উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনকে ঘিরে রহস্যের শেষ নেই। তবে সবচেয়ে আলোচিত রহস্যগুলোর একটি হলো তার মা কো ইয়ং হুইকে ঘিরে নীরবতা।

ক্ষমতায় আসার প্রায় ১৫ বছরেও কিম জং উন প্রকাশ্যে একবারও তার মায়ের নাম উচ্চারণ করেননি। বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে রয়েছে উত্তর কোরিয়ার শাসনব্যবস্থার বৈধতা এবং কিম পরিবারের তথাকথিত ‘পেকতু রক্তধারা’ ঘিরে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক মিথ।

পেকতু রক্তধারা: ক্ষমতার ভিত্তি

উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রচারণায় কিম পরিবারের ক্ষমতার বৈধতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘মাউন্ট পেকতু’কে কেন্দ্র করে। সীমান্তবর্তী এই পর্বতকে কোরীয় জাতির পৌরাণিক জন্মস্থান হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।

রাষ্ট্রীয় বর্ণনা অনুযায়ী, উত্তর কোরিয়ার প্রতিষ্ঠাতা কিম ইল সাং জাপানি শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামের সময় এই পর্বতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তার ছেলে কিম জং ইলের জন্মও নাকি সেখানেই হয়েছিল, যদিও অনেক গবেষকের মতে তার প্রকৃত জন্মস্থান ছিল রাশিয়া।

এই ‘পবিত্র রক্তধারা’র উত্তরাধিকারী হিসেবেই কিম জং উনের ক্ষমতায় আরোহনকে ব্যাখ্যা করে পিয়ংইয়ং।

মায়ের পরিচয় কেন অস্বস্তির?

কিন্তু কিম জং উনের মাতৃপরিচয় এই রাষ্ট্রীয় বয়ানের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না।

তার মা কো ইয়ং হুই ১৯৫২ সালে জাপানের ওসাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা-মা মূলত বর্তমান দক্ষিণ কোরিয়ার জেজু দ্বীপের বাসিন্দা ছিলেন। জাপানে বসবাসকারী কোরীয় বংশোদ্ভূতদের একটি অংশের সদস্য ছিলেন তারা।

পরবর্তীতে পরিবারটি উত্তর কোরিয়ায় চলে আসে। সে সময় হাজার হাজার কোরীয় অভিবাসী উন্নত জীবনের আশায় উত্তর কোরিয়ায় পুনর্বাসিত হয়।

তবে উত্তর কোরিয়ার সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসে এই অভিবাসীদের ‘জায়নিচি’ বা অবিশ্বস্ত শ্রেণির অংশ হিসেবে দেখা হতো। তাদের বিদেশি প্রভাব দ্বারা ‘দূষিত’ বলে মনে করা হতো এবং তারা প্রায়ই বৈষম্যের শিকার হতো।

বিশ্লেষকদের মতে, একজন ‘জাপানফেরত’ নারীর সন্তান দেশের সর্বোচ্চ নেতা—এই বাস্তবতা উত্তর কোরিয়ার প্রচারিত ‘বিশুদ্ধ রক্তধারা’র ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।

প্রেমিকা থেকে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু

কো ইয়ং হুই ছিলেন উত্তর কোরিয়ার বিখ্যাত মানসুদে শিল্পদলের একজন নৃত্যশিল্পী। সেখানেই তার সঙ্গে পরিচয় হয় কিম জং ইলের।

তখন কিম জং ইলের বৈধ স্ত্রী ছিলেন অন্য একজন। এছাড়া তার আরও কয়েকজন প্রেমিকাও ছিলেন। কিন্তু কো ইয়ং হুইয়ের সৌন্দর্য ও নৃত্যকুশলতায় মুগ্ধ হয়ে কিম জং ইল তার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলেন।

তাদের তিন সন্তান জন্ম নেয়, যার মধ্যে ছিলেন কিম জং উন এবং তার বোন কিম ইয় জং।

তবে কো ইয়ং হুই কখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কিম পরিবারের পুত্রবধূ হিসেবে স্বীকৃতি পাননি। উত্তর কোরিয়ার প্রতিষ্ঠাতা কিম ইল সুংও প্রকাশ্যে তার সঙ্গে বা তার সন্তানদের সঙ্গে কখনও দেখা দেননি।

উত্তরাধিকার যুদ্ধ

কিম জং ইলের একাধিক সন্তান থাকলেও শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার উত্তরসূরি হন কিম জং উন।

জ্যেষ্ঠ পুত্র কিম জং নাম দীর্ঘদিন সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচিত হলেও পরে সংস্কারপন্থি মনোভাব এবং বিতর্কিত জীবনযাপনের কারণে নেতৃত্বের দৌড় থেকে ছিটকে পড়েন। ২০১৭ সালে মালয়েশিয়ায় তাকে হত্যা করা হয়।

অন্য ভাই কিম জং চালকেও উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি।

এমন পরিস্থিতিতে কো ইয়ং হুই তার দ্বিতীয় ছেলে কিম জং উনকে উত্তরসূরি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন বলে বিভিন্ন গবেষক ও লেখক দাবি করেছেন।

২০১১ সালে কিম জং ইলের মৃত্যুর পর মাত্র ২৭ বছর বয়সে ক্ষমতায় বসেন কিম জং উন।

এখনও কেন নীরবতা?

বিশ্লেষকদের মতে, কিম জং উনের মায়ের পরিচয় নিয়ে বিতর্কই তার নীরবতার প্রধান কারণ।

উত্তর কোরিয়ায় কিম ইল সুং ও কিম জং ইলের জন্মদিন জাতীয় ছুটি হিসেবে পালিত হলেও কিম জং উনের জন্মদিন এখনো একই মর্যাদা পায়নি। কারণ জন্মদিনকে কেন্দ্র করে তার পারিবারিক ইতিহাস নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠতে পারে।

একই কারণে ক্ষমতায় আসার পর তিনি দ্রুত তার স্ত্রী রি সো জু ও কন্যা কিম জু আই-কে জনসমক্ষে তুলে ধরেন বলে মনে করেন পর্যবেক্ষকেরা। এর মাধ্যমে তিনি নিজের পরিবারের বৈধতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন।

পারমাণবিক বোমার মতো প্রভাব

উত্তর কোরিয়া বিষয়ক সাবেক কূটনীতিক ও গবেষকদের মতে, যদি দেশটির সাধারণ মানুষের কাছে ব্যাপকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় যে কিম জং উনের মা জাপানে জন্ম নেওয়া এক কোরীয় অভিবাসী পরিবারের সদস্য ছিলেন, তাহলে তা শাসক পরিবারের প্রচারিত ‘পবিত্র রক্তধারা’র ধারণাকে বড় ধাক্কা দিতে পারে।

সাবেক উত্তর কোরীয় কূটনীতিক রিউ হিউন-উর ভাষায়, এমন তথ্য ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠলে তা উত্তর কোরিয়ার বংশানুক্রমিক শাসনব্যবস্থার ভিত্তিকেই নড়িয়ে দিতে পারে।

তার মতে, এর প্রভাব উত্তর কোরীয় সমাজে একটি পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণের মতো হতে পারে।

সূত্র: বিবিসি

এমএসএম