মাগুরার শালিখা উপজেলায় কার্যত অচল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামে দেড় কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়াকে কেন্দ্র করে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর (ইইডি) উপজেলার আড়পাড়া ইউনিয়নের চুকিনগর গ্রামের মুন্সী শহিদুর রহমান বিএম কলেজের নামে এ বরাদ্দ দেয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, বাস্তবে কলেজটির কোনো কার্যকর শিক্ষা কার্যক্রম নেই। অথচ ভবন নির্মাণের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।

সম্প্রতি সরেজমিনে কলেজ প্রাঙ্গণে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে শিক্ষা-কার্যক্রমের কোনো দৃশ্যমান অস্তিত্ব নেই। পুরো চত্বর পানিতে নিমজ্জিত, চারদিকে জঙ্গল ও আগাছা। জীর্ণ দুটি টিনশেড ঘরে ধুলাবালিতে ঢাকা কয়েকটি বেঞ্চ পড়ে রয়েছে। স্থানীয়রা জানান, দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয় প্রঙ্গণের একটি অংশে ধান চাষ করা হচ্ছে। তবে কয়েক দিন আগে সড়কের পাশে বাঁশের খুঁটিতে কলেজের একটি সাইনবোর্ড টাঙানো হয়েছে। ঘরের ভেতরে উপজেলা পরিষদ, শালিখার অনুদানে দেওয়া কিছু নতুন বেঞ্চও দেখা যায়।

জানা গেছে, মাগুরার এক সংসদ সদস্যের ডিও লেটারের (আধা-সরকারি পত্র) ভিত্তিতে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর গত ২৫ জুন জেলার দুটি সংসদীয় আসনের ছয়টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য দেড় কোটি টাকা করে মোট ৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়। এর মধ্যে মুন্সী শহিদুর রহমান বিএম কলেজও রয়েছে। ইতিমধ্যে মাগুরা শিক্ষা প্রকৌশল বিভাগ ভবন নির্মাণের জন্য মাটি পরীক্ষাসহ (সয়েল টেস্ট) প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু করেছে।

শালিখা উপজেলা শিক্ষা অফিস সূত্র জানায়, উপজেলা পর্যায়ের নথিপত্রে এই নামে কোনো সচল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তথ্য নেই। স্থানীয়দের ভাষ্য, আড়পাড়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মুন্সী শহিদুর রহমানের নামে তাঁর ছেলে মুন্সী কামরুজ্জামান নবাব ২০১৮ সালের দিকে প্রায় ৫০ শতাংশ জমির ওপর দুটি টিনশেড ঘর নির্মাণ করে কলেজ চালুর উদ্যোগ নেন। শুরুতে কিছু শিক্ষার্থী ভর্তি হলেও একাডেমিক স্বীকৃতি না পাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি অল্প সময়ের মধ্যেই অচল হয়ে পড়ে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ব্যক্তি, যারা নিজেদের প্রতিষ্ঠানটির সাবেক শিক্ষক-কর্মচারী বলে দাবি করেছেন, অভিযোগ করেন—সরকারি অনুদান ও ভবিষ্যতে এমপিওভুক্তির আশ্বাস দিয়ে মুন্সী কামরুজ্জামান নবাব তাঁদের কাছ থেকে দুই থেকে তিন লাখ টাকা করে নিয়ে অন্তত ১৫ জনকে শিক্ষক-কর্মচারী হিসেবে নিয়োগ দেন। তবে তাঁরা কখনো কোনো বেতন-ভাতা পাননি। ২০২০ সালের দিকে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেলে টাকা ফেরতও পাননি বলে তাঁদের অভিযোগ।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কথিত অধ্যক্ষ মুন্সী কামরুজ্জামান নবাব। তিনি বলেন, শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগের আনুষ্ঠানিক অনুমতি না থাকায় খণ্ডকালীন জনবল নেওয়া হয়েছিল। টাকার বিনিময়ে নিয়োগের অভিযোগ সঠিক নয়। তাঁর দাবি, বর্তমানে কলেজে ৭০ থেকে ৮০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে, দুই শিফটে পাঠদান চলছে এবং চলতি বছর ৭০ জন শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। তবে সরেজমিনে তাঁর দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ মেলেনি।

জানা গেছে, মাগুরা-২ আসনের সংসদ সদস্য ও সংস্কৃতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরীর ডিও লেটারের ভিত্তিতেই প্রতিষ্ঠানটির জন্য বরাদ্দ অনুমোদন করা হয়।

মাগুরা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী সরকার হারুন অর রশিদ বলেন, ‘সংসদ সদস্যদের ডিও লেটারের ভিত্তিতে মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করেছে। ১৫ জুলাইয়ের মধ্যে জরিপ প্রতিবেদন এবং ১৫ আগস্টের মধ্যে মাটি পরীক্ষার রিপোর্টসহ প্রয়োজনীয় নথি অধিদপ্তরে পাঠানোর নির্দেশনা রয়েছে। আমরা সেই অনুযায়ী কাজ করছি। জরিপে যা পাওয়া যাবে, সেটিই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।’

এ বিষয়ে শালিখা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তানভীর হাসান চৌধুরী বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্ত নয়। তবে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ প্রায় ৩০ জন শিক্ষার্থী থাকার দাবি করেছে। বরাদ্দের বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত, এ বিষয়ে আমার মন্তব্য করার সুযোগ নেই।’