বর্ষা এলেই মৌলভীবাজারের অসংখ্য টিলা মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়। অবৈধ টিলা কাটা, অপরিকল্পিত বসতি আর প্রশাসনিক নজরদারির দুর্বলতায় বছরের পর বছর বাড়ছে ধসের ঝুঁকি। গত চার বছরে প্রাণ গেছে অন্তত ১০ জনের, অথচ অন্তত ৫০ হাজার মানুষ এখনও ঝুঁকিপূর্ণ টিলায় বসবাস করছেন। প্রতিবছর দুর্যোগের সময় দায় এড়াতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করা হলেও পাহাড়ে বসবাসকারী ঝুঁকিপূর্ণ এই পরিবারগুলোকে নিরাপদ পুনর্বাসনের কোনো পরিকল্পনা বাস্তবে দেখা মেলে না।

জানা গেছে, বর্ষা মৌসুম আসলে মৌলভীবাজারে পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদের জীবন থাকে শঙ্কায়। ভারী বর্ষণে মৌলভীবাজার জেলায় প্রতি বছরই ছোট-বড় পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটছে। এতে কখনো ঘটছে প্রাণহানি আবার কখনো কেউ আহত হচ্ছে, ভাঙছে ঘরবাড়ি-সড়ক। টানা ভারী বর্ষণে আতঙ্কের মাত্রা বেড়ে যায় স্থানীয়দের।

টিলায় বসবাসকারী স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আইনের তোয়াক্কা না করে জেলার শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জ কুলাউড়াসহ বিভিন্ন স্থানে প্রভাবশালীরা টিলা মাটি বিক্রি করে দেয়। মাটি বিক্রি করার কারণে বৃষ্টি হলে টিলাধসের শঙ্কা দেখা দেয়। বিশেষ করে বসতবাড়ি, রিসোর্ট ও বাগান তৈরির জন্য এসব মাটি বিক্রি করা হয়।

‘যারা টিলা বা পাহাড়ে বসবাস করে আমরা তাদেরকে সবসময় বলে আসছি নিরাপদ স্থানে যাওয়ার জন্য। বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার জন্য বলা হয়। কিন্তু কেউ তাদের বাসস্থান ছেড়ে আসতে চায় না।’

জানা গেছে, জেলার কমলগঞ্জ, শ্রীমঙ্গল, জুড়ী, বড়লেখা, রাজনগর, কুলাউড়া ও সদর উপজেলায় টিলা ভূমি রয়েছে। এসব টিলা ও পাহাড়ি এলাকায় ঝুঁকি নিয়ে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসহ অন্তত ৫০ হাজার মানুষ বসবাস করেন। তবে সারা বছরই জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে টিলা কাটা হচ্ছে। শ্রীমঙ্গলের রাধানগর, মহাজিরাবাদ এবং কমলগঞ্জের রহিমপুর ইউনিয়নের কালেঙ্গা এলাকায় টিলা-রাস্তা কেটে এবং ছড়া দখল করে বসতবাড়ি, রিসোর্ট এবং দোকান নির্মাণ করা হয়েছে। আবার কেউ টাকার বিনিময়ে মাটি বিক্রি করেন। এসব কারণে বৃষ্টি হলে পাহাড় ধসের শঙ্কা দেখা দেয়।

মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে ৫০ হাজার মানুষের টিলায় বসবাসটিলার মাটি কেটে নেওয়া হয়েছে/ ছবি: জাগো নিউজ

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের নিয়মিত তৎপরতা না থাকায় টিলা থেকে মাটি কাটা হচ্ছে। আর এতে ঝুঁকি বাড়ছে পাহাড়ে বসবাসকারী মানুষের। বৃষ্টি হলে টিলা ধ্বসের শঙ্কা দেখা দেয়। ভারী বৃষ্টি হলে আতঙ্ক নিয়ে থাকতে হচ্ছে।

আরও পড়ুন

বরগুনা / স্বাস্থ্যকর্মীদের মর্জি মতো চলে কমিউনিটি ক্লিনিক

শ্রীমঙ্গল উপজেলার কালিঘাট ইউনিয়নের লাখাইছড়া ও এর আশপাশে টিলার বাসিন্দা সবিতা তাঁতি, শশী তাঁতি, ফ্রান্সিস কন্দ, জয়ন্তী তাঁতি জানান, প্রতি বছরই বর্ষায় পাহাড় ধসে ঘর ভাঙে, তবু যাওয়ার আর কোনো জায়গা নেই। এবারও বসতির পাশের পাহাড়ে দেখা দিয়েছে বড় ফাটল যেকোনো মুহূর্তে ধসে যেতে পারে সবকিছু। সমতলে তাদের থাকার জায়গা না থাকায় টিলা ধ্বসের আশঙ্কা নিয়ে তারা বসবাস করছেন। তিন বছর আগে তাদের পাশের টিলায় টিলাধসে চারজন মারা যায়। এছাড়া তাদের টিলার মাটিও দুর্বল হয়ে পড়েছে, যা যেকোনো মুহূর্তে ধসে পড়তে পারে।

শুকলা তাঁতি বলেন, আমরা কষ্ট করে টিলায় বসবাস করি। আমাদের যাওয়ার কোনো জায়গা না থাকায় এখানে ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করতে বাধ্য হই। আমাদের কেউ কোনো সহযোগিতা করে না। বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টি হলে অনেক ভয় নিয়ে বসবাস করতে হয়।

‘যারা টিলা কাটে তারা পরিবেশ ও প্রতিবেশ দুটির ক্ষতি করছে। প্রকৃতিকে হত্যা করা হচ্ছে। সরকারের উচিত এসব বিষয়ে শক্তভাবে প্রতিহত করা। টিলাগুলো রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব। টিলা কাটার প্রভাবে প্রতি বছর মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে।’

স্থানীয়রা জানায়, ২০২২ সালের ১৯ আগস্ট শ্রীমঙ্গল উপজেলার কালিঘাট ইউনিয়নের লাখাইছড়া চা বাগানে টিলা ধসে চার নারী শ্রমিকের মৃত্যু হয়। একই বছর কুলাউড়ার ভাটেরায় পাহাড় ধসে একই গ্রামের ৩ শিশু ও চাতলাপুর চা বাগানে আরও এক নারী মারা যান। ২০২৪ সালের কমলগঞ্জের আদমপুর বনবিটের কালেঞ্জি খাসিয়াপুঞ্জিতে কাজ করার সময় টিলা ধসে এক নারীর মৃত্যু হয়। সবশেষ ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে গৃহস্থালির কাজের জন্য টিলার মাটি আনতে গিয়ে মাটি চাপা পড়ে এক স্কুলছাত্রী নিহত হয় এবং আরও তিনজন আহত হন। এছাড়াও টিলার মাটি কাটতে গিয়ে ও পাহাড়ের বসতঘর ধসে আরও অনেকই মারা যান।

মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে ৫০ হাজার মানুষের টিলায় বসবাস

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)-এর জাতীয় পরিষদের সদস্য আ স ম সালেহ সোহেল বলেন, যারা টিলা কাটে তারা পরিবেশ ও প্রতিবেশ দুটির ক্ষতি করছে। প্রকৃতিকে হত্যা করা হচ্ছে। সরকারের উচিত এসব বিষয়ে শক্তভাবে প্রতিহত করা। টিলাগুলো রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব। টিলা কাটার প্রভাবে প্রতি বছর মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে।

আরও পড়ুন

প্রজাদের পেটানো হতো জুতা দিয়ে, ২০০ বছরের পুরোনো কুঠিবাড়ি ধ্বংসের মুখে

মৌলভীবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মাঈদুল ইসলাম বলেন, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০) অনুযায়ী অনুমতি ছাড়া টিলা কাটা দণ্ডনীয় অপরাধ। টিলা কাটার অভিযোগ পেলে আমরা অভিযান পরিচালনা করি।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ ছাদু মিয়া বলেন, যারা টিলা বা পাহাড়ে বসবাস করে আমরা তাদেরকে সবসময় বলে আসছি নিরাপদ স্থানে যাওয়ার জন্য। বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার জন্য বলা হয়। কিন্তু কেউ তাদের বাসস্থান ছেড়ে আসতে চায় না।

‘আইনের তোয়াক্কা না করে জেলার শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জ কুলাউড়াসহ বিভিন্ন স্থানে প্রভাবশালীরা টিলা মাটি বিক্রি করে দেয়। মাটি বিক্রি করার কারণে বৃষ্টি হলে টিলা ধ্বসের শঙ্কা দেখা দেয়। বিশেষ করে বসতবাড়ি, রিসোর্ট ও বাগান তৈরির জন্য এসব মাটি বিক্রি করা হয়।’

সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবদুর রহমান বলেন, যারা সংরক্ষিত বনের জায়গা দখল, টিলা ও পাহাড়ের মাটি কাটে আমরা তাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করি। এছাড়াও যারা অবৈধভাবে পাকা ঘর নির্মাণ করে তাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হয়।

শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জিয়াউর রহমান বলেন, বর্ষার শুরু থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বসবাসকারীদের সতর্ক করা হয়েছে।

মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে ৫০ হাজার মানুষের টিলায় বসবাস

শ্রীমঙ্গল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সরকার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, টিলা কাটার বিষয়ে আমরা কোনো অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে শক্তভাবে দমন করা হবে।

আরও পড়ুন

বাঘ বাঁচাতে সুন্দরবনে বিশেষ টিলা

মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল বলেন, টিলাধসে প্রাণহানিসহ বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে জেলা প্রশাসন থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। পাহাড়ি জনপদে তারা সচেতনতামূলক প্রচার অভিযান চালাচ্ছেন। এ বিষয়ে প্রতিটি উপজেলায় নির্বাহী কর্মকর্তাদের সার্বিক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

এনএইচআর/এএসএম