বিশ্বকাপের উন্মাদনা আর উইম্বলডনের সবুজ ঘাস— খেলার দুটি ভিন্ন জগত কখনো কখনো এসে মিশে যায় স্মৃতির ভেতর। সেই নস্টালজিয়ার কেন্দ্রে আজও দীপ্ত গ্যাব্রিয়েলা সাবাতিনি; যিনি শুধু টেনিসের এক কিংবদন্তি নন, একটি প্রজন্মের নিভৃত আবেগেরও নাম।
একদিকে বিশ্বকাপ ফুটবলে উন্মাতাল পৃথিবী, অন্যদিকে উইম্বলডনের সবুজ গালিচায় টেনিসের মহোৎসব। এই সময়টায় আমাদের প্রজন্মের অনেকেই মেসির জাদুতে মুগ্ধ থেকেও হঠাৎ ফিরে যায় অন্য এক স্মৃতিতে। মনে পড়ে যায় এক নারীকে—যিনি একসময় টেনিস কোর্টে যেমন রাজত্ব করেছেন, তেমনি জায়গা করে নিয়েছেন অসংখ্য তরুণের হৃদয়ে।

তাই আজও তোমার কথা মনে করে কখনো কখনো অনুরণিত হয় এই লাইনগুলো—‘মনে পড়ে রুবি রায়, কবিতায় তোমাকে।’
আমাদের কৈশোর-প্রান্তে ফুটবলের আকাশ দখল করে নিয়েছিলেন ম্যারাডোনা। ১৯৮২ সালের বিশ্বকাপ থেকে শুরু হওয়া সেই উন্মাদনা সাদা-কালো টেলিভিশনের পর্দা পেরিয়ে আজও প্রবাহিত। ম্যারাডোনা তখনও দীপ্তিমান। ম্যারাডোনা তখনও দীপ্তিমান। সেই সময়েই টেনিস কোর্টে আবির্ভাব ঘটে আরেক নক্ষত্রের।

আমরা তখন উদ্ভিন্ন যৌবনে, সাংবাদিকতারও হাতেখড়ি হয়ে গেছে। আর সেই তরুণী হয়ে উঠলেন এক নিভৃত উচাটন; আজকের ভাষায় যাকে বলে ‘ক্রাশ’, তখন এটাই ছিল নিছক মুগ্ধতা।

তিনি গ্যাব্রিয়েলা সাবাতিনি। ভক্তদের কাছে শুধু ‘গ্যাবি’। বাঙালি পাঠকের কাছে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর পর সবচেয়ে পরিচিত ও প্রিয় আর্জেন্টাইন নারীদের একজন নিঃসন্দেহে গ্যাব্রিয়েলা সাবাতিনি।
মেলবোর্ন পার্ক থেকে প্যারিসের রোলাঁ গারো, উইম্বলডনের সবুজ গালিচা থেকে নিউইয়র্কের ফ্লাশিং মিডোজ—সবখানেই তাঁর উপস্থিতি ছিল এক সম্রাজ্ঞীর মতো। টেনিসের সৌন্দর্য, শক্তি আর ব্যক্তিত্ব যেন এক শরীরে মিলেছিল। এক হাতে মারা তাঁর দুর্দান্ত ব্যাকহ্যান্ড, মাটি ঘেঁষে ছুটে চলা গ্রাউন্ডস্ট্রোক আর নিখুঁত কোর্ট কভারেজ প্রতিপক্ষের জন্য ছিল দুঃস্বপ্ন।



একই সময়ে জার্মান তারকা স্টেফি গ্রাফের সঙ্গে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং বন্ধুত্ব—দুটোই টেনিসকে দিয়েছে নতুন মাত্রা। ১৯৮৮ সালে দুজন মিলে জিতেছিলেন উইম্বলডনের নারী ডাবলস শিরোপা। ব্যক্তিগত সাফল্যের মুকুটে সবচেয়ে উজ্জ্বল পালকটি আসে ১৯৯০ সালে, যখন তিনি জিতে নেন ইউএস ওপেন। ১৯৮৮ সালের সিউল অলিম্পিকে আর্জেন্টিনার পতাকাবাহক হওয়ার গর্বও তাঁর। সেবার একক ইভেন্টে জিতেছিলেন রৌপ্য পদক।
কিন্তু সাবাতিনি কেবল ট্রফির গল্প নন। আশির দশকের শেষভাগ ও নব্বইয়ের দশকের শুরুতে তিনি ছিলেন বিশ্ব ক্রীড়ার অন্যতম পপ-কালচার আইকন। ১৯৮৯ সালে জার্মান প্রতিষ্ঠান মুলহেনসের সঙ্গে অংশীদারত্বে তাঁর নামে বাজারে আসে সিগনেচার পারফিউম।

বিপুল জনপ্রিয়তার সুবাদে সেই ব্র্যান্ড পরে পোশাক, ঘড়ি ও হোম লাইফস্টাইল পণ্যেও বিস্তৃত হয়। ১৯৯২ সালে তাঁর নামেই প্রথম কোনো নারী টেনিস খেলোয়াড় হিসেবে একটি গোলাপের জাতের নামকরণ করা হয়। দুই বছর পর গ্রেট আমেরিকান ডল কোম্পানি তাঁর আদলে বিশেষ পুতুল তৈরি করে এবং একই বছরে প্রকাশিত হয় তাঁর আত্মপ্রেরণামূলক বই ‘মাই স্টোরি’। কোর্টের সীমানা পেরিয়ে তখন সাবাতিনি হয়ে উঠেছেন এক বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক আইকন।
অবসর নেওয়ার পরও আলো থেকে সরে যাননি সাবাতিনি। বরং নিজের পরিচয়কে নতুনভাবে নির্মাণ করেছেন। ইউনিসেফ, ইউনেসকো ও স্পেশাল অলিম্পিকসের বিভিন্ন মানবিক উদ্যোগে যুক্ত হয়েছেন। শিশুদের অধিকার, শিক্ষা এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের জন্য কাজ করেছেন নিয়মিত। ২০১৯ সালে এই অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে আন্তর্জাতিক টেনিস ফেডারেশন তাঁকে প্রদান করে সর্বোচ্চ সম্মান ফিলিপ শাত্রিয়ে অ্যাওয়ার্ড।


২০১৭ সালে ক্রীড়াসুলভ মানসিকতা ও সমাজসেবার জন্য পান জ্যাঁ বোরোত্রা স্পোর্টসম্যানশিপ অ্যাওয়ার্ড। ফরাসি ওপেনের লিজেন্ডস ম্যাচে মাঝেমধ্যে তাঁকে এখনও দেখা যায়। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মোটিভেশানাল বক্তা হিসেবে তিনি কথা বলেন খ্যাতির চাপ, মানসিক দৃঢ়তা এবং জীবনসংগ্রামের অভিজ্ঞতা নিয়ে।
বুয়েনস আইরেস ও সুইজারল্যান্ড—দুই জায়গাতেই সময় কাটান সাবাতিনি। সাইক্লিং, দৌড় আর সক্রিয় জীবনযাপন এখনও তাঁর নিত্যসঙ্গী। ২০১৪ সালে বুয়েনস আইইরেসে তাঁর ভাস্কর্য স্থাপন করা হয় ম্যারাডোনা, লিওনেল মেসি, গিলার্মো ভিলাসদের মতো আর্জেন্টাইন কিংবদন্তিদের পাশে। সেটিও যেন বলে দেয়, তিনি কেবল একজন সফল টেনিস খেলোয়াড় নন; তিনি একটি সময়ের প্রতীক।

আমাদের প্রজন্মের কাছে সাবাতিনি শুধু একটি নাম নয়। তিনি এমন এক সময়ের প্রতিনিধি, যখন নায়ক-নায়িকারা অ্যালগরিদমে জন্ম নিতেন না; জন্ম নিতেন অপেক্ষায়, বিস্ময়ে আর কিশোর হৃদয়ের গোপন উচ্ছ্বাসে।
বিশ্বকাপ আবার আসবে। উইম্বলডনও প্রতি বছর ফিরবে। নতুন নায়ক-নায়িকা জন্ম নেবে। কিন্তু কিছু মানুষের জন্য সময় যেন থমকে থাকবে। গ্যাব্রিয়েলা সাবাতিনি তাঁদেরই একজন।

তাই আজও, উইম্বলডনের ঘাসে বল গড়াতে শুরু করলে, কিংবা আর্জেন্টিনার প্রসঙ্গ আসলে কোথা থেকে যেন ভেসে আসে সেই পুরোনো অনুভূতি—
মনে পড়ে রুবি রায়, কবিতায় তোমাকে।
ছবি: সামাজিক মাধ্যম ও উইকিপিডিয়া








