মহাশূন্যে অর্থাৎ পৃথিবীর কক্ষপথে এখন হাজারো স্যাটেলাইটের ছড়াছড়ি। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট চোখ মেলে রয়েছে আমাদের দিকে। আর্থার ডি ক্লার্কের হিসেব অনুযায়ী ২২ হাজার ২৩৬ মাইল ওপরে কোন স্যাটেলাইট স্থাপন করলে পৃথিবীর যেকোন বিন্দু থেকে লেজার রশ্মি রিসিভ হবে কারণ ঐ পয়েন্টটে পৃথিবীর ঘূর্ণন গতি ও স্যাটেলাইটের ঘূর্ণন গতি সমান হবে। তবে বর্তমানে ক্রিয়াশীল উপগ্রহগুলো প্রয়োজনানুযায়ী কক্ষপথের বিভিন্ন উচ্চতায় স্থাপন করা হয়েছে। আইএসএস অর্থাৎ আমেরিকা, রাশিয়া, জাপান, কানাডা ও ইউরোপীয় ১১ দেশের (ইএসএ) যৌথ মহাকাশ স্টেশন স্থাপিত আছে ভূ-পৃষ্ঠ থেকে ২৫০ মাইল ওপরে। এটি ঘণ্টায় প্রায় ১৭ হাজার মাইল গতিতে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে চলেছে। সর্বশেষ জাপান এবং চীন নিজ নিজ উদ্যোগে পৃথক পৃথক মহাকাশ স্টেশন স্থাপনের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। এবার মহাকাশ নিয়ে নতুন সোনালি অধ্যায় রচনা করতে চলেছে জাপান ও চীন। সোজা কথায় জাপান পৃথিবীর জিও স্টেশনারি পয়েন্টে অর্থাৎ মোটামুটি ২২ হাজার মাইল উচ্চতায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ সৌর প্যানেল বসাবে। উৎপাদিত বিদ্যুৎ মাইক্রোওয়েভ বা লেজারের মাধ্যমে পাঠানো হবে ভূ-পৃষ্ঠের রিসিভিং সেন্টারে। রিসিভিং স্টেশন লেজার রশ্মি বা মাইক্রোওয়েভকে পুনরায় বিদ্যুতে রূপান্তর করে পরিকল্পিত স্থানে প্রেরণ করবে। অতঃপর একদিন পৃথিবীব্যাপী সরবরাহ করা হবে লেজার প্রযুক্তিতে। ওয়াই ফাই বা মোবাইল ডেটার মাধ্যমে ইন্টারনেট পৃথিবীব্যাপী ব্যবহৃত হচ্ছে তেমনি নিকট ভবিষ্যতে ঘরের বাতি, ফ্যান, এ.সি, টিভি, ফ্রিজ চলবে বিদ্যুতের তারহীন মাইক্রোওয়েভ বা লেজার কানেকশনে। তারবিহীন বিদ্যুতের প্রথম তাত্বিক ধারণা পেশ করেন ম্যাক্সওয়েল ১৮৬০-এর দিকে। ১৮৮৪ সালে হেনরি পয়েন্টিং এ ফর্মূলা উপস্থাপন করে বিষয়টি আরও সামনে নিয়ে আসেন। এদিকে সার্বিয়ান বিজ্ঞানী নিকোলো টেসলা এডিসনের বিদ্যুৎ কারখানায় যোগ দেন এবং তিনি প্রস্তাব করেন যে, এডিসনের ডিসি অর্থাৎ সরলরৈখিক বিদ্যুতের চেয়ে এসি অর্থাৎ বক্র প্রবাহের বিদ্যুৎ অনেক বেশি কার্যকরী। ডিসি বনাম এসি বিদ্যুৎ নিয়ে মত বিরোধের একপর্যায়ে টেসলা একাকী পথ চলা শুরু করেন এবং পয়েন্টিং এর ফর্মূলার ওপর ভিত্তি করে তারবিহীন বিদ্যুৎ প্রবাহের জন্য আবিষ্কার করেন টেসলা কয়েল ১৮৯০ সালে। ২০২৩ সালের ২৮ ডিসেম্বর নায়াগ্রা জলপ্রপাত দেখতে গিয়ে টেসলার (নোট বই হাতে) স্ট্যাচুটি এবং মার্কিন রুচি বোধ দেখে মুগ্ধ হলাম। নায়াগ্রা জলবিদ্যুৎ ব্যবহার করে টেসলা প্রথম এসি কারেন্টের সঞ্চালন বাস্তবায়ন করেন। তার স্মৃতিতে নায়াগ্রার আমেরিকান অংশে স্থাপিত এই স্ট্যাচুর বিপরীতে কানাডিয়ান অংশে কানাডাও টেসলার আরেকটি মূর্তি স্থাপন করেছে। মহাকূন্যে যদি সত্যি সত্যি উৎপাদিত সৌরবিদ্যুৎ মাইক্রোওয়েভে পৃথিবীতে পাঠানো বাস্তবায়িত হয়েই যায় তবে টেসলা বিজ্ঞানী হিসেবে রীতিমতো অমরত্ব লাভ করবেন। চীনও জাপানের মতোই জিও স্টেশনারী পয়েন্টে ১ কি. মি. চওড়া সোলার প্যানেল বসাবে। মহাশূন্যে দিনরাত সর্বক্ষণ বা ২৪ ঘণ্টা সূর্যের আলো পাওয়া যায়। ফলে পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে মহাকাশে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন অনেকটা টেকসই। চীন ইতোমধ্যে ১০০ মিটার দূরত্বে তারবিহীন বিদ্যুৎ সরবরাহে সাফল্য পেয়েছে। চীন বলছে পৃথিবীতে লেজার বিদ্যুৎ কিছুটা সময় নিলেও নিকট ভবিষ্যতে ISS, ড্রোন ও বিমানকে চার্জ সাপ্লাই করা সম্ভব। নিকট ভবিষ্যতে যুদ্ধ বিমান প্রস্তুতকারী জায়ান্টরা লেজার বিদ্যুৎ নির্ভর বিমান, যুদ্ধবিমান, ড্রোন ও স্যাটেলাইট নির্মাণে লেগে যাবে। জাপান এবং চীন নিজ নিজ প্রযুক্তিবিদদের নির্দেশ দিয়েছে দ্রুত সোলার প্যানেল বহনযোগ্য শক্তিশালী কার্গো রকেট নির্মাণ ত্বরান্বিত করার জন্য। দু’দেশই ২০৩৬ সালে মহাকূন্যে সোলার বিদ্যুৎ স্টেশন স্থাপন লক্ষ্যমাত্রা স্থিত করেছে। ধারণা করা হচ্ছে অন্তত ৫-৭ বছর পেছাতে হলেও প্রকল্প বাস্তবায়িত হবেই। বিংশ শতকের শেষার্ধ ছিল পরিবেশ সংরক্ষণের দাবিতে মিছিলের সময়। উষ্ণায়ন যে হারে বাড়ছে তা দ্রুত কমানোর কোন যুৎসই প্রকল্প মানবজাতির সামনে নেই। এই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাড়িয়ে পৃথিবীকে বাঁচানোর সর্বশেষ মেধাবী সংযোজন হল মহাকাশে সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন। প্রকল্পটি যতই পৃথিবীর প্রাণÍ সীমায় লেজার বিদ্যুৎ নিয়ে হাজির হবে ততই জীবাশ্ম জ্বালানি ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো বন্ধ হতে বাধ্য। তেল, গ্যাস, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ হওয়া মানে পৃথিবীর দূষণ কমে যাবে কমপক্ষে এক চতুর্থাংশ। পৃথিবীব্যাপী মটরযানগুলো যদি লেজার বিদ্যুতের আওতায় এসে যায় তাহলেতো পৃথিবীর দূষণ অর্ধেকে নেমে আসতে বাধ্য। সম্ভবত; এই শতাব্দীর শেষ দিকে পৃথিবী ফিরে যাবে ডব্লিউএইচও (হু) কার্বন নিঃসরণ মাত্রার ভিত্তি ২০০৫ সালে। [লেখক: আইনজীবী, আপিল বিভাগ]
লাইফস্টাইল
মহাশূন্য থেকে আসবে তারবিহীন বিদ্যুৎ

শেয়ার করুন







