বিশ্বকাপ ফাইনাল মানেই ফুটবলপ্রেমীদের জন্য এক বিশেষ মুহূর্ত। সবাই অপেক্ষায় থাকেন একটি স্মরণীয় ম্যাচ উপভোগ করার জন্য। একজন সাবেক ফুটবলার হিসাবে আমার প্রত্যাশাও থাকবে ফাইনাল যেন হয়ে ওঠে উপভোগ্য ও ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকার মতো একটি লড়াই।

স্পেন খেলবে তাদের স্বাভাবিক গতিময় ফুটবল। দলটির প্রায় সব খেলোয়াড়ই অসাধারণ গতি ও দক্ষতায় সমৃদ্ধ। বল নিয়ন্ত্রণ, কারুকার্য এবং আক্রমণ তৈরির ক্ষেত্রে তারা দারুণ পারদর্শী। অনেক সময় প্রতিপক্ষ কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা গোলের সুযোগ তৈরি করে ফেলে। কোথা

। থেকে কীভাবে আক্রমণ আসবে, সেটি অনুমান করা কঠিন। এই জায়গাটিতে আর্জেন্টিনাকে সতর্ক থাকতে হবে। স্পেনের গতির সঙ্গে আর্জেন্টিনার পরিকল্পনা কতটা কার্যকর হয়, সেটিই হবে বড় পরীক্ষা। প্রয়োজনে তাদের আক্রমণের গতি থামাতে কৌশলী হতে হবে, ফাউল করে হলেও ছন্দ নষ্ট করার চেষ্টা করতে হতে পারে। এটি মূলত দুই ভিন্ন ঘরানার ফুটবলের লড়াই লাতিন আমেরিকার আবেগ ও কৌশল বনাম ইউরোপের আধুনিক পরিকল্পনা ও গতি। দুদলের কোচের জন্যও এটি বড় পরীক্ষা। লুইস দে লা ফুয়েন্তে ও লিওনেল স্কালোনির লড়াইটা অনেকটা ওস্তাদ ও শিষ্যের মুখোমুখি হওয়ার মতো। কারণ এক সময় স্কালোনি কোচিংয়ের পাঠ নিয়েছিলেন দে লা ফুয়েন্তের কাছ থেকেই। এখন সেই সম্পর্কের বাইরে গিয়ে দুজনকেই নিজের দলের জন্য সেরা কৌশল বেছে নিতে হবে। লড়াইটা হবে মেসিদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে ইয়ামালদের গতির।

আর্জেন্টিনা নিজেদের স্বতন্ত্র ফুটবল ধরন দিয়েই এই পর্যায়ে এসেছে। তাদের দলে এমন অনেক খেলোয়াড় আছেন, যারা কঠিন পরিস্থিতিতে জবাব দিতে পারেন। সবাই যখন লিওনেল মেসিকে ঘিরে থাকে, তখন হুলিয়া আলভারেজ, লাওতারো মার্টিনেজ কিংবা এনজো ফার্নান্দেজের মতো খেলোয়াড়রা নিজেদের প্রমাণ করার সুযোগ পান এবং গুরুত্বপূর্ণ সময়ে জ্বলে ওঠেন। অন্যদিকে স্পেনের রদ্রি, পেদ্রি, ইয়ামাল ও কুকুরেয়াদের মতো খেলোয়াড়রাও নিজেদের সামর্থ্যরে প্রমাণ দিয়েছেন। তরুণ এই দলটি ভয়হীন ফুটবল খেলছে। তবে ফাইনালের চাপ তাদের জন্য নতুন অভিজ্ঞতা হতে পারে। শিরোপার মঞ্চে সেই চাপ কতটা সামলাতে পারে, সেটিই বড় বিষয়। এই জায়গায় আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় শক্তি লিওনেল মেসি। এটাই হয়তো তার শেষ বিশ্বকাপ। তাই সর্বকালের সেরা খেলোয়াড় হিসাবে নিজের অবস্থান আরও উঁচুতে নেওয়ার জন্য তিনি এই মুহূর্তটাকে স্মরণীয় করে রাখতে চাইবেন।

আমার দৃষ্টিতে ফাইনালে আর্জেন্টিনা কিছুটা এগিয়ে। কারণ এই দলটি দীর্ঘদিন ধরে একসঙ্গে খেলছে। কোচ স্কালোনিও অনেকদিন ধরে এই দলের সঙ্গে আছেন। খেলোয়াড়দের মধ্যে বোঝাপড়া, বন্ধুত্ব এবং একে অপরের প্রতি আস্থা অনেক বেশি। স্পেনের তুলনায় এই জায়গায় আর্জেন্টিনা কিছুটা এগিয়ে। তবে ফাইনালের চাপ, বিশ্বকাপ জয়ের প্রত্যাশা এবং শিরোপার ভার এসব সামলাতে পারাটাই শেষ পর্যন্ত চ্যাম্পিয়ন নির্ধারণ করবে। যে দল মানসিকভাবে শক্ত থাকতে পারবে, তারাই শেষ হাসি হাসবে। স্পেনের রক্ষণভাগ এই বিশ্বকাপে অন্যতম সেরা। তারা যদি পুরো ম্যাচে অতিরিক্ত গতির ফুটবল খেলতে থাকে, তাহলে শেষ দিকে শারীরিক ক্লান্তি আসতে পারে। সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারে আর্জেন্টিনা। আলভারেজ, ফার্নান্দেজদের মতো খেলোয়াড়রা সেই মুহূর্তে পার্থক্য গড়ে দিতে পারেন। আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগ কিছুটা দুর্বল দেখালেও মাঝমাঠে তারা যথেষ্ট শক্তিশালী। ফাইনালের আত্মবিশ্বাস ও অভিজ্ঞতা তাদের বড় সম্পদ হবে। সব মিলিয়ে এটি হবে দুই ভিন্ন দর্শনের ফুটবলের লড়াই। একদিকে স্পেনের গতি ও তরুণ শক্তি, অন্যদিকে আর্জেন্টিনার অভিজ্ঞতা, ঐক্য এবং মেসির নেতৃত্ব। যে দল চাপ সামলে নিজেদের সেরাটা দিতে পারবে, বিশ্বকাপের ট্রফি উঠবে তাদের হাতেই।