আজ থেকে ঠিক এক বছর আগে, রাজধানীর স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে দিনের আলোয় সংঘটিত হয়েছিল দেশের সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম নৃশংস এক হত্যাকাণ্ড। ভাঙারি ব্যবসায়ী লাল চাঁদ ওরফে সোহাগকে (৩৯) প্রকাশ্যে পিটিয়ে এবং ইট-পাথর দিয়ে থেঁতলে হত্যা করা হয়। ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।

তবে এখনো এ ঘটনার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়নি। সংশ্লিষ্ট হত্যা মামলাটি বর্তমানে অভিযোগ গঠন পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে আদালত সূত্রে জানা গেছে। আগামী রোববার (১২ জুলাই) অভিযোগ গঠনের শুনানির দিন নির্ধারণ করেছেন বিচারিক আদালত।

সরকারের পক্ষ থেকে মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে পাঠানোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এক বছরেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। আমরা চাই মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা হোক।- বাদীপক্ষের আইনজীবী জিয়াউল হক

মামলার নথিতে উল্লেখ রয়েছে, ২০২৫ সালের ৯ জুলাইয়ের হত্যাকাণ্ডের পরদিন নিহতের বড় বোন মঞ্জুয়ারা বেগম কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন। তদন্ত শেষে একই বছরের ৮ ডিসেম্বর আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হলেও আসামিদের নাম-পরিচয়সহ কিছু বানান ও তথ্যগত ত্রুটি পাওয়া যায়। তাই আদালত অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন।

পরে তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তনের পর সম্পূরক অভিযোগপত্র চলতি বছরের জুন মাসে দাখিল করা হলে আদালত সেটি গ্রহণ করেন। এরপর ২১ জুন মামলাটি বিচারিক কার্যক্রমের জন্য ঢাকার মহানগর চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে বদলি হয়ে ঢাকার প্রথম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে আসে।

আরও পড়ুন

দিনে গড়ে ১০ খুন, থামছে না নারী-শিশু নির্যাতন

একটি হত্যা, শ্বাসরুদ্ধকর জবানবন্দি ও একটি মৃত্যু

যা ঘটেছিল ওই দিন

রজনী বোস লেনের কিছুটা ভেতরে সোহাগের দোকান। সন্ধ্যা ৬টার দিকে তিনি দোকানে আসার পরই সাতটি মোটরসাইকেলে করে লেনে প্রবেশ করে হামলাকারীরা। এরপর সোহাগকে মারধর করতে করতে মিটফোর্ড হাসপাতালের গেটের সামনে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে ইট, বালু ও সিমেন্টের তৈরি পাথরসদৃশ কংক্রিট দিয়ে বারবার আঘাত করে হত্যা করা হয়। এরপর ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ালে মরদেহ টেনেছিঁচড়ে গেটের বাইরে এনে উল্লাস করা হয়।

ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, মিটফোর্ড হাসপাতালের ৩ নম্বর গেট-সংলগ্ন এলাকায় বৃষ্টির পানি জমে থাকা রাস্তায় অর্ধবিবস্ত্র হয়ে পড়ে আছেন সোহাগ। প্রায় নিথর দেহ নিয়ে নড়াচড়ারও উপায় নেই তার। এসময় রাস্তা থেকে একটি বড় কংক্রিটের অংশ হাতে তুলে নেন হালকা আকাশি রঙের শার্ট ও জিন্সের প্যান্ট পরা হামলাকারী রিয়াদ। মাথার ওপরে কংক্রিটের অংশ তুলে সজোরে কোমর আর বুকের মাঝখানে আঘাত করেন তিনি। সোহাগ দুই হাত আর দুই পা ছড়িয়ে রাস্তায় পড়ে থাকেন। এরপর একদম বুক বরাবর আবার আঘাত করলে তিনি আবার রাস্তার একপাশে মুখ ফিরিয়ে নেন। তখন টি-শার্ট আর গ্যাবার্ডিন প্যান্ট পরা আরেক হামলাকারী সজীব একপাশ থেকে হেঁটে এসে আরেকটা বড় কংক্রিটের অংশ মাথায় তুলে মুখ বরাবর আঘাত করেন। এরপর আরেকটি ইট নিয়ে এসে মাথায় আঘাত করেন ছোট মনির। পাশ থেকে আবার মাথায় আঘাত করেন লম্বা মনির, আর এদের ইট এগিয়ে দেন নান্নু।

ইট দিয়ে থেঁতলে হত্যা: এক বছরেও শুরু হয়নি ব্যবসায়ী সোহাগ খুনের বিচারহত্যার শিকার ব্যবসায়ী লাল চাঁদ ওরফে সোহাগ। ছবি: সংগৃহীত

হামলার নেপথ্য কারণ

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্ত মাহমুদ হাসান মহিন মাসে ফিক্সড চাঁদা চাওয়ায় বেঁকে বসেন সোহাগ। এটি নিয়েই দীর্ঘদিনের দুই বন্ধু শত্রুতে পরিণত হন। মূলত মহিন ও টিটন গাজী পরিকল্পনা করেন সোহাগকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে ফেলার। তাদের ধারণা ছিল, ভাঙারি দোকানে অনেক লাভ। সোহাগকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিলে তার ‘সোহানা মেটাল’ নামে দোকানটি তাদের হয়ে যাবে এবং পুরো এলাকার ভাঙারি ব্যবসা তারা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন।

ঘটনার দুইদিন আগে ৭ জুলাই চাঁদা নেওয়ার বিষয়ে সোহাগ ও মহিনের মধ্যে বাগবিতণ্ডা ও হাতাহাতির মতো ঘটনা ঘটে। বিষয়টি জানতে পেরে সোহাগের সঙ্গে যোগাযোগও করে পুলিশ। তখন সোহাগ জানান, মহিনের সঙ্গে ঝামেলা মিটে গেছে। কিন্তু মহিন চুপচাপ বসে থাকেনি। ওইদিনই হত্যার পরিকল্পনা করে টিটনের সঙ্গে। শুরুতে সোহাগকে দোকানেই হত্যার পরিকল্পনা ছিল। এজন্য অস্ত্রও সংগ্রহ করা হয় ছোট মনিরের মাধ্যমে। কিন্তু তারা তখন ‘মব’ দেখে উৎসাহিত হয়। তাদের ধারণা ছিল- সোহাগকে যদি মিটফোর্ডের সামনে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে অনেকে মিলে উল্লাস করা যায় তাহলে ঘটনা অন্যদিকে মোড় নেবে। আর অত্র এলাকার ভাঙারি ব্যবসায়ী, অন্য ব্যবসায়ী, অ্যাম্বুলেন্সচালক, রেস্টুরেন্ট, ফার্মেসি ও ফুটপাতের দোকানগুলোতে অটোমেটিক্যালি কড়া বার্তা চলে যাবে- মহিন গ্রুপের কথা না শুনলে পরিণতি হবে এরচেয়েও ভয়াবহ।

আরও পড়ুন

ঢাকায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণে চ্যালেঞ্জে পুলিশ

ঢাকায় সক্রিয় হাজারো ছিনতাইকারী, ঠেকাতে হিমশিম পুলিশ

দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরের দাবি

মামলার বিষয়টি নিয়ে বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) কথা হয় বাদীপক্ষের আইনজীবী জিয়াউল হকের সঙ্গে। তিনি জাগো নিউজকে জানান, আদালত সম্পূরক অভিযোগপত্র গ্রহণ করেছেন। এখন মামলাটি অভিযোগ গঠনের পর্যায়ে রয়েছে। তাদের প্রত্যাশা, অভিযোগপত্রভুক্ত প্রত্যেক আসামির বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় (ইচ্ছাকৃতভাবে বা জেনেশুনে খুন) অভিযোগ গঠন করা হবে।

তিনি বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে পাঠানোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এক বছরেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। আমরা চাই মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা হোক।’

এদিকে বাদীপক্ষের আরও দাবি, যেসব আসামি এখনো পলাতক রয়েছেন, তাদের দ্রুত গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় আনতে হবে।

চাঁদা না দেওয়ায় পরিকল্পিতভাবে ভাইকে হত্যা করা হয়েছে। হত্যাকারীরা ভাইয়ের মোবাইল ফোন নিয়ে যাওয়ায় ব্যবসার সব হিসাব-নিকাশ ও পাওনার তথ্যও হারিয়ে গেছে।- বোন মঞ্জুয়ারা বেগমের অভিযোগ 

২১ আসামির মধ্যে পলাতক ৮

সম্পূরক অভিযোগপত্রে হত্যাকাণ্ডে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত থাকার অভিযোগে ২১ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে ১০ জনকে অব্যাহতির সুপারিশ করেছে তদন্ত সংস্থা।

অভিযোগপত্র অনুযায়ী, বর্তমানে ১৩ জন গ্রেফতার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। তবে সারোয়ার হোসেন, মনির, অপু, জহির, ইমরান, শারাফাত, হোসেন চৌকিদার ও জিয়াউদ্দিন পলাতক।

তদন্তে বলা হয়েছে, ভাঙারি ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ ও এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে মাহমুদ হাসান মহিন ও সারোয়ার হোসেনের সঙ্গে বিরোধের জের ধরে পরিকল্পিতভাবে সোহাগকে হত্যা করা হয়।

ইট দিয়ে থেঁতলে হত্যা: এক বছরেও শুরু হয়নি ব্যবসায়ী সোহাগ খুনের বিচারব্যবসায়ী সোহাগ হত্যা মামলায় গ্রেফতার চকবাজার থানা যুবদলের সদস্যসচিব পদপ্রার্থী মাহমুদুল হাসান মহিন ও ৩০ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক তারেক রহমান রবিন। ছবি: জাগো নিউজ

সুষ্ঠু ও দ্রুত বিচার দাবি পরিবারের

নিহত সোহাগের বড় বোন ও মামলার বাদী মঞ্জুয়ারা বেগম বলেন, এক বছর পার হলেও এখনো বিচার শুরু হয়নি। আট-নয় মাস ধরে মামলার কার্যক্রম কার্যত স্থবির ছিল। আগামী রোববার অভিযোগ গঠনের শুনানি ঘিরে তারা নতুন করে আশাবাদী হলেও এখনো ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় রয়েছেন।

তিনি জানান, হত্যাকাণ্ডের পর ভাইয়ের একটি ছেলে ও একটি মেয়ের দায়িত্ব এখন তিনি ও তার স্বামী পালন করছেন। সরকারিভাবে কিছু আর্থিক সহায়তা পেলেও তাদের মূল দাবি একটাই- ভাই হত্যার সুষ্ঠু ও দ্রুত বিচার।

আরও পড়ুন

ডার্ক ওয়েব-ক্রিপ্টোতে বাড়ছে মাদক কারবার, ঠেকাতে আসছে ‘সাইবার ফরেনসিক’

শাহজালাল বিমানবন্দর / জাল ভিসা-বডি কন্ট্রাক্ট: বোর্ডিং পাস কীভাবে দিলো বিমান?

মঞ্জুয়ারা অভিযোগ করেন, চাঁদা না দেওয়ায় পরিকল্পিতভাবে তার ভাইকে হত্যা করা হয়েছে। হত্যাকারীরা ভাইয়ের মোবাইল ফোন নিয়ে যাওয়ায় ব্যবসার সব হিসাব-নিকাশ ও পাওনার তথ্যও হারিয়ে গেছে। এদিকে মামলার বাদী হওয়ায় তিনি ও তার পরিবার নিয়মিত হুমকির মুখে রয়েছেন। আসামিদের পক্ষ থেকে মামলা তুলে নিতে সন্তানদের অপহরণ ও তার স্বামীকে জিম্মি করার হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।

তার ভাষায়, ‘আমাদের কোনো আর্থিক সহায়তা দরকার নেই, শুধু আমার ভাই হত্যার বিচার চাই।’

এমডিএএ/একিউএফ