আন্তরিকতা আর ভালোবাসার প্রতিদানে যদি মেলে শুধু নিষ্ঠুরতা আর অপমান, মানুষের মন ভেঙে পড়ে। কিন্তু ইসলাম আমাদের দেখায়, মানুষের প্রত্যাখ্যান যেখানে শেষ হয়, আল্লাহর রহমত সেখান থেকে শুরু।

সৌদি আরবের তায়েফ শহরে আজও দাঁড়িয়ে আছে একটা ছোট্ট, শ্বেতশুভ্র মসজিদ, নাম ‘মসজিদ আদদাস’। মসজিদটি একটি ইট-পাথরের স্থাপনা মনে হলেও ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাদায়ক সফরের শেষে জ্বলে ওঠা এক আধ্যাত্মিক প্রদীপের স্মারকও বটে।

সে বছর ‘দুঃখের বছর’

নবুয়তের দশম বছর ছিল নবীজির (সা.) জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়; সিরাতে যাকে বলা হয় ‘আমুল হুজন’ (দুঃখের বছর)। এ বছর তিনি হারান তাঁর সবচেয়ে বড় আশ্রয়স্থল চাচা আবু তালিব ও পঁচিশ বছরের সঙ্গী হজরত খাদিজাকে।

মক্কার নির্যাতন যখন সীমা ছাড়িয়ে গেল, তিনি একটা নিরাপদ ঘাঁটির আশায় মক্কা থেকে প্রায় আশি কিলোমিটার দূরে পাহাড়ি শহর তায়েফের দিকে পা বাড়ালেন। (ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩/১৩২, দারু হিজর, কায়রো, ১৯৯৭)

তারা শহরের বখাটে ছেলেপেলে আর দাসদের লেলিয়ে দেন নবীজির পেছনে। তারা পাথর ছুড়তে থাকে, নবীজির পবিত্র শরীর রক্তাক্ত হয়ে যায়, জুতাও রক্তে ভিজে ওঠে।

কিন্তু তায়েফের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা দাওয়াত গ্রহণ তো দূরের কথা, চরম উপহাসের সাথে তাঁকে ফিরিয়ে দেযন। তারা শহরের বখাটে ছেলেপেলে আর দাসদের লেলিয়ে দেন নবীজির পেছনে। তারা পাথর ছুড়তে থাকে, নবীজির পবিত্র শরীর রক্তাক্ত হয়ে যায়, জুতাও রক্তে ভিজে ওঠে।

পরবর্তী সময়ে আয়েশা (রা.) একবার জিজ্ঞেস করেছিলেন, ওহুদের দিনের চেয়েও কঠিন কোনো দিন কি তাঁর জীবনে এসেছিল? জবাবে নবীজি তায়েফের এই দিনের কথাই বলেছিলেন; যা তাঁর জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ ও যন্ত্রণাকাতর দিন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩২৩১)

সা’দ ইবনে মুআজের রুমাল

এক পাত্র আঙুর

এই ক্ষত নিয়ে, তায়েফবাসীর প্রত্যাখ্যান সয়ে মক্কার পথে ফেরার সময় ক্লান্ত-বিধ্বস্ত নবীজি একটি আঙুর বাগানের দেয়ালে পিঠ দিয়ে বসলেন। বাগানের মালিক ছিলেন কোরাইশের দুই শীর্ষ সর্দার, উতবা আর শাইবাহ ইবনে রাবিয়া। যারা ছিলেন ইসলামের ঘোর শত্রু এবং পরে বদরে নিহত হন।

কিন্তু তখন নবীজিকে এই রক্তাক্ত অবস্থায় দেখে তাদের ভেতরে মানবিক তাড়না জেগে ওঠে। তারা তাদের খ্রিস্টান দাস আদদাসকে দিয়ে এক থোকা তাজা আঙুর পাঠান, যেন তিনি কিছুটা ক্লান্তি দূর করতে পারেন। (ইবনে হিশাম, আস–সিরাত আন–নাবাবিয়্যাহ, ২/৭০, দারুল জিল, বৈরুত, ১৯৯১)

আজও তায়েফে যারা বেড়াতে যান, তারা মসজিদ আদদাসের শান্ত পরিবেশ দেখে মুগ্ধ হন, অস্থির হৃদয়ে সান্ত্বনা লাভ করেন

শব্দে শব্দে বিস্ময়

আদদাস যখন আঙুরের পাত্র নবীজির সামনে রাখল, তিনি খাওয়ার আগে বললেন, ‘বিসমিল্লাহ্’ (আল্লাহর নামে শুরু করছি)। শুনে আদদাসকে থমকে গেল। তায়েফ বা মক্কার পৌত্তলিকরা এভাবে কথা বলে না।

সে বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘এই উপত্যকার মানুষ তো এমন কথা বলে না। আপনি কে?’

নবীজি পাল্টা প্রশ্ন করলেন, ‘তোমার আদি বাড়ি কোথায়, তোমার ধর্ম কী?’ আদদাস জবাব দিল, ‘আমি ইরাকের নিনেভা শহরের এক খ্রিষ্টান।’ (ইবনুল আসির, আল-কামিল ফিত-তারিখ, ১/৬৬০, দারুল কিতাব আল-আরাবি, বৈরুত, ১৯৯৭)

নিনেভার নাম শুনে নবীজির রক্তাক্ত মুখেও এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। তিনি বললেন, ‘তুমি তবে সেই পুণ্যবান নবী ইউনুস ইবনে মাত্তার শহরের লোক!’

আদদাস আরও অবাক, এই মরুভূমির মানুষ ইউনুসের নাম জানার কথা নয়। নবীজি বললেন, ‘ইউনুস ছিলেন আমার ভাই। তিনি ছিলেন আল্লাহর নবী, আমিও আল্লাহর নবী।’

এই একটি বাক্য জাগিয়ে তুলল আদদাসের ভেতরের ঘুমিয়ে থাকা বিশ্বাস। সে বুঝে গেল, সামনে বসা মানুষটি মক্কার কোনো সাধারণ নেতা নন। তিনি সেই শেষ নবী, যাঁর কথা তার নিজের কিতাবেও লেখা আছে।

সে নবীজির হাতে, পায়ে, কপালে চুমু খেতে লাগল। দূর থেকে সেই দৃশ্য দেখে উতবা-শাইবা আফসোস করে বলল, ‘সর্বনাশ, লোকটা আমাদের দাসকেও নষ্ট করে দিল!’

‘আপনি নাগরিক এই শহরের’

ফিরে আসার পর তারা আদদাসকে জিজ্ঞেস করল, কেন সে ওভাবে চুমু খাচ্ছিল। আদদাস দৃঢ়ভাবে জবাব দিল, ‘এই পৃথিবীতে এই মানুষটির চেয়ে উত্তম আর কেউ নেই। তিনি আমাকে এমন এক সত্য বলেছেন, যা একজন নবী ছাড়া কেউ জানতে পারে না।’ (ইবনে হিশাম, আস–সিরাত আন–নাবাবিয়্যাহ, ২/৭১, দারুল জিল, বৈরুত, ১৯৯১)

এই তাৎক্ষণিক ইসলাম গ্রহণ ছিল তায়েফের সেই অন্ধকার দিনে আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা এক টুকরো সান্ত্বনা। সেই আঙুর বাগানের জায়গাতেই পরে গড়ে ওঠে একটি মসজিদ—মসজিদে আদদাস।

বাহ্যিক ব্যর্থতার আড়ালে আসলে সফলতা লুকিয়ে থাকে। পুরো তায়েফ শহর নবীজিকে তাড়িয়ে দেয়, অথচ আল্লাহ ঠিক তখনই একজন সাধারণ দাসের অন্তর খুলে দেন।

ইতিহাস আজও কথা বলে

ইতিহাসের এই ঘটনা আমাদের বলে:

১. বাহ্যিক ব্যর্থতার আড়ালে আসলে সফলতা লুকিয়ে থাকে। পুরো তায়েফ শহর নবীজিকে তাড়িয়ে দেয়, অথচ আল্লাহ ঠিক তখনই একজন সাধারণ দাসের অন্তর খুলে দেন।

২.‘বিসমিল্লাহ্’-এর মতো একটা ছোট্ট অভ্যাসও কতটা গভীর প্রভাব ফেলতে পারে, তা এই ঘটনা প্রমাণ করে। একটি শব্দই একজন অমুসলিমের মনের বন্ধ দুয়ার খুলে দিয়েছিল।

৩. এখানে সামাজিক বিভেদের কোনো জায়গা ছিল না। নবীজি ছিলেন মক্কার সবচেয়ে অভিজাত বংশের মানুষ, আদদাস ছিল ভিনদেশী দাস। তবু নবীজি তার উপহার সানন্দে নিলেন, সমতার সাথে কথা বললেন।

কোরআনে বলেছে, ‘হে মানবজাতি, নিশ্চয়ই আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী থেকে এবং তোমাদের বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অপরকে চিনতে পারো। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সেই সবচেয়ে বেশি মর্যাদাসম্পন্ন, যে সবচেয়ে বেশি খোদাভীরু।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত: ১৩)

৪. নবী ইউনুসকে নিজের ভাই বলে সম্বোধনের মধ্য দিয়ে নবীজি দেখিয়ে দিলেন, যুগে যুগে সব নবীই একই ঐশ্বরিক সত্যের বার্তা বহন করেছেন। নবুয়তের এই ধারাবাহিকতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।

৫. সবচেয়ে যন্ত্রণার মুহূর্তেও নবীজির মনোযোগ ছিল অন্যের হেদায়েতের দিকে, নিজের কষ্টের দিকে নয়। রক্তাক্ত অবস্থাতেও তিনি আদদাসের সাথে রাগ করেননি, বিরক্তি দেখাননি, বরং তাকে সময় দিয়েছেন।

তাই আজও তায়েফে যারা বেড়াতে যান, তারা মসজিদ আদদাসের শান্ত পরিবেশ দেখে মুগ্ধ হন, অস্থির হৃদয়ে সান্ত্বনা লাভ করেন।

বুঝতে পারেন, যখন দুনিয়ার সব মানুষ বিপক্ষে চলে যায়, চারপাশ তাড়িয়ে দেয়, তখনও আল্লাহর রহমতের একটা আঙুরের থোকা আর একজন বিশ্বস্ত আদদাস কোথাও না কোথাও অপেক্ষা করে থাকে।

বদর যুদ্ধের নেপথ্যে: রহস্যময় কিছু স্বপ্ন ও তার ব্যাখ্যা