াল জগত থেকে নয়।
কেএসকে








