আজকে সকাল সকাল রওনা হতে হবে। কারণ, নাপা ভ্যালি দূরের পথ। তাই সকালে মজার সব নাশতা করে রওনা হলাম। শনিবার ছুটির দিনে রাস্তা খানিকটা ফাঁকা। বন্ধু তাই এই সুযোগে মেটা বা ফেসবুক আর আলফাবেট বা গুগলের আসল ক্যাম্পাস ঘুরিয়ে নিয়ে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে নিয়ে এল। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসটা এত্ত সুন্দর। স্প্যানিশ স্থাপত্যে ভীষণ সাজানো গোছানো ক্যাম্পাস। বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল সড়কের দুপাশের গাছের সারি আর বিখ্যাত সব ভবন পার হয়ে আমরা মূল ভবনের সামনে নেমে খানিকটা হাঁটাহাঁটি আর ছবি তুললাম। স্নিগ্ধ ক্যাম্পাস ছেড়ে যখন আমরা নাপা ভ্যালিতে ঢুকব, দেখা গেল হাতে আরও সময় আছে। যাওয়ার পথে যেহেতু সান ফ্রান্সিসকো শহরটা পড়বে, তাই ঠিক হলো, জিগজেগ রাস্তা বা লম্বার্ড স্ট্রিটটা দেখেই যাই, সেই সঙ্গে গোল্ডেন গেট সেতুটা পার হয়ে ষোলোকলা পূর্ণ করব।

কিন্তু বিধিবাম। সেদিন ছিল আবার ‘নো কিংস ডে’, সারা আমেরিকাতে ট্রাম্পবিরোধী আন্দোলন। আমাদের সেটা খেয়াল ছিল না। শহরে ঢুকে আমরা দুই ঘণ্টার জ্যামে আটকে গেলাম। এরপর কোনোরকমে বের হলাম শহর থেকে। কিন্তু গোল্ডেন গেট সেতু দিয়ে আর যাওয়া হলো না।

তা–ও ভাগ্য ভালো যে আমরা ভালোয় ভালোয় ঠিকঠাক নাপা ভ্যালিতে এসে পৌঁছালাম।

নাপা ভ্যালির ছোট্ট শহরে অনেক পর্যটক। আমরা একটু দেরিতে এসেছি বলে বেশির ভাগ এসে ঘুরেফিরে আগেই ফিরে গেছেন। দুপুরের খাবার খেতে আমরা হাজির হলাম পুরোনো মার্কেটে। বিশাল আচ্ছাদনে ঢাকা মার্কেটে বাহারি সব খাবার। নিউইয়র্কে ইতালিয়ান পিৎজা খাওয়ার খায়েশ মেটেনি, তাই আসল ইতালিয়ান পিৎজারিয়া পেয়ে আমরা দুটি ভিন্নস্বাদের পিৎজা নিলাম, সঙ্গে বন্ধু নিল স্থানীয় দ্রাক্ষারস। আমরা সাধারণ পানীয় নিয়েই সন্তুষ্ট থাকলাম।

পিৎজাগুলো ভালো, কিন্তু বলতে কি, বাংলাদেশি পিৎজা আরও ভালো। আমাকে আপনারা অপাঙ্‌ক্তেয় ভাবতে পারেন, কিন্তু বাংলাদেশিরা ভীষণ ভালো পিৎজা বানায়। এটা হোক ঢাকা বা বান্দরবানের আদ্রক রেস্তরাঁয় বা রোমে বা প্যারিসে।

যা–ই হোক, ভীষণ দামি এ পিৎজা দুটির দাম হয়েছিল ৮০ ডলার। আমরা চোখের মাথা খেয়ে পুরোটা বন্ধুর ওপর চাপিয়ে দিলাম।

আমেরিকা গিয়ে আমরা বেশ নির্লিপ্ত হয়ে গেছি। কী করব বলেন? ডলার মানেই ১২৩ টাকার ধাক্কা। সামলাই কেমন করে?

আমরা খেয়েদেয়ে এদিক–সেদিক ঘুরে অনেক ছবি তুলে একটা শ্যালে বা দ্রাক্ষা বা আঙুরবাগান–সংবলিত অতিথিশালায় এলাম। এখানে অনেক টাকা খরচ করে মানুষ রাত যাপন করে।

আমরা এসবের ধার না ধেরে সরাসরি আঙুরবাগানে পায়চারি করে একটু এদিক–ওদিক ঘুরেফিরে কোনো দ্রাক্ষারস না কিনেই গাড়িতে উঠে চম্পট দিলাম।

অনেক গতিতে চলে আমরা সন্ধ্যার আগেই বাসায় এসে হাজির হলাম। এসে একটু বিশ্রাম নিয়ে রাতে সান হোজে শহর দেখতে বের হলাম।

শহরটা সেদিন ছোট মনে হয়েছিল। দেখলাম, বেশ বড় না হলেও মাঝারি। আর শহরটার নাইট লাইফ সাংঘাতিক। ইউরোপীয় ধরনের। রাস্তা বন্ধ করে সারি সারি চেয়ার–টেবিল বিছিয়ে দ্রাক্ষারস আর স্টেক আর পিৎজা আর বিভিন্ন রকম খাবারের বিপুল আয়োজন। আসলে প্রযুক্তিবিদদের টাকার ঝলকানিতে শহরটা চকচক করছে দিন–রাতে সমানে।

আমরা চমৎকৃত হলাম। শেষে অনেক ঘুরেফিরে আবার বাসায় ফিরলাম অনেক রাতে।

এসে সেই অসাধারণ ফিউশন খাবার খেয়ে দিলাম ঘুম। আগামীকাল এই শহর ছেড়ে যাব লস অ্যাঞ্জেলেসে। আর যাব বিখ্যাত প্যাসিফিক কোস্ট হাইওয়ে ধরে।

তবে আমরা এ যাত্রা বেশি মোহময় করার জন্য অর্ধেকটা পথ বন্ধুর গাড়িতে আর বাকি অর্ধেক এমট্রেক রেলের ক্যালিফোর্নিয়া সার্ফলাইনার নৈসর্গিক ট্রেন নিয়েছি। আমাদের প্ল্যান হচ্ছে, বাসা থেকে বের হয়ে উপকূল ঘেঁষে যাওয়া প্যাসিফিক কোস্ট হাইওয়ে ধরে সান লুইস অবিস্পো যাব। সেখানে বন্ধুকে বিদায় দিয়ে ট্রেনে চেপে লস অ্যাঞ্জেলেসে পৌঁছাব।

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

সেটার জন্য বিছানাতে যাওয়ার এখনই সময়।

পরদিন সকাল সকাল রওনা দেওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে কাতার এয়ারলাইনস থেকে এল এক এলোমেলো বার্তা, আমাদের লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে ঢাকার ফিরতি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে।

এখন কী হবে? সব ফেলে তারাহুড়া করে সস্তায় চায়না ইস্টার্নের টিকিট কাটা হলো সাংহাই আর কুনমিংয়ে যাত্রাবিরতিসহ। আমরা অনেকটা স্বস্তি নিয়ে সকালের নাশতা খেতে খেতে প্রায় দুপুর।

আমাদের নৈসর্গিক ট্রেন বিকেল চারটার দিকে।

পিসিএইচ বা প্যাসিফিক কোস্ট হাইওয়ে পুরোটা কাভার করে সান লুইস অবিস্পো যদি যাই, তাহলেও প্রায় ৮ ঘণ্টা লেগে যাবে। তাই ঠিক হলো, আমরা অর্ধেক পথ পিসিএইচ দিয়ে গিয়ে বাকিটা হাইওয়ে ১০১ দিয়ে দ্রুত সান লুইস অবিস্পোর ট্রেন ধরব। পিসিএইচের আইকনিক বিক্সবি ক্রিক ব্রিজ, বিগ সুর/ সার আর কারমেল বাদ পড়ে গেল, শুধু মন্টেরি আর প্যাসিফিক গ্রোভ শেষে ১৭ মাইল ড্রাইভ শেষ করেই আমরা কারমেল বিচ থেকে দ্রুত ঘুরেই হাইওয়ে ১০১ ধরে ক্যাম্ব্রিয়া দিয়ে আবারও পিসিএইচ ধরব আর উপকূল ধরেই আমরা সান লুইস অবিস্পোতে পৌঁছাব।

আমাদের পুরো উপকূলটা দেখা হলো না।

কত্ত দিনের সাধ অধরা রয়ে গেল।

কী আর করা।

মার্কিন মুলুকে সফর কাহিনি—পর্ব ৩: ক্যালিফোর্নিয়া, ক্যালিফরনিকেসন

শেষমেশ আমরা মন্টেরিতে এসে পৌঁছালাম। সুন্দর উপকূল। মনটাই ভালো হয়ে গেল। ওল্ড ফিশারম্যান ওয়ার্ফ হয়ে আর অ্যাকুয়ারিয়ামের পাশ ঘেঁষে আমরা পার হলাম, কিন্তু গাড়ি থেকে নেমে বিখ্যাত অ্যাকুয়ারিয়ামে ঢুকতে বা ওয়ার্ফে মজাদার খাবার খেতে পারলাম না।

আমরা দ্রুতই প্যাসিফিক গ্রোভে পৌঁছালাম। কী সুন্দর। খাড়া পাথুরে সৈকতের ধার ঘেঁষে কী সুন্দর সুন্দর বাড়ি, একদম ছবির মতো আর উপকূল ঘেঁষে জংলি ফুলের মেলা। আহা, তাদের যা বাহার, রঙের মেলা।

আমরা এখানে অনেক ছবি তুলে ১৭ মাইল ড্রাইভে ঢুকে গেলাম।

এ ১৭ মাইল ড্রাইভে ঢুকতে হলে ১৭ না হলেও ১২ ডলার দিতে হয়। আমরা এখানে অবিশ্বাস্য সুন্দর পাথুরে উপকূল ঘেঁষে বানানো গলফ কোর্স আর পাথুরে উপকূলের ধবল সাদা বালুকাবেলা দেখে আর গাড়িতে থাকতে পারলাম না। দৌড়ে নিচে নেমে এলাম। ঢেউয়ের শব্দে আমরা হারিয়ে গেলাম শৈশবে। সাঁতারের পোশাক ছিল না বলে আর নামা হয়নি পানিতে। সময়ের অভাব। পরেরবার এলে আর মিস হবে না।

আমরা আরেকটু এগিয়ে ঘন এক বনে ঢুকে গেলাম। লম্বা লম্বা সব গাছ। সাইপ্রেসগাছের ঘন জঙ্গলে তো আলোর দেখাই পাওয়া যায় না। বন্ধু বলল যে এগুলো শত বছরের পুরোনো। এভাবে যেতে যেতে এ এলাকার সবচেয়ে বিখ্যাত একাকী সাইপ্রেস বা দ্য লোন সাইপ্রেসের সামনে বেশ অনেক ছবি তুললাম। এই গাছ এক পাহাড়ি ঢালে কোনোরকমে টিকে আছে ২৫০ বছর ধরে। ভয় হচ্ছিল যে পরেরবারের ঝরে উড়ে যাবে।

আমরা তাকে বিদায় দিয়ে পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তা ধরে আর তার দুপাশের সুন্দর সব মনোরম বাড়িঘর পার হয়ে কার্মেল বে তে পৌঁছালাম, আমাদের বন্ধু অনেক চেষ্টা করেও পার্কিং পেল না। আমরা বালুকাবেলায় নামতেই পারলাম না।

শেষে হাতে সময় না থাকাতে গাড়ি ঘুরিয়ে আমরা উপকূল ছেড়ে ভেতরের দিকে গিয়ে হাইওয়ে ১০১ ধরলাম। এই সড়কের দুই পাশে খালি ফসলের মাঠ। বন্ধু বলল যে আমেরিকার বেশির ভাগ সবজি নাকি এখানেই হয়। আমরা ঘণ্টাখানেক পর সালিনাস, পাসো রোবলস পার হয়ে ক্যাম্ব্রিয়া নামের শহরের কাছাকাছি এসে গেলাম। বন্ধু আমার মনের দুঃখ বুঝতে পেরে আবারও পিসিএইচ নিয়ে গেল। পথটা গেছে ঘন জঙ্গল আর মাঝেমধ্যে আঙুরের বাগানে আচ্ছাদিত পাহাড়ের সারির মধ্য দিয়ে, পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো সব উঁচু–নিচু পাহাড়।

এত্ত সুন্দর।

আমরা একপর্যায়ে জোর করে গাড়ি থামিয়ে ছবিও তুলে ফেললাম। এরপর গাড়িটা উপকূল ঘেঁষে যেতে যেতে যতই সান লুইস অবিস্পোর কাছাকাছি হচ্ছিল, আমরা সাগরের কূলে ততই এক বিশাল পাথরখণ্ড দেখতে পাচ্ছিলাম। এটার নাম নাকি মরো রক, এটা মরো উপসাগরের মধ্যে কূল থেকে একটু দূরে।

এটাকে বিদায় দিয়ে গাড়িটা সান লুইস অবিস্পোতে ঢুকে গেল। কিছুক্ষণ যাওয়ার পর এখানকার রেলস্টেশন পেয়ে গেলাম। বন্ধুকে অনেকবার কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বিদায় দিয়ে রেলস্টেশনে গিয়ে দেখি, আমাদের ট্রেন দাঁড়িয়ে। ট্রেনের নাম প্যাসিফিক সার্ফলাইনার। স্টেশনের ভেতর থেকে ভেন্ডিং মেশিনে কফি নিয়ে ট্রেনে উঠতে না উঠতেই ট্রেন ছেড়ে দিল। আমরা আরাম করে দোতলায় বসলাম।

মার্কিন মুলুকে সফর কাহিনি—২য় পর্ব

কী সুন্দর দৃশ্য দুপাশে। ট্রেনটা অল্পক্ষণের মধ্যে উপকূল ঘেঁষে যাওয়া শুরু করল। আমরা অনেক ওপরে আর ট্রেন থেকে খাড়া ঢালের উপকূলের যে দৃশ্য, তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। যাকে বলে sensory overload.

আমরা অসাধারণ উপকূল আর পাহাড়ি পথ পার হয়ে আস্তে আস্তে লস অ্যাঞ্জেলেসের কাছাকাছি যেতে থাকলাম। লস অ্যাঞ্জেলেস শহরটা আসলে লম্বালম্বি ভীষণ দীর্ঘ। প্রায় ১০০ কিলোমিটার। আর প্রস্থেও বেশ। আমরা একটার পর একটা ছোট শহর পাড়ি দিতে থাকলাম। ট্রেনটা ভরেও না, আমেরিকাতে লোকেরা ইউরোপীয়দের মতো ট্রেনে ওঠে না।

আমরা ততক্ষণে লস অ্যাঞ্জেলেসের উপশহরগুলোতে ঢুকে গেছি। রাত নেমে এল, আমরা প্রায় রাত ১০টার দিকে লস অ্যাঞ্জেলেস ইউনিয়ন স্টেশনে এসে পৌঁছালাম। সেখানে আমার সহযাত্রীর চাচাতো ভাইয়ের ঠিক করে রাখা উবারে আমরা তার বাসায় আসতে আসতে রাত ১১টা। বাসা লস অ্যাঞ্জেলেসের পুবের উপশহর র‍্যাঞ্চো কুকুমাংগা। অদ্ভুত নাম না? আপনারা আবার ভাববেন না যে আমি বানিয়ে বানিয়ে বলছি। এটার নাম আসলেই কুকুমাংগা আর এটা আফ্রিকার কোনো গহিন জঙ্গল নয়। সহযাত্রীর চাচাতো ভাইয়ের বাসায় পৌঁছে পকেটে হাত দিয়ে দেখি, আমার প্রায়োরিটি কার্ড গায়েব। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও পেলাম না। ভাগ্য ভালো, আমার ক্রেডিট কার্ড হারায়নি। এটা নিশ্চয়ই ভেন্ডিং মেশিনে কফি কেনার সময় পকেট থেকে পড়ে গেছে। মন ভীষণ খারাপ। এখন আমরা ফিরতি পথে লাউঞ্জে যাব কীভাবে? মনের মধ্যে খচখচানি নিয়ে রাতের খাবার খেতে গিয়ে দেখি, এলাহি আয়োজন। এত্ত খাবার, সব দেশি। এত্ত মজার খাবার, না খাওয়াটা খারাপ দেখায়। তাই গোগ্রাসে গিলতে লাগলাম।

খাবার শেষে সহযাত্রীর স্টাইলিশ চাচাতো ভাই আমাদের তার হুড খোলা স্পোর্টস কারে তার শহর দেখাতে বের হলো। উনার গাড়ি চালানোর স্টাইল হচ্ছে গ্রা’পি বা এফ১ সার্কিটে যেমন করে গাড়িগুলোকে এঁকেবেঁকে চালানো হয়, সেভাবে। আমি তো স্থির হয়ে গাড়িতে বসে থাকতেই পারছিলাম না। এত দ্রুত উনি বাঁক নেন। বাপ রে। জান হাতে করে বাসায় পৌঁছে আমি দিলাম ঘুম আর আমার সহযাত্রী তার ভাইয়ের সঙ্গে এত বছর পর দেখা হওয়ার পর জমে থাকা কথা সঙ্গে শৈশবের স্মৃতিচারণায় ব্যস্ত হয়ে পরল।

আমাদের লস অ্যাঞ্জেলেসে দুই দিন থাকার কথা। পরদিন ঘুম থেকে উঠে সকালে বেশ বড়সড় নাশতা হলো। কাকতালীয়ভাবে এ উপশহরের বাসিন্দা হচ্ছে আমাদের এক পুরোনো সহকর্মী। তিনি কিছুদিন আগে সপরিবার এ দেশে এসে এ উপশহরে আত্মীয়স্বজনের কাছাকাছি ঘাঁটি গেড়েছেন। এখানকার স্কুল ডিস্ট্রিক্ট নাকি খুবই ভালো। উনি পড়ুয়া মানুষ। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মতো একঘেয়ে চাকরিও করতেন।

একপর্যায়ে একঘেয়েমির গ্যাঁড়াকল থেকে বাঁচতে আর ছেলেমেয়েদের উন্নত শিক্ষার জন্য তাঁর এই সুদূর মার্কিন দেশে আগমন।

মার্কিন মুলুকে সফর কাহিনি—১ম পর্ব: ঢাকা থেকে নিউইয়র্ক

তাঁকে কল করে আনা হলো, তিনি শিক্ষানবিশ গাড়িচালক। ধীরে ধীরে গাড়ি চালিয়ে এ বন্ধের দিনে হাজির হলেন আমাদের আবাসে। তাঁকে পেয়ে আমাদের ভীষণ উল্লাস। তাঁকে নিয়ে আমরা হাজির হলাম এ এলাকার বিশাল শপিং ডিস্ট্রিক্ট ভিক্টোরিয়া গার্ডেনসে। কী বিশাল আর সুন্দর। আমরা বিমোহিত। সেখানে হালকা কিছু শপিং শেষে দুপুরের খাবারের জন্য আবাসে ফিরলাম। সবাই মিলে খাবার খেয়ে সহকর্মীকে বিদায় জানালাম। এরপর আমরা বিশাল এক গাড়িতে চড়ে লস অ্যাঞ্জেলেস দেখতে বের হলাম। সবার আগে গেলাম বিখ্যাত গ্রিফিত অবজারভেটরিতে। এখানেই লা লা ল্যান্ডের কিছু শুটিং হয়েছিল। পাহাড়ের ওপর কি সুন্দর এটা। এখান থেকে আকাশ দেখা যায় যেমন, তেমনি দেখা যায় গোটা লস অ্যাঞ্জেলেসটাও। এই উঁচু পাহাড় থেকে হলিউড লেখাটাও দেখা যায়। সেটা দেখে সেখানে যাওয়ার সাধ হলো। তাই পাহাড়ের ঢালু পথ বেয়ে নেমে গাড়িতে গেলাম হলিউড। গাড়িটা পার্কিংয়ে রেখে এরাস্তা–ওরাস্তা করে পুরো শহরটা চক্কর দিলাম। ফুটপাতের কিছু স্টারগুলোতে পরিচিত কিছু অভিনেতার নাম খুঁজে পেলাম। মাইকেল জ্যাকসনেরটার সামনে ছবিও তুললাম। এরপর গাড়িতে গেলাম ইউনিভার্সাল স্টুডিও সিটি ওয়াকে। আমাদের হাতে সময় ছিল না বলে আর সঙ্গে বাচ্চাকাচ্চা না থাকাতে আমরা পাশের ইউনিভার্সাল স্টুডিওতে ঢুকিনি। সন্ধ্যাটা সেখানে কাটিয়ে আরেক বিখ্যাত রাস্তা মুলহল্যান্ড ড্রাইভ দিয়ে গাড়ি চালিয়ে আবাসে ফেরত এলাম। ততক্ষণে অনেক রাত। রাতের খাবার খেতে আমরা আগে থেকে ঠিক করে রাখা এক উচ্চমার্গের মেক্সিকান খাবারের রেস্তোরাঁতে গেলাম।

আমরা যে লস অ্যাঞ্জেলেসে এসেছি, এটা আবার চাউর হয়ে গেছে আমার সহযাত্রীর আত্মীয়দের মধ্যে। তাই খাবারের মধ্যেই খবর এল যে তাকে রাতে থাকার জন্য নিয়ে যাওয়ার জন্য তার মামা হাজির চাচাতো ভাইয়ের বাসায়। ভীষণ অবস্থা। খাবার তাড়াতাড়ি শেষ করে আমরা দ্রুত মালপত্র গুছিয়ে রওনা দিলাম শহরের উত্তর প্রান্তে। জায়গার নাম থাউজ্যান্ড ওক। প্রায় ১০০ কিলোমিটারের ধাক্কা। মামার টেসলাতে গন্তব্য দিয়ে অটো মোড চালু করে গল্প করতে করতে আমরা ভীষণ বেগে হাইওয়ে ধরে বাসার দিকে এগোলাম। যাওয়ার পথে প্যাসেডিনা শহরটা হয়ে গেলাম। এর সিটি হলটার ভবনের যে ক্লক টাওয়ার, সেটাতে স্প্যানিশ একটা ছোঁয়া আছে।

রাতের প্যাসাডিনা ছেড়ে আমরা এসে পৌঁছালাম মামার আবাসে, এখানে থাকব আমরা দেড় দিন।

আগামীকাল সারা দিন এদিককার লস অ্যাঞ্জেলেস ঘুরেফিরে পরদিনের চায়না ইস্টার্ন ফ্লাইটে সাংহাই কুনমিং হয়ে ঢাকা। সাংহাই আর কুনমিং আমি আগেও গেছি, তাই এবার কী কী করব, সেটা ভাবতে ভাবতে সে রাতের জন্য ঘুমাতে গেলাম।

কিন্তু ঘুমাতে যাওয়ার আগে মামার মন রক্ষার্থে আমাদের আরেক প্রস্থ খানা খেতে হলো। তার নিজের হাতের তৈরি কাচ্চি বিরিয়ানি সঙ্গে আরও কত কি। এত ভরপেট, ঘুম হবে কীভাবে? আজব হলেও সত্যি, আমি নাকি সে রাতে ভীষণ নাক ডাকিয়ে ঘুমিয়েছিলাম।

উঠতে উঠতে দেরি হয়ে গিয়েছিল। আজ একদম ফ্রি দিন, সারা দিন এলোমেলো ঘুরব আর মন খুলে শপিং করব। কিন্তু সে গল্প পরের পর্বে।