বিশ্বকাপের মঞ্চে কিলিয়ান এমবাপের দিকে তাকালে সবার আগে মাথায় আসে লিওনেল মেসির কথা। দুজনের টুর্নামেন্টের গল্প অবিশ্বাস্য রকম সমান্তরাল, এক অদ্ভুত মায়াজালে জড়ানো।
মেসি যেখানে গোল করছেন, এমবাপেও সেখানে গোল করে জবাব দিচ্ছেন। এমবাপে জালের ঠিকানা খুঁজে নিলে মেসিও পরক্ষণেই গর্জে উঠছেন। ক্রিস্টোফার নোলানের ‘The Prestige’ সিনেমার সেই দুই প্রতিদ্বন্দ্বী জাদুকরের মতো, যারা একে অপরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার এক অনন্ত ও আদিম লড়াইয়ে মেতে আছেন। একজনের জাদুর জবাবে অন্যজন উপহার দিচ্ছেন আরও বড় কোনো বিস্ময়। একই ভাবে এমবাপে এবং মেসি দুজনেরই নামের পাশে এখন জ্বলজ্বল করছে আটটি করে গোল। বিশ্ববাসী স্রেফ মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে দেখছে দুই মহাতারকার এই মহাকাব্যিক দ্বৈরথ।
লড়াইটা শুধু সাফল্যে নয়, ব্যর্থতার গল্পেও যেন এক সুতোয় বাঁধা। একজন যখন সুযোগ নষ্ট করেন, অন্যজনও যেন অলিখিত কোনো নিয়তিতে একই ভাগ্য বরণ করে নেন।
আটলান্টার মাঠে মিশরের বিপক্ষে পেনাল্টি নিতে এগিয়ে গিয়েছিলেন লিওনেল মেসি। ঠিক একইভাবে, ফক্সবরোর মাটিতে মরক্কোর বিপক্ষে পেনাল্টি পায় ফ্রান্সের স্বপ্নসারথি এমবাপে। গ্যালারিতে তখন রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষা, সবাই ধরেই নিয়েছিল নিশ্চিত গোল। এর আগে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে পেনাল্টি মিস করলেও মেসিকে নিয়ে সংশয় ছিল সামান্যই। কিন্তু ফুটবলের বিধাতা অন্য এক নাটক লিখে রেখেছিলেন। মিশরের গোলরক্ষক মোস্তফা শোবেইর আর মরক্কোর দেয়াল ইয়াসিন বুনু; দুজনেই রুখে দিলেন দুই মহারথীর শট। কয়েক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল ফুটবল বিশ্ব। মনে হলো, গ্রহের সেরা দুই মহাতারকাও আসলে আমাদের মতোই রক্ত-মাংসের সাধারণ মানুষ।
তবে সেই মর্ত্যের আলো বেশিক্ষণ স্থায়ী হতে দেননি তারা। মেসি শেষ পর্যন্ত মার্সিডিজ বেঞ্জ স্টেডিয়ামের বিশাল স্কোরবোর্ডে নিজের নাম খোদাই করে মাঠ ছাড়েন। এমবাপ্পেও জিলেট স্টেডিয়ামে দেখান একই রকম রুদ্ররূপ। আর্জেন্টিনা ও ফ্রান্স নিজেদের ড্রয়ের দুই পাশে সমান্তরাল গতিতে ছুটে চলেছে। মহাজাগতিক সব হিসাব-নিকাশ মিলে গেলে হয়তো চার বছর আগের কাতার বিশ্বকাপের মতো আবারও ফাইনালে মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন সাবেক দুই পিএসজি সতীর্থ। সেই রাতের ফাইনালে এমবাপে হ্যাটট্রিক করেও ট্রফির ছোঁয়া পাননি, শেষ হাসি হেসেছিলেন মেসিই।
মেসির এই অপ্রতিরোধ্য ছুটে চলা নিয়ে এমবাপে অবশ্য বলেছেন, ‘লিও সবসময় গোল করে। অতীতেও করেছে, ভবিষ্যতেও করবে। আমি যদি ওর গোলের দিকে নজর দিই, তাহলে আমাকে আরও বেশি পরিশ্রম করতে হবে। তাই আমি মেসি কী করছে, সেদিকে তাকাই না। আমি শুধু আমার দলকে সাহায্য করার কথাই ভাবি।’
কিন্তু এমবাপে যদি এই খতিয়ানে একটু গভীরভাবে চোখ রাখতেন, তবে দেখতেন মিলের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক মস্ত বড় অমিল। তাদের গল্পটা আসলে পুরোপুরি এক নয়।
মেসির এবারের বিশ্বকাপ যাত্রা কাটছে চরম অশান্তি, উদ্বেগ আর বিশৃঙ্খলার বুক চিরে বেরিয়ে আসা কিছু অতিমানবীয় পারফরম্যান্সে। অন্যদিকে এমবাপে খেলছেন এক পরম শান্ত, সুশৃঙ্খল ও নিয়ন্ত্রিত বলয়ে। বিশেষ করে নকআউট পর্বের প্রতিটি ম্যাচে আর্জেন্টিনাকে দিতে হয়েছে অগ্নিপরীক্ষা, অথচ ফ্রান্সের পথটা ছিল অনেকটাই মসৃণ ও রাজকীয়।
বিশ্বকাপের শুরুতেই এই যোজন যোজন পার্থক্যের সুরটা বাঁধা হয়ে গিয়েছিল। সেনেগাল ও ইরাকের বিপক্ষে এমবাপে এবং আর্লিং হালান্ডের অতিমানবীয় পারফরম্যান্সের পর ফুটবল দুনিয়া ধরে নিয়েছিল, মেসিকে এবার একক শক্তিতে অতিপ্রাকৃতিক কিছু একটা করতে হবে। মেসি ঠিক তা-ই করেছিলেন, কানসাস সিটিতে আলজেরিয়ার বিপক্ষে এক স্মরণীয় হ্যাটট্রিক উপহার দিয়ে। কিন্তু সেই মহাকাব্যের পেছনেও ছিল এক কালো মেঘ। গোল করার আগেই আইসা মান্দির ওপর এক ফাউলের কারণে তিনি লাল কার্ড পেয়ে মাঠ ছাড়তে পারতেন। আলজেরিয়া পরবর্তীতে ফিফার কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগও জমা দেয়। সে যাত্রায় ভাগ্যদেবতা মেসির হাত ছাড়েননি। তবে ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজতেই তাকে কান্নায় ভেঙে পড়তে দেখা যায়।
পরবর্তীতে সেই অশ্রুর রহস্য উন্মোচন করে মেসি বলেছিলেন, ‘কয়েকটা কঠিন দিনের মধ্য দিয়ে গিয়েছি। সেটা ফুটবলের কারণে নয়। অন্য কিছু বিষয় আমাকে মানসিকভাবে ভেঙে দিয়েছিল।’
পরে বিশ্ববাসী জানতে পারে, তার পিতা হোর্হে মেসি মারাত্মক অসুস্থ হয়ে চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে ছিলেন। মাঠের যুদ্ধ তখন মেসির জন্য ব্যক্তিগত জীবনের এক নির্মম বেদনার লড়াইও বটে।
রাউন্ড অব ৩২-এর ম্যাচে কেপ ভার্দের বিপক্ষে জাদুকরী বল নিয়ন্ত্রণে আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে নিয়েছিলেন মেসি। মনে হচ্ছিল আকাশী-নীল শিবিরের জয়টা কেবল সময়ের ব্যাপার। কিন্তু ফুটবল তো রূপকথা নয়, চরম বাস্তবতা। কেপ ভার্দে মরণকামড় দিয়ে ম্যাচে ফিরে আসে। লড়াই গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। সেখানে ১০৩ মিনিটে সিডনি লোপেস কাবরালের এক অবিশ্বাস্য গোল আর্জেন্টিনাকে স্তব্ধ করে সমতা আনে। শেষ পর্যন্ত দিনেইয়ের এক আত্মঘাতী গোল কোনোমতে রক্ষা করে আর্জেন্টিনাকে।
মিশরের বিপক্ষে ম্যাচে তো আর্জেন্টিনা একেবারে খাদের কিনারায়, বিদায়ের একদম দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল। দল তখন পিছিয়ে। মেসি যখন পেনাল্টি মিস করলেন, তখন মনে হয়েছিল সব শেষ, চাপ রূপ নিল হিমালয়সম পাহাড়ের। তার পায়ের চিরচেনা শটগুলোও যেন ঠিকঠাক খোলস ছেড়ে বের হতে পারছিল না। কিন্তু মহাতারকারা তো ধ্বংসস্তূপ থেকেই জেগে ওঠেন। শেষ ১০ মিনিটে, দুই গোলে পিছিয়ে থাকা অবস্থায় মেসি প্রথমে রোমেরোর গোলে এক অবিশ্বাস্য অ্যাসিস্ট করলেন, তারপর বার ঘেঁষে এক বুলেট গতির শটে করলেন সমতাসূচক গোল। এরপর ৯৩ মিনিটে যখন এনজো ফার্নান্দেজ জয়সূচক গোলটি করলেন, মেসি মাঠে হাঁটু গেড়ে বসে আবারও আবেগের বন্যায় ভেসে গেলেন।
মেসির এই নরকযন্ত্রণা ও পুনরুত্থানের বিপরীতে ফ্রান্সের যাত্রা আরেকটু মসৃণ। তবে এমবাপে সে দলে খেলেন, সেই দলের যাত্রা তো মসৃণ হবেই। নকআউট পর্বের কোনো ম্যাচেই তাদের অতিরিক্ত সময়ে লড়তে হয়নি, এমনকি রক্ষণভাগ ভেদ করে এখনো কোনো প্রতিপক্ষ গোলই করতে পারেনি।
এমবাপের পথটাও যে একেবারেই কুসুমাস্তীর্ণ ছিল, তা নয়। প্যারাগুয়ে ম্যাচে প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডাররা তাকে নির্মমভাবে টার্গেট করেছিল। মাঠের বাইরেও তাকে সইতে হয়েছে প্যারাগুয়ের এক সিনেটরের জঘন্য বর্ণবাদী আক্রমণ। কিন্তু এত কিছুর পরও মাঠের এমবাপ্পে ছিলেন অবিচল, শান্ত, আত্মবিশ্বাসী এবং এক ভয়ংকর শিকারী।
তার এই নির্ভার থাকার পেছনে বড় কারণ হয়তো তার চারপাশের তারকাবহুল এক দল। যেখানে আছেন ব্যালন ডি’অরজয়ী উসমান দেম্বেলে, যিনি এক নিমেষেই ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারেন। কিংবা মাইকেল অলিসের সঙ্গে তার মাঠের সেই দুর্দান্ত বোঝাপড়া। ফরাসিরা প্রতি ম্যাচে সুযোগ তৈরি করে মুড়িমুড়কির মতো। মরক্কোর বিপক্ষেই তারা শট নিয়েছিল ২২টি। তাই একটি সুযোগ হাতছাড়া হলেও এমবাপে জানতেন, পরের সুযোগটি তার দরজায় কড়া নাড়বেই।
আর ঠিক এই কারণেই পেনাল্টি মিস করার পরও এমবাপের চোখেমুখে কোনো উদ্বেগের রেখা ছিল না। ম্যাচ শেষে ফরাসি সেনাপতি দিদিয়ের দেশম বুক ফুলিয়ে বলেন, ‘খেলোয়াড়দের মনে কিংবা কিলিয়ানের মনে কোনো সন্দেহ ছিল না।’
দিদিয়ের দেশমের সেই আস্থার প্রতিদান এমবাপপে দিয়েছিলেন রাজকীয় ভঙ্গিতেই। ইসা দিয়পকে চোখের পলকে ড্রিবলিংয়ে পরাস্ত করে এবং বুনুর চোখের পলক ফেলার আগেই এক চোখধাঁধানো কার্লিং শটে বল জালে জড়িয়ে দেন।
ম্যাচের শেষ লগ্নে একবার গোড়ালিতে কিছুটা অস্বস্তি অনুভব করায় ডাগআউটের দিকে বদলির ইঙ্গিত দিয়েছিলেন এমবাপে। তবে পরে জানা যায়, সেটি বড় কিছু ছিল না, স্রেফ সতর্কতামূলক একটি সিদ্ধান্ত ছিল। ম্যাচ শেষে তার বুনো, উচ্ছ্বসিত উদযাপনই বলে দিচ্ছিল তিনি কতটা সতেজ। নেচেছেন, লাফিয়েছেন, চওড়া হাসিতে মাতিয়ে রেখেছেন পুরো দলকে। হতাশা বা উদ্বেগ তাকে স্পর্শও করতে পারেনি।
এই বিশ্বকাপে মেসি ও এমবাপের যাত্রাপথ যেন একই বিন্দু থেকে শুরু হয়েও সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি সমান্তরাল রেখা। কোথাও তারা একে অপরের নিখুঁত প্রতিচ্ছবি, আবার কোথাও জীবনের নির্মম বাস্তবতায় একে অপরের থেকে একদম আলাদা। কিন্তু দুজনেরই চোখের মণিতে জ্বলছে একই তৃষ্ণা, ক্যারিয়ারের দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরা। আর এই দুই জাদুকরের শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই ফুটবলপ্রেমীদের আরও অন্তত একটা সপ্তাহ ঘোরগ্রস্ত করে রাখুক, ফুটবল ঈশ্বরের কাছে এটাই এখন বিশ্ববাসীর প্রার্থনা।








