ইংল্যান্ড ৩–২ মেক্সিকো
এটাই কি বিশ্বকাপের সেরা ম্যাচ? এমন প্রশ্ন এবার আগেও উঠেছে। মেক্সিকো সিটি স্টেডিয়ামের ম্যাচ নিয়েও একই প্রশ্ন উঠছিল শেষ বাঁশি বাজার আগেই। পাঁচ গোলের এই ম্যাচে কী ছিল না! আক্রমণ, পাল্টা আক্রমণ, লাল কার্ড, পেনাল্টি এবং শেষ বেলায় মেক্সিকানদের কান্না, ইংলিশদের মুখে হাসি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশেষজ্ঞ থেকে সাধারণ দর্শকও বলছিলেন, মেক্সিকো–ইংল্যান্ডের মধ্যে শেষ ষোলোর এই ম্যাচই এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপের সেরা ম্যাচ। যেখানে স্কোরলাইন বলছে ইংল্যান্ড জিতেছে ৩–২ গোলে। তবে ম্যাচটি দেখে থাকলে হৃদয় বলবে মেক্সিকোও হারেনি!
কিন্তু মেক্সিকো সমর্থকদের কাছে নির্মম বাস্তবতা হলো, শেষ বাঁশি বাজার পর কোয়ার্টার ফাইনালে উঠল ইংল্যান্ডই। সেখানে তাদের প্রতিপক্ষ নরওয়ে।
জুড বেলিংহামের ব্যক্তিগত ঝলকে ৩৬ ও ৩৮ মিনিটে পাওয়া দুই গোলে এগিয়ে ছিল ইংল্যান্ড। বিশ্বকাপে চার ম্যাচ পর এই ম্যাচেই প্রথম গোল হজম করে মেক্সিকো। সেটাও তাদের ‘দূর্গ’ আজতেকায়—বিশ্বকাপে যেখানে তারা কখনো হার দেখেনি। স্বাগতিকদের তাই জেগে উঠতেই হতো।
৪২ মিনিটে হুলিয়ান কিনিয়োনেসের গোলে সেই জেগে ওঠার শুরুটাও পেয়ে যায় মেক্সিকো। শুধু সমতায় ফেরা নয়, মেক্সিকো প্রথমার্ধেই এগিয়ে যেতে পারত যদি বাকি সময়ে গোলের অন্তত দুটি সুযোগ নষ্ট না করত। তা না হওয়ায় প্রথমার্ধ শেষে ইংল্যান্ডই এগিয়ে ছিল ২–১ গোলে।

বিরতির পর ৫৪ মিনিটে ১০ জনের দলে পরিণত হয় ইংল্যান্ড। মেক্সিকোর হেসুস গায়ার্দোকে ফাউল করে লাল কার্ড দেখেন ইংল্যান্ডের রাইটব্যাক জ্যারেল কোয়ানসা। স্বাগতিকরা তখন ইংল্যান্ডকে আরও চেপে ধরার মধ্যেই ৬০ মিনিটে পেনাল্টি হজম করে বসে! বক্সের ভেতরে ইংল্যান্ড উইঙ্গার অ্যান্থনি গর্ডনকে ফাউল করেন স্বাগতিক গোলকিপার রাউল রানহেল। স্পটকিক থেকে গোল করে ইংল্যান্ডের এগিয়ে থাকার ব্যবধান ৩–১ করেন হ্যারি কেইন।
নেইমারদের কাঁদিয়ে ইতিহাস গড়লেন হলান্ডরাকী অবিশ্বাস্য চিত্রনাট্য, মেক্সিকো ব্যবধান কমায় সেই কেইনের ভুলেই! ৬৮ মিনিটে মেক্সিকোর ব্রায়ান গুতিয়েরেজকে নিজেদের বক্সে ফাউল করেন কেইন। পেনাল্টি পায় স্বাগতিকরা এবং সেখান থেকে গোল করেন রাউল হিমিনেজ।
ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়রা কোচ টুখেলে কাছ থেকে আলাদা করে ধন্যবাদ পাবেন, ১০ জন নিয়ে দুর্দান্ত ডিফেন্ড করায়। ম্যাচের শেষ আধা ঘণ্টায় ইংল্যান্ডের বক্সে রীতিমতো হামলে পড়েছেন হিমিনেজ–কিনিয়োনেসরা। তখন মনে হচ্ছিল, সমতায় ফেরা মেক্সিকোর জন্য স্রেফ সময়ের ব্যাপার। কড়া মার্কিং ও শট নিতে না দেওয়ার পরীক্ষায় লেটার মার্কস পেয়ে পাস করেছেন নিকো ও’রাইলি–মার্ক গেহিরা।

মেক্সিকো কতটা মরিয়া খেলেছে সেটার প্রমাণ দেবে পরিসংখ্যানও। ৬৬.৮ শতাংশ বল তাদের দখলে ছিল। শট নিয়েছে ২০টি, পোস্টে রাখতে পেরেছে অবশ্য ৫টি। কারণ, ইংল্যান্ডের ডিফেন্ডারদের গায়ে লেগে কর্নারই হয়েছে বেশি। হিসাবও বলছে এ ম্যাচে মেক্সিকো কর্নার পেয়েছে ১২টি, ইংল্যান্ড ২টি। দারুণ তিনটি সেভ করেন ইংল্যান্ডের গোলকিপার জর্ডান পিকফোর্ড। ইংল্যান্ড সে তুলনায় ঠান্ডা মাথায় খেলে ভুল কম করেছে। মাত্র ৬টি শট নিয়ে ৫টি পোস্টে রাখাই তার প্রমাণ।
‘এখানেই শেষ’ বলে কি অবসরই নিলেন নেইমারবজ্রঝড় ও তুমুল বৃষ্টির কারণে ম্যাচটি নির্ধারিত সময়ের চেয়ে এক ঘণ্টা দেরিতে শুরু হয়। সে বৃষ্টির ধারাতেই আজতেকা স্টেডিয়ামে ’৮৬ বিশ্বকাপে সর্বশেষ খেলার দুঃস্বপ্ন ইংল্যান্ড ধুয়ে মুছে ফেলল রোমাঞ্চকর এ জয়ে। ৪০ বছর আগের সেই বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ২–১ গোলে হেরেছিল ইংল্যান্ড। ডিয়েগো ম্যারাডোনার বিশ্বকাপ ইতিহাসে অন্যতম সেরা গোল এবং ‘হ্যান্ড অব গড’ গোলের দুঃস্বপ্ন এতদিন বয়ে বেড়াতে হয়েছে ইংল্যান্ডকে।

ম্যাচ শেষে মিক্সড জোনে কেইন যখন কথা বলতে আসেন তখনই বোঝা গিয়েছে, এই জয়ে ইংল্যান্ড কতটা আনন্দিত। এবার বিশ্বকাপে ৬ গোল করা কেইনের গলা তখন ভেঙে গিয়েছিল। সতীর্থদের সঙ্গে চিৎকার করে তুমুল আনন্দ–উল্লাস করার ফল আর কি! ইংল্যান্ড কোচ টুখেলের গলার স্বর ঠিক থাকলেও চোখেমুখে আনন্দ ঠিকরে বের হচ্ছিল। মিক্সড জোনে সবার আগে মেক্সিকোর প্রশংসায় বলেছেন, ‘পরিস্থিতি যখন কঠিন হয়ে দাঁড়ায়, তখন তারা কখনো হাল ছাড়ে না, বিশ্বাস হারায় না।’
কেইনদের পারফরম্যান্স নিয়ে টুখেল বলেন,‘‘এ মুহূর্তটি আমাদের মনে গেঁথে রাখা উচিত। এটা আজতেকা স্টেডিয়াম, এটা মেক্সিকো, পাগলাটে এক ম্যাচ হলো। আমাদের প্রত্যেকে নিজেদের উজাড় করে দিয়েছে। এই অনুভূতিটা ধরে রাখতে হবে, এখন আমাদের পুরো শক্তি নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার পালা।’
ইংল্যান্ডের সামনে এগিয়ে চলায় পেছনে পড়ে রইল মেক্সিকো। আজতেকার গ্যালারিতে তখন ধীরে ধীরে আরও স্পষ্ট হচ্ছিল কান্নার শব্দ।








