তরুণদের বিক্ষোভে সরকারের দমন-পীড়নকে কেন্দ্র করে ভারতের রাজনীতিতে নজিরবিহীন উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে গতকাল মঙ্গলবার। দিনজুড়ে বিরোধী দলের ধর্না, নেতা-কর্মীদের আটক এবং সরকার-বিরোধী পাল্টাপাল্টি অভিযোগের মধ্য দিয়ে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। দিনের শেষে লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী কেন্দ্র সরকারের কাছে পাঁচ দফা দাবি উত্থাপন করেন, যা আজ বুধবার সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের মুখোমুখি সংঘাত আরও তীব্র হওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
মঙ্গলবার রাহুল গান্ধী অভিযোগ করেন, সরকার শিক্ষার্থীদের শোষণ করছে এবং নিট (NEET) প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের পদত্যাগ দাবি করেন। এদিন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারি বাসভবন লোক কল্যাণ মার্গের সামনে কংগ্রেসের অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নেন রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভাদ্রা এবং দলের বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতা। পরে দিল্লি পুলিশ তাঁদের আটক করে।
রাহুল গান্ধীকে নিয়ে যাওয়া হয় ছত্রসাল স্টেডিয়ামে এবং প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভাদ্রাকে নেওয়া হয় মন্দির মার্গ থানায়। কংগ্রেসের সাবেক সভাপতি সোনিয়া গান্ধী থানায় গিয়ে প্রিয়াঙ্কার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। রাত প্রায় ৯টার দিকে দুই ভাইবোনকে মুক্তি দেওয়া হয়।
আটক অবস্থায় প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় রাহুল গান্ধী সরকারের কাছে পাঁচটি দাবি জানান। সেগুলো হলো—
দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার অবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলে রাহুল গান্ধী বলেন, ‘ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থা কেন ভেঙে পড়ছে? কেন প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে? ভারতে শিক্ষা এত ব্যয়বহুল কেন? সন্তানদের পড়াতে গিয়ে কেন পরিবারগুলোকে আর্থিকভাবে নিজেদের ধ্বংস করে ফেলতে হচ্ছে? এগুলো একেবারেই যৌক্তিক প্রশ্ন, এবং এই প্রশ্ন তোলায় কোনো ভুল নেই।’
তিনি আরও বলেন, সমগ্র বিরোধী দল চায় বুধবার লোকসভা ও রাজ্যসভা উভয় কক্ষেই এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হোক। সমর্থকদের ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের স্বার্থে যারা একসঙ্গে লড়াই করছেন, তাদের প্রত্যেককে আমি হৃদয়ের অন্তঃস্থল থেকে ধন্যবাদ জানাই।’
প্রতিযোগিতামূলক বিভিন্ন পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাকে ঘিরে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে ক্রমবর্ধমান বিরোধের মধ্যেই এ সংঘাত নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এই সংকট ভারতের লাখো শিক্ষার্থীর ওপর প্রভাব ফেলেছে। এর আগে মঙ্গলবার, রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেস যখন প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে ধর্নায় বসেছিল, তখন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রতিমন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং ধর্নাস্থলে এসে রাহুল গান্ধীর সঙ্গে প্রায় আধা ঘণ্টা কথা বলেন এবং তাঁর দাবিগুলো শোনেন।
পরে জিতেন্দ্র সিং অভিযোগ করেন, রাহুল গান্ধী সংসদে আলোচনার আগের দাবি থেকে ‘পিছু হটেছেন’ এবং এখন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করছেন। তিনি বলেন, ‘এটি রাহুল গান্ধীর মতো একজন নেতার মর্যাদার সঙ্গে মানানসই নয়। রাহুল গান্ধীর মতো একজন জ্যেষ্ঠ নেতার নিজের কথার থেকে সরে আসা দুর্ভাগ্যজনক এবং গণতন্ত্রের সব রীতিনীতির পরিপন্থী।’ জিতেন্দ্র সিং আরও বলেন, ‘সরকার নিট এবং এ-সংক্রান্ত আন্দোলনের সব বিষয় নিয়ে সংসদে আলোচনা করতে প্রস্তুত। রাহুল গান্ধীর আচরণ গণতন্ত্রের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।’
এদিকে, বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানও মঙ্গলবার রাতে রাহুল গান্ধী ও কংগ্রেসের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, তারা শিক্ষার্থীদের ইস্যুকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করছেন। এক্সে দেওয়া এক পোস্টে ধর্মেন্দ্র প্রধান লেখেন, ‘সরকার যখন একটি বিস্তৃত আলোচনায় প্রস্তুত থাকার কথা স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, তখনও কংগ্রেস গণতান্ত্রিক বিতর্কের পরিবর্তে রাজনৈতিক নাটক বেছে নিয়েছে। তাদের উদ্দেশ্য কখনোই শিক্ষার্থীদের সমস্যার সমাধান ছিল না, বরং রাজনৈতিক শিরোনাম তৈরির জন্য অস্থিরতা সৃষ্টি করা।’
তিনি আরও লেখেন, ‘রাহুল গান্ধীর কাছে এটি শিক্ষার্থীদের বিষয় নয়। আলোচনার প্রতিটি বাস্তব সুযোগ উন্মুক্ত হওয়ার পরও তিনি কেবল সংঘাত সৃষ্টি করার চেষ্টা করছেন।’








