ময়মনসিংহ নগরের একটি ভাড়া বাসা থেকে রাজিব আহম্মেদ ওরফে রুবেল (৪০) নামের এক যুবকের গলাকাটা ও রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। রোববার বেলা দুইটার দিকে নগরের ৩৬ বাড়ি কলোনি এলাকা থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

হত্যাকাণ্ডের আগে সড়কে নিহতের চাচাতো ভাইয়ের মোটরসাইকেল আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। প্রকাশ্যে এ ঘটনা ঘটলেও কেউ মুখ খুলছেন না। তবে জড়িত সন্দেহে দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ। নিহত রাজিব আহম্মেদ স্থানীয়ভাবে ‘কাইল্যা রুবেল’ নামে পরিচিত। তিনি নগরের আরকে মিশন রোড এলাকার প্রয়াত আবদুল হামিদের ছেলে।

রাজিব আহম্মেদ

পুলিশ ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, প্রায় এক মাস আগে নতুন ভাড়াটিয়া হিসেবে ৩৬ বাড়ি কলোনির বাসিন্দা ইসমাইল হোসেনের স্ত্রী পারুল আক্তারের বাসায় উঠেছিলেন নিহত রাজিব। এখানে নিজের বন্ধুদের নিয়ে থাকতেন। আজ সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রাজিবকে নিজ ঘরে গলা কেটে হত্যা করা হয়। এর আগে বাসার সামনের সড়কে থাকা রুবেলের চাচাতো ভাই মো. শুভর একটি মোটরসাইকেল আগুনে পুড়িয়ে দেয় হামলাকারীরা।

খবর পেয়ে বেলা দেড়টার দিকে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, পুড়ে যাওয়া মোটরসাইকেলটি দেখছেন অনেকে। পাশের বাসার এক দম্পতি বলেন, ‘আমরা তখন ঘুমিয়ে ছিলাম। মোটরসাইকেলে আগুন দিলে ধোঁয়া ঘরে যেতে শুরু করলে ঘর থেকে বেরিয়ে দেখি সেটি জ্বলছে।’ কারা আগুন দিয়েছে প্রশ্ন করতেই তাঁরা কিছু না বলে বাসার ভেতরে চলে যান।

কলোনির ভেতরে পারুল আক্তারের পাঁচ কক্ষের বাসার একটি কক্ষে ভাড়া থাকতেন রাজিব আহম্মেদ। বাসাটিতে গিয়ে পুলিশের উপস্থিতি পাওয়া যায়। স্টিলের একটি দরজার কাটা অংশ দিয়ে ভেতরে দেখা যায়, বিছানায় রক্তাক্ত মরদেহ। মাথার কাছে একটি মদের বোতল। তাঁর বিরুদ্ধে মাদক মামলাসহ একাধিক মামলা আছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

স্বামীর সঙ্গে সম্পর্ক ভালো না থাকায় তিন ও আট বছর বয়সী দুই ছেলেকে নিয়ে বাবার বাড়িতে থাকতেন রাজিবের স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস। স্বামীকে হত্যার খবর পেয়ে মরদেহ দেখতে আসেন। তিনি বলেন, ‘আমার সঙ্গে সম্পর্ক ভালো ছিল না। এখানে বন্ধুদের সঙ্গে থাকত। এখানে বাড়িওয়ালার সঙ্গে ঝামেলা ছিল। কিছুদিন আগে আমি এসে বাড়িওয়ালার সঙ্গে ঝামেলা দেখে চলে যাই। এরপর দুই-তিন দিন আগে একদিন মুঠোফোনে কথা হয়েছিল। আজ খবর পাই, স্বামীকে মেরে ফেলেছে। কারা কী কারণে হত্যা করেছে, কিছুই জানি না। কী কারণে ঝামেলা চলছিল, তা কিছুই বলেনি।’

ময়মনসিংহের ৩৬ বাড়ি কলোনি এলাকায় রাজিব আহম্মেদ নামের একজনকে হত্যার খবরে ঘটনাস্থলে স্বজনদের আহাজারি। রোববার দুপুরে

রাজিব যে বাসায় ভাড়া থাকতেন ঘটনার পর সেই বাসার সব ভাড়াটিয়া ও বাসার মালিক পারুল আক্তার পলাতক। পারুল ও তাঁর ছেলেদের হত্যাকাণ্ডে সন্দেহ করছেন স্বজনেরা। নিহতের বোন রুনা আক্তার বলেন, ‘আমার ভাইকে খুন করার খবর পেয়ে এসেছি। আমরা জানি এই বাসায় ভাড়া থাকে। এই বাসার লোকজনই আমার ভাইকে মেরেছে। কিন্তু কেন মেরেছে, সে বিষয়ে কিছু জানি না।’

রাজিবের আরেক বোন হালিমা আক্তার বলেন, ‘মুঠোফোনে হত্যার খবর পেয়ে এখানে আসি। আমার ভাই সুস্থ ছিল। আমার ভাইকে গতকাল রাতে পর্যাপ্ত নেশা খাইয়ে এই কাণ্ড করেছে। তার সঙ্গে যারা ছিল, তারাই এ কাজ করেছে। কেন মারল, তা আমরা বলতে পারব না। ভাই হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চাই।’

স্থানীয় অন্তত ১৫ জনের সঙ্গে কথা বলে কারা ঘটনা ঘটিয়েছে তা জানার চেষ্টা করা হয়; কিন্তু প্রকাশ্যে মোটরসাইকেলে আগুন দিয়ে ঘরে গিয়ে গলা কেটে হত্যায় কারা নেতৃত্বে দিয়েছে, সে বিষয়ে কেউ মুখ খুলছেন না। তবে বাড়িওয়ালা নারীর সঙ্গে মাদক ব্যবসা ও অভ্যন্তরীণ কিছু বিষয় নিয়ে বিরোধের জেরে তাঁর চার ছেলে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন বলে স্থানীয় একটি সূত্র জানিয়েছে।

ঘটনাস্থলে পুলিশ, সিআইডি ও পিবিআই টিম কাজ করেছে। ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ কামরুল হাসান বলেন, ‘সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট আলামত সংগ্রহ করেছে। আমরা কিছু তথ্য পেয়েছি, সে অনুযায়ী হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচনে কাজ শুরু করেছি। ইতিমধ্যে আমরা মো. রনি ও সজল নামের দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নিয়েছি। কী কারণে হত্যা করা হয়েছে, এ বিষয়ে পরবর্তী সময়ে জানানো হবে।’