সামিন ইয়াসার

বহুতল ভবনের নিচতলায় বা বেজমেন্টে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলতে গিয়ে নেটওয়ার্ক হারিয়ে ফেলার অভিজ্ঞতা কমবেশি সবারই আছে। মোবাইল টাওয়ারের সিগন্যাল দেয়াল, ছাদ বা ঘন জনবসতির কারণে দুর্বল হয়ে পড়ে, ফলে কল কেটে যায় বা কথা জড়িয়ে যায়। এই সমস্যার একটা সমাধান হিসেবে এসেছে ওয়াই-ফাই কলিং, প্রযুক্তির ভাষায় যাকে বলা হয় ভয়েজ ওভার ওয়াই-ফাই বা ভোওয়াই-ফাই।

সাধারণ ফোন কল মোবাইল টাওয়ারের মাধ্যমে অপারেটরের নেটওয়ার্কে পৌঁছায়। ওয়াই-ফাই কলিংয়ে কলটি টাওয়ারের বদলে বাসা, অফিস বা যে কোনো ওয়াই-ফাই সংযোগ দিয়ে সরাসরি অপারেটরের নেটওয়ার্কে যায়। প্রযুক্তিগতভাবে এটি ভোএলটিই-এর মতোই একই কাঠামো আইএমএস বা আইপি মাল্টিমিডিয়া সাবসিস্টেম ব্যবহার করে কলটিকে ডাটা প্যাকেটে রূপান্তর করে পাঠায়। ব্যবহারকারীর দিক থেকে তাই পার্থক্য বোঝার উপায় নেই; ডায়াল করলেই কল হয়ে যায়, আলাদা কোনো অ্যাপ লাগে না।

মোবাইল সিগন্যাল দুর্বল কিন্তু ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট আছে এমন জায়গার জন্য এই সেবা দারুণ কার্যকর। বিশেষ করে উঁচু ভবনের ওপরের তলা, বেজমেন্ট কিংবা গ্রামের প্রত্যন্ত এলাকা, যেখানে কাছাকাছি কোনো মোবাইল টাওয়ার নেই, সেখানে এটি চমৎকার কাজ করে। ফোন স্বয়ংক্রিয়ভাবে মোবাইল নেটওয়ার্ক আর ওয়াই-ফাইয়ের মধ্যে সুইচ করে, আর কলরেট থাকে স্বাভাবিক কলের মতোই বাড়তি কোনো চার্জ নেই।

আরও পড়ুন

হোটেল রুমে গোপন ক্যামেরা আছে কি না বুঝবেন যেভাবে

তবে সব ফোনে এটা চলে না। ওয়াই-ফাই কলিং চালাতে হলে ফোনে ভোএলটিই সাপোর্ট থাকতে হবে, আর ফোন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সিস্টেমেও ভোওয়াই-ফাই ফিচারটি চালু থাকতে হবে। পাশাপাশি অপারেটরের নির্দিষ্ট কিছু আইএসপি-র সংযোগ দিয়েই এটি কাজ করে, যে কোনো ওয়াই-ফাই দিয়ে নয়।

বিটিআরসি শর্তসাপেক্ষে এই সেবার অনুমোদন দিয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি কলের রেকর্ড ডিভাইসের অবস্থান, আইপি ও ম্যাক অ্যাড্রেসসহ বিটিআরসির কাছে জমা দিতে হয়। ভিপিএন ব্যবহারকারীদের ‘হোয়াইটলিস্ট' বা অনুমতি তালিকার কড়া নিয়ম মানতে হয়, আর আন্তর্জাতিক রোমিং বা এয়ারপ্লেন মোডে এই সেবা চালু রাখা যায় না।

বাংলাদেশে যেসব অপারেটর ওয়াই-ফাই কলিং দিচ্ছে

বাংলাদেশে বাংলালিংক প্রথম এই সেবা চালু করে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনায় সীমিত পরিসরে পাইলট শুরুর পর, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তারা দেশজুড়ে বাণিজ্যিকভাবে সেবাটি চালু করে। গ্রামীণফোনও একই মাসে, ৩ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে, ভোওয়াই-ফাই প্রযুক্তি নিয়ে বাজারে আসে-যা কেবল ভোএলটিই সংযোগধারী গ্রাহকদের জন্য উন্মুক্ত। দুই ক্ষেত্রেই সেবাটি বিনামূল্যে; নিয়মিত কলের রেটেই কথা বলা যায়, বাড়তি কোনো ফি নেই।

উভয় অপারেটরই নির্দিষ্ট কিছু আইএসপি-র সহায়তায় সেবাটি দিচ্ছে:

বাংলালিংক

লিংক৩, আইসিসি, কার্নিভাল, পেসনেট, ক্লাউডওয়ান (টেকনোকোর), অগ্নি ও মেট্রোনেটসহ দেড় শতাধিক আইএসপি

গ্রামীণফোন

ব্র্যাকনেট, কার্নিভাল ইন্টারনেট, চিটাগং অনলাইন লিমিটেড ও মাইম-ইন্টারনেট
রবি ও টেলিটক এখনো পর্যন্ত বাণিজ্যিকভাবে ওয়াই-ফাই কলিং চালু করেনি। গ্রাহকদের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে আগ্রহ দেখা গেলেও এই দুই অপারেটর এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়নি।

আরও পড়ুন

বিদ্যুৎ-পানি ‘খেয়ে’ শেষ করছে এআই, পৃথিবীর কী হবে?

অ্যান্ড্রয়েড ফোনে চালু করবেন যেভাবে-

  • ১. ফোনের সেটিংসে যান।
  • ২. নেটওয়ার্ক অ্যান্ড ইন্টারনেট বা কানেকশনস অপশনে ট্যাপ করুন।
  • ৩. মোবাইল নেটওয়ার্ক সিলেক্ট করে ওয়াই-ফাই কলিং অপশনে প্রবেশ করুন।
  • ৪. ওয়াই-ফাই কলিং অপশনটি চালু করে দিন।

(দ্রষ্টব্য: ফোনের ব্র্যান্ড বা মডেলভেদে এই অপশনটি কল সেটিংস বা সিম কার্ড অ্যান্ড মোবাইল নেটওয়ার্ক-এর ভেতরেও থাকতে পারে।)

আইফোনে চালু করবেন যেভাবে-

  • ১. আইফোনের সেটিংস অ্যাপে যান।
  • ২. নিচের দিকে স্ক্রল করে ফোন অপশনে ট্যাপ করুন।
  • ৩. ওয়াই-ফাই কলিং সিলেক্ট করুন।
  • ৪. ওয়াই-ফাই কলিং অন দিজ আইফোন সুইচটি অন করুন (অন হলে সুইচটি সবুজ দেখাবে)।
  • ৫. এনাবেলে ট্যাপ করুন এবং জরুরি সেবার জন্য আপনার ঠিকানা চাওয়া হলে তা দিন।

লেখক: প্রযুক্তি লেখক ও পোস্ট-কোয়ান্টাম ক্রিপ্টোগ্রাফি গবেষক।

কেএসকে