বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ তাঁকে চেনেন লিওনেল মেসির জীবনসঙ্গী হিসেবে। কিন্তু আন্তোনেলা রোকুজ্জো আজ শুধু একজন ফুটবল কিংবদন্তির স্ত্রী নন, তিনি নিজেই একজন সফল উদ্যোক্তা, স্টাইল আইকন এবং ফিটনেস অনুপ্রেরণা। তিন সন্তানের মা হয়েও যেভাবে তিনি নিজের শরীর, স্বাস্থ্য ও ব্যক্তিত্বের যত্ন নেন, তা বিশ্বের অসংখ্য নারীর কাছে অনুসরণীয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আন্তোনেলার প্রতিটি ছবি যেন একটি বার্তা দেয়। ফিট থাকা মানে শুধু রোগা হওয়া নয়, বরং শক্তিশালী, আত্মবিশ্বাসী এবং সুস্থ থাকা। নিয়মিত ব্যায়াম, ভারসাম্যপূর্ণ খাদ্যাভ্যাস এবং রুচিশীল ফ্যাশনের সমন্বয়ই তাঁকে আজকের অবস্থানে নিয়ে এসেছে।

শক্তিশালী শরীর গড়ার মূল চাবিকাঠি

আন্তোনেলার ফিটনেস রুটিনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে আছে ওয়েট ট্রেনিং। তাঁর বিশ্বাস, শরীরের ওজন কমানোর চেয়ে পেশিকে শক্তিশালী ও ভারসাম্যপূর্ণ করে তোলাই বেশি জরুরি। তাই জিমে তাঁর সময়ের বড় অংশই কাটে শক্তি বাড়ানোর ব্যায়ামে।

তাঁর প্রিয় ব্যায়ামগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘হিপ থ্রাস্ট’, যা গ্লুট বা নিতম্বের পেশি শক্তিশালী করার অন্যতম কার্যকর অনুশীলন। নিয়মিত এই ব্যায়াম কোমর, পেলভিক অঞ্চল এবং শরীরের নিচের অংশকে আরও দৃঢ় করে তোলে।

Instagram-এ এই পোস্টটি দেখুন

Antonela Roccuzzo (@antonelaroccuzzo) -এর দ্বারা একটি পোস্ট শেয়ার করা হয়েছে

আরেকটি চ্যালেঞ্জিং ব্যায়াম ‘বুলগেরিয়ান স্প্লিট স্কোয়াট’। আন্তোনেলা নিজেই একে বলেছেন তাঁর সবচেয়ে ‘ভালো লাগে, আবার সবচেয়ে অপছন্দও’ এমন ব্যায়াম। কারণ এটি একই সঙ্গে কোয়াড, হ্যামস্ট্রিং, গ্লুট ও কাফ পেশিতে কাজ করে এবং শরীরের ভারসাম্য ও শক্তি বাড়াতে দারুণ কার্যকর।

নিচের অংশের পেশি আরও শক্তিশালী করতে তিনি নিয়মিত করেন ‘গবলেট স্কোয়াট’, ‘সুমো স্কোয়াট’ এবং ‘জাম্প স্কোয়াট’। বিশেষ করে ‘জাম্প স্কোয়াট’ শরীরের শক্তি বাড়ানোর পাশাপাশি হৃদযন্ত্রকে সক্রিয় রাখে এবং দ্রুত ক্যালরি পোড়াতে সাহায্য করে।
পুরো শরীরের শক্তি বাড়ানোর জন্য তাঁর রুটিনে রয়েছে ‘বারবেল ডেডলিফট’। এই একটি ব্যায়ামেই পিঠ, কোমর, কোর, গ্লুট ও পায়ের বিভিন্ন পেশি একসঙ্গে সক্রিয় হয়। তাঁর টোনড বাহু, শক্তিশালী পিঠ এবং দৃঢ় কোরের পেছনে এই ব্যায়ামের অবদান উল্লেখযোগ্য।

শুধু জিম নয়, যোগব্যায়ামও সমান গুরুত্বপূর্ণ

শুধু ভারোত্তোলনের ওপর নির্ভর করেন না আন্তোনেলা। শরীরকে নমনীয় রাখতে এবং মানসিক চাপ কমাতে তিনি নিয়মিত যোগব্যায়ামও করেন। এ ছাড়া দৌড়ানো, দ্রুত হাঁটা এবং বিভিন্ন ধরনের কার্ডিও অনুশীলন তাঁর দৈনন্দিন রুটিনের অংশ। এসব ব্যায়াম হৃদযন্ত্র সুস্থ রাখে, সহনশীলতা বাড়ায় এবং সারাদিন শরীরকে চাঙা রাখে।

কঠোর ডায়েট নয়, স্বাস্থ্যকর অভ্যাস

ফিটনেস নিয়ে সচেতন হলেও আন্তোনেলা কখনোই কঠোর বা অস্বাভাবিক কোনো ডায়েট অনুসরণ করেন না। বরং তিনি বিশ্বাস করেন, দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ থাকতে হলে প্রয়োজন ভারসাম্যপূর্ণ খাদ্যাভ্যাস। তাঁর প্রতিদিনের খাবারে থাকে উচ্চমানের প্রোটিন, প্রচুর শাকসবজি, মৌসুমি ফল, স্বাস্থ্যকর ফ্যাট এবং পর্যাপ্ত পানি। অন্যদিকে প্রসেসড খাবার, অতিরিক্ত চিনি ও অস্বাস্থ্যকর ফাস্টফুড যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত ব্যায়ামের পাশাপাশি এই ধরনের খাদ্যাভ্যাসই দীর্ঘ সময় সুস্থ ও ফিট থাকার অন্যতম ভিত্তি।

মাতৃত্বের পরও অনুপ্রেরণা

তিন সন্তানের মা হওয়ার পরও আন্তোনেলার ফিটনেস দেখে অনেকেই বিস্মিত হন। তবে তিনি কখনোই রাতারাতি পরিবর্তনের কথা বলেন না। তাঁর মতে, প্রতিদিনের ছোট ছোট অভ্যাসই দীর্ঘমেয়াদে বড় পরিবর্তন এনে দেয়। নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম, স্বাস্থ্যকর খাবার এবং নিজের জন্য কিছু সময় রাখা। এই চারটি বিষয়কেই তিনি সুস্থ জীবনের মূল ভিত্তি মনে করেন।

ফ্যাশনে সরলতা, স্টাইলে অভিজাত্য

ফিটনেসের মতোই ফ্যাশনেও আলাদা পরিচিতি গড়ে তুলেছেন আন্তোনেলা। রেড কার্পেট, ফ্যাশন উইক কিংবা আন্তর্জাতিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাঁর উপস্থিতি সবসময়ই প্রশংসিত হয়। অতিরিক্ত চাকচিক্যের বদলে তিনি বেছে নেন পরিমিত, পরিচ্ছন্ন ও পরিশীলিত স্টাইল। কালো রঙের ক্লাসিক পোশাক, সোনালি আভাযুক্ত গাউন, নিখুঁত টেইলরিং এবং মিনিমাল অ্যাকসেসরিজ তাঁর ফ্যাশনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

আবার সময়ের ট্রেন্ড অনুসরণ করতেও পিছিয়ে নেই তিনি। বার্বিকোর ফ্যাশনে মাথা থেকে পা পর্যন্ত গোলাপি লুকে যেমন নজর কেড়েছেন, তেমনি ইতালির লেক কোমো ভ্রমণে গোলাপি হাই-ওয়েস্টেড প্যান্ট, ম্যাচিং টপ, কালো প্ল্যাটফর্ম হিল ও ছোট কালো ব্যাগের স্টাইলও ফ্যাশনপ্রেমীদের প্রশংসা কুড়িয়েছে।

সমুদ্রের কাছে ফিরে যাওয়া

Instagram-এ এই পোস্টটি দেখুন

Antonela Roccuzzo (@antonelaroccuzzo) -এর দ্বারা একটি পোস্ট শেয়ার করা হয়েছে

ব্যস্ত সময়ের ফাঁকে পরিবারই আন্তোনেলার সবচেয়ে বড় আশ্রয়। লিওনেল মেসি ও তাঁদের তিন সন্তানকে নিয়ে সুযোগ পেলেই তিনি চলে যান সমুদ্রের কাছে। ইবিজা, ক্যারিবিয়ান কিংবা ইউরোপের বিভিন্ন সমুদ্রসৈকতে পরিবারের সঙ্গে কাটানো মুহূর্ত প্রায়ই ধরা পড়ে তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ইয়ট ভ্রমণ, সমুদ্রে সাঁতার কিংবা সূর্যাস্তের সময় পরিবারের সঙ্গে নিরিবিলি সময়। এসবই যেন তাঁদের প্রিয় অবসর।
বিচে আন্তোনেলার স্টাইলও ঠিক তাঁর ব্যক্তিত্বের মতোই স্বাভাবিক ও আত্মবিশ্বাসী। কখনো সাধারণ কালো বিকিনি, কখনো টাই-ডাই, আবার কখনো উজ্জ্বল অ্যাকুয়া গ্রিন বা গোলাপি বিচওয়্যারে দেখা যায় তাঁকে। তবে সবকিছুর চেয়ে বেশি নজর কাড়ে তাঁর স্বতঃস্ফূর্ত হাসি এবং সহজ উপস্থিতি।

নিজের যত্নই সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ

আন্তোনেলা রোকুজ্জোর জীবনধারা একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। ফিটনেস মানে শুধু ওজন কমানো নয়, বরং শরীরকে শক্তিশালী করে তোলা। ডায়েট মানে না খেয়ে থাকা নয়, বরং শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী পুষ্টিকর খাবার খাওয়া। আর ফ্যাশন মানে কেবল দামি পোশাক নয়, বরং নিজের ব্যক্তিত্বকে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তুলে ধরা।

মেসির স্ত্রী হিসেবে নয়, বরং নিজের পরিশ্রম, শৃঙ্খলা এবং জীবনদর্শনের কারণেই আজ আন্তোনেলা রোকুজ্জো বিশ্বজুড়ে লাখো মানুষের অনুপ্রেরণা। তিনি প্রমাণ করেছেন, নিজের শরীর ও মনের যত্ন নেওয়া কোনো বিলাসিতা নয়; এটি একটি সুন্দর, সুস্থ এবং আত্মবিশ্বাসী জীবনের ভিত্তি।

ছবি: ইনস্টাগ্রাম