ফুটবলকে দীর্ঘদিন ধরেই ‘রাজনীতিমুক্ত’ রাখার কথা বলা হলেও, বিশ্বকাপের ইতিহাস বলছে ভিন্ন কথা। ২০২৬ বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্রের ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগুনের লাল কার্ডজনিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারকে ঘিরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে শুরু হয়েছে বিতর্ক- রাজনীতি কতটা প্রভাব ফেলতে পারে ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে?

বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিপক্ষে লাল কার্ড দেখার পর বালোগুনের বেলজিয়ামের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচে খেলার কথা ছিল না। এই ম্যাচে অটোমেটিক নিষিদ্ধ থাকার কথা তার।

কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, তিনি ব্যক্তিগতভাবে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফ্যান্তিনোকে ফোন করে ঘটনাটি পুনর্বিবেচনার অনুরোধ করেছিলেন। পরে ফিফার ডিসিপ্লিনারি কমিটি এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা পরিবর্তন করে এক বছরের স্থগিত নিষেধাজ্ঞা দেয়, ফলে বালোগুনের খেলার পথ খুলে যায়। এই সিদ্ধান্তে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায় বেলজিয়াম ফুটবল ফেডারেশন। তবে এটি বিশ্বকাপে রাজনীতির প্রথম বিতর্ক নয়।

১৯৩৪: মুসোলিনির প্রচারণার মঞ্চ

ইতালিতে অনুষ্ঠিত ১৯৩৪ বিশ্বকাপকে ফ্যাসিবাদী শাসক বেনিতো মুসোলিনি কেবল ফুটবল টুর্নামেন্ট হিসেবে দেখেননি। তিনি এটিকে নিজের শাসনব্যবস্থার প্রচারের হাতিয়ার বানান। ইতালির প্রতিটি ম্যাচে উপস্থিত থাকা, রেফারিদের ওপর প্রভাব খাটানোর অভিযোগ এবং স্বাগতিকদের পক্ষে বিতর্কিত সিদ্ধান্ত- সব মিলিয়ে সেই বিশ্বকাপ আজও বিতর্কিত। ইতালি শিরোপা জিতলেও পরে দুই রেফারিকে আজীবনের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়।

1934

১৯৩৮: ‘জিতো, নইলে মরো’

ফ্রান্স বিশ্বকাপের আগে নাৎসি জার্মানি অস্ট্রিয়া দখল করলে অস্ট্রিয়ার বেশ কয়েকজন ফুটবলারকে জার্মানির হয়ে খেলতে বাধ্য করা হয়। অন্যদিকে ফাইনালের আগে মুসোলিনি ইতালির খেলোয়াড়দের উদ্দেশে কথিতভাবে বার্তা পাঠান- ‘জিতো, নইলে মরো।’ ইতালি ৪-২ গোলে হাঙ্গেরিকে হারিয়ে টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জেতে। পুরো টুর্নামেন্টজুড়েই ইতালির কালো জার্সি ফ্যাসিস্ট বাহিনীর প্রতীক হিসেবে ব্যাপক সমালোচিত হয়।

1938

১৯৭৮: আর্জেন্টিনার বিতর্কিত শিরোপা

সামরিক শাসক জর্জ রাফায়েল ভিদেলার শাসনামলে আয়োজিত ১৯৭৮ বিশ্বকাপ ছিল রাজনৈতিক বিতর্কে ঘেরা। ফাইনালে ওঠার জন্য পেরুকে অন্তত চার গোলে হারানো দরকার ছিল আর্জেন্টিনার, কিন্তু তারা জিতে যায় ৬-০ ব্যবধানে। এরপরই অভিযোগ ওঠে, আর্জেন্টিনার সামরিক সরকার ও পেরুর শাসকদের মধ্যে গোপন সমঝোতা হয়েছিল। যদিও এর সুনির্দিষ্ট প্রমাণ কখনো পাওয়া যায়নি, তবুও এটি বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম বড় রহস্য হিসেবেই রয়ে গেছে।

Argentina

১৯৮২: মাঠে নেমে এলেন রাজপরিবারের সদস্য

স্পেনে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে ফ্রান্স-কুয়েত ম্যাচে ঘটে অবিশ্বাস্য এক ঘটনা। ফ্রান্স গোল করার পর কুয়েতের খেলোয়াড়রা দাবি করেন, তারা বাঁশির শব্দ শুনেছিলেন। তখন কুয়েত ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও রাজপরিবারের সদস্য ফাহাদ আল-আহমাদ আল-জাবের আল-সাবাহ গ্যালারি থেকে মাঠে নেমে রেফারির সঙ্গে তর্ক করেন। অবাক করা বিষয়, রেফারি গোলটি বাতিল করে দেন। পরে এই ঘটনার জন্য রেফারিকে নিষিদ্ধ করা হয়।

1982

২০২৬: ট্রাম্প-বালোগুন বিতর্ক

সবশেষে ২০২৬ বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্র স্ট্রাইকার ফোলারিন বালোগুনের লাল কার্ড ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ঘটনা আবারও রাজনীতির প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ট্রাম্প দাবি করেছেন, তিনি শুধু ঘটনাটি পুনর্বিবেচনার অনুরোধ করেছিলেন, সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেননি।

তবে ফিফার সিদ্ধান্তের পর থেকেই ফুটবল অঙ্গনে বিতর্ক থামেনি। বেলজিয়াম ফুটবল ফেডারেশন এই রায়কে ‘বিস্ময়কর’ বলে আখ্যা দিয়ে আইনি পদক্ষেপের কথাও বিবেচনা করছে।

trump

বিশ্বকাপের ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে, মাঠের বাইরের রাজনৈতিক শক্তি কখনো সরাসরি, কখনো পরোক্ষভাবে ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরকে প্রভাবিত করেছে। মুসোলিনি থেকে ট্রাম্প- সময়ের ব্যবধান বদলেছে, কিন্তু রাজনীতি ও বিশ্বকাপের সম্পর্ক নিয়ে বিতর্ক এখনো শেষ হয়নি।

আরআর/আইএইচএস/