ইতিহাস নিজেই নিজের পুনরাবৃত্তি ঘটায়—বিশ্বকাপে ফ্রান্স-মরক্কো ম্যাচের ফল মানে তো এমন কিছুই। টানা দুই বিশ্বকাপে নকআউট পর্বে ফ্রান্সের কাছে হেরে গেল মরক্কো। তবে আগামী বিশ্বকাপে মরক্কো ভিন্ন গল্প লিখবে বলে আশাবাদী দলটির কোচ মোহাম্মদ ওয়াহবি।

বোস্টনে গতকাল সাড়ে তিন বছর আগে আল বায়েত স্টেডিয়ামের ঘটনারই পুনরাবৃত্তি। সবশেষ ২০২২ ফুটবল বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে মরক্কোকে ২-০ গোলে হারিয়েছিল ফ্রান্স। এবারও ফরাসিরা জিতেছে ২-০ গোলে। পার্থক্য শুধু বোস্টনে গত রাতের ম্যাচটা ছিল কোয়ার্টার ফাইনাল। হারের পর ওয়াহবি বলেন, ‘আজ (গতকাল) এটা যে ফ্রান্সই এখানে শক্তিশালী দল। কিন্তু আমরা আরও উন্নতি করতে পারি। আরও এগিয়ে যেতে পারি। হয়তো চার বছর পর তাদেরই বিদায় করতে পারব।’

সবশেষ কাতার বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে উঠেছিল মরক্কো। যা এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপ ইতিহাসে আফ্রিকার দলগুলোর মধ্যে সেরা সফলতা। এবারও আফ্রিকার দলটি সেই পথেই এগোচ্ছিল। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের বিপক্ষে ১-১ গোলে ড্র করেছিল মরক্কো। আর বিশেষ করে শেষ বত্রিশের মরক্কো-নেদারল্যান্ডস ম্যাচটা যাঁরা দেখেছেন, তাঁরা চাইলেও তা ভুলতে পারবেন না। ডাচদের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তে গোল করে সেটাকে নিয়ে গেল টাইব্রেকারে। পেনাল্টি শুটআউটে ডাচদের বিদায় করে মরক্কোরা ওঠে শেষ ষোলোতে।

শেষ ষোলোতে বিশ্বকাপের সহআয়োজক কানাডাকে বিদায় করে শেষ আটে ওঠে মরক্কো। এবারও আফ্রিকান দলটির ওপরে আশা রাখছিলেন অনেক ফুটবল সমর্থকই। তবে গতকাল বোস্টনে মরক্কোর জয়রথ থামিয়ে দিল ফ্রান্স। ফরাসিদের কাছে হারের পর ওয়াহবি বলেন, ‘অবশ্যই এই পরাজয়ে খেলোয়াড়রা হতাশ। কিন্তু জয়ের জন্য এই মানসিকতাই দরকার। আমরা বিশ্বকাপ জিততে চেয়েছিলাম। আমরা হেরেছি এবং আমাদের যাত্রা শেষ হয়েছে বলে হতাশ, কিন্তু আমাদের দেশের মানুষ আমাদের যে লড়াকু ও অনুপ্রেরণাদায়ক পরিচয় দেখেছে, তাতে তারা খুশি। জয়ের চেষ্টা করা এবং নিজেদের ওপর বিশ্বাস রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’

আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের (আফকন) শিরোপা দুইবার জিতেছে মরক্কো। আফ্রিকান নেশনস চ্যাম্পিয়নশিপেও তিনবারের চ্যাম্পিয়ন দলটি। আর ওয়াহবির অধীনে মরক্কো গতবার অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ জিতেছে। সব কিছু ঝেড়ে ফেলে এখন সামনে তাকাচ্ছেন তিনি। কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নেওয়ার পর মরক্কোর কোচ বলেন, ‘আমরা শুধু এটুকু বলেই থেমে থাকতে পারি না যে এখানে আমাদের অর্জন নিয়ে আমরা খুশি ও গর্বিত। আমাদের সামনে এগোতে হবে, নিজেদের সমালোচনা করতে হবে এবং পরিস্থিতি মূল্যায়ন করতে হবে।’

মরক্কোর গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনু এবার প্রতিপক্ষের অনেক নিশ্চিত আক্রমণ প্রতিহত করেছেন। আর ২৪ বছর বয়সী মিডফিল্ডার ইসমাইল সাইবারি এবারের বিশ্বকাপে তিন গোল করেছেন। তবে ফ্রান্সের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে তিনি খেলতে পারেননি। আছেন আশরাফ হাকিমির মতো অধিনায়ক, যিনি সবশেষ দুইবার পিএসজির হয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতেছেন।

ওয়াহবির আশা বর্তমান মরক্কো দল সামনে আরও অনেক কিছু অর্জন করবে। মরক্কোর কোচ বলেন, ‘আমাদের দলটি তরুণ। এখানে প্রতিভার বিশাল ভাণ্ডার রয়েছে। একটি শক্তিশালী ফুটবল ফেডারেশন রয়েছে। আমরা আরও বিকশিত হতে চাই এবং সেই পথেই এগিয়ে যাব। আমাদের তরুণ খেলোয়াড়রা আরও পরিণত হবে। আমাদের এমন এক দল আছে, যারা ভবিষ্যতে শিরোপা জিততে পারে।’

গত রাতে ২৮ মিনিটে কিলিয়ান এমবাপ্পে পেনাল্টি মিস করার পর দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। নিজে একটি গোল করেছেন। উসমান দেম্বেলেকে দিয়ে এমবাপ্পে একটি গোলও করিয়েছেন। আর এবারের বিশ্বকাপে ফ্রান্স এরই মধ্যে ১৬ গোল করেছেন। যার মধ্যে এমবাপ্পে ও দেম্বেলে করেছেন ৮ ও ৩ গোল।

হারলেও ফ্রান্সের প্রশংসায় কার্পণ্য করেননি ওয়াহবি। কোয়ার্টার ফাইনালের ম্যাচ শেষে মরক্কো কোচ বলেন, ‘ফ্রান্স বল দখলে দারুণ ছিল। তারা আমাদের অনেক সমস্যায় ফেলেছে। আমাদের স্বীকার করতেই হবে যে তারা অসাধারণ একটি দল এবং তাদের খেলোয়াড়রাও দুর্দান্ত। তাই আমরা কোনো অজুহাত খুঁজছি না।’

দেশমের আস্থার দারুণ প্রতিদান দিচ্ছেন শিষ্যরা। এমবাপ্পে ৮ গোল করে চলতি বিশ্বকাপে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে সবার ওপরে। লিওনেল মেসিও ৮ গোল করেছেন। কিন্তু মেসির অ্যাসিস্ট একটি। এমবাপ্পে করেছেন ৩ অ্যাসিস্ট। উসমান দেম্বেলে করেছেন ৫ গোল। এমনকি তাঁর একটি হ্যাটট্রিকও রয়েছে। ফ্রান্সের ১৬ গোলের ১১ গোল তো এমবাপ্পে-দেম্বেলে মিলে ভাগাভাগি করে নিয়েছেন। ক্লাব ফুটবলের দুর্দান্ত ফর্মটা তাঁরা ধরে রেখেছেন বিশ্বকাপেও।