নিজেদের ফুটবল ইতিহাসে তারকার অভাব নেই। পেলে, রোনালদো, রিভালদো, রোমারিও, নেইমার, বেবেতো, গারিঞ্চা, জিকো, সক্রেটিস- এভাবে তালিকা করতে গেলে শেষ হবে না সংখ্যাটা। এদের যে কোনো একজনকে আদর্শ মেনে নিজেদের ফুটবল ক্যারিয়ার গড়ে তুলতে চান ব্রাজিলের উঠতি বয়সীরা।
কিন্তু আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তির যুগে ধারা বদলে যাওয়ার দারুণ প্রবনতা দেখা যাচ্ছে। যে দেশটির শিশু-কিশোরদের সামনে জলজ্যান্ত স্বদেশী কিংবদন্তীর অভাব নেই, তারাই কি না সোশ্যাল মিডিয়া আর ইউটিউবের কল্যাণে নিজেদের অনুকরণীয় আদর্শ বদলে ফেলছেন।
বলছি ব্রাজিলের কথা। সাম্প্রতিক যে তথ্য উঠে আসছে, তাতে ব্রাজিলের ফুটবল কর্মকর্তা থেকে শুরু করে কিংবদন্তীরা অবাক হতে পারেন। ব্রাজিলিয়ান শিশু-কিশোরদের অনুকরণীয় আদর্শ এমনকি হাল আমলের নেইমারও নন। তিনি হলেন ম্যানচেস্টার সিটিতে খেলা নরওয়েজিয়ান তারকা আরলিং হালান্ড।
এবারের বিশ্বকাপের দ্বিতীয় রাউন্ডে এই হালান্ডের কাছে হেরেই বিদায় নিতে হয়েছে ব্রাজিলকে। ওই ম্যাচের আগেই পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে ভয়াবহ এই তথ্য।
বিশ্ব ফুটবলে গোলমেশিন হিসেবে আরলিং হালান্ডের পরিচিতি নতুন নয়। ১.৯৫ মিটার উচ্চতার এই নরওয়েজিয়ান স্ট্রাইকার মাঠে প্রতিপক্ষের জন্য আতঙ্কের নাম। কিন্তু মাঠের বাইরে তার জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের নানা প্রান্তে, এমনকি ফুটবলের দেশ ব্রাজিলেও। সেখানে অনেক শিশুই হালান্ডকে আদর্শ মানে, তার মতো চুল রাখে, তার জার্সি পরে, এমনকি তার মতো খেলোয়াড় হওয়ার স্বপ্নও দেখে।
বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় যখন ব্রাজিলের প্রতিপক্ষ নরওয়ে, তখন এই ছোট্ট ভক্তদের হৃদয়ে শুরু হয়েছিল অন্যরকম টানাপোড়েন। একদিকে প্রিয় ফুটবলার হালান্ড, অন্যদিকে প্রিয় দেশের জাতীয় দল ব্রাজিল। কী চিন্তা করেছিলো তারা তখন?
চার গোল করুক হালান্ড, কিন্তু জিতুক ব্রাজিল!
৬ বছর বয়সী ভিনিসিয়ুস কোরেয়া, সবার কাছে পরিচিত ‘মিনি-হালান্ড’ নামে। ৯ বছর বয়সী গ্যাব্রিয়েল স্ক্লো সিমোয়েস এবং ১৩ বছর বয়সী বেন্তো আফোনসো। এই তিনজনই আরলিং হালান্ডের বিরাট ভক্ত। বিশ্বকাপে শেষ ষোলোর ম্যাচে তারা নিজ দেমের বিপক্ষে বেশ আগ্রহ নিয়েই দেখতে বসেছিল প্রিয় তারকা (!) হালান্ডের খেলা। ম্যাচটি ঘিরে তাদের উৎসাহের কমতি ছিল না।
সান্তা কাতারিনার বালনেয়ারিও কাম্বোরিউ শহরের ভিনিসিয়ুস কোরেয়ার মজার ইচ্ছা, ‘হালান্ড চারটি গোল করুক, যাতে সে বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা হতে পারে। কিন্তু ব্রাজিল পাঁচটি গোল করে ম্যাচ জিতুক!’
এই ছোট্ট ভক্তের হালান্ডপ্রেমের গল্পও বেশ আবেগঘন। মাত্র তিন বছর বয়সে লম্বা চুলের কারণে স্কুলে অন্য শিশুরা তাকে নানা নামে ডাকত। একদিন একজন তাকে বলে বসে, ‘তুমি তো হালান্ডের ছেলে!’
তখনও হালান্ডকে চিনত না ভিনি। বাড়ি ফিরে মায়ের কাছে জানতে চায়, এই হালান্ড কে? মা ছবি দেখানোর পরই শুরু হয় এক নতুন ভালোবাসার গল্প।
ভিনির ভাষায়, ‘মনে হলো, আমার সঙ্গে হালান্ডের একটা বিশেষ সংযোগ আছে। এরপর থেকেই ওর খেলা দেখতে শুরু করি। আমার কাছে হালান্ডই বিশ্বের সেরা ফুটবলার।’
এক সময় এই ভালোবাসার খবর পৌঁছে যায় হালান্ডের কাছেও। নিজের জন্মদিনে নরওয়েজিয়ান তারকা ভিডিওবার্তায় ভিনিকে শুভেচ্ছা জানান। এমনকি বলেন, ‘লম্বা চুল খুবই দারুণ।’
এরপর ম্যানচেস্টার সিটির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও জায়গা পায় ‘ব্রাজিলিয়ান হালান্ড’। চার বছর বয়সের জন্মদিনে পুরো অনুষ্ঠানই সাজানো হয়েছিল হালান্ডকে ঘিরে। কেক, সাজসজ্জা, পোশাক- সবকিছুতেই ছিল নরওয়েজিয়ান স্ট্রাইকারের ছোঁয়া। এখনও কেউ যখন ভিনিকে জিজ্ঞেস করে, চুল কাটবে কবে? সে একটাই উত্তর দেয়, ‘আমি চুল কাটতে পারি না। আমি তো হালান্ড!’
রিও ডি জেনেইরোর ৯ বছর বয়সী গ্যাব্রিয়েল স্ক্লো সিমোয়েসও হালান্ডের বড় ভক্ত। এমনকি হালান্ডের কারণেই সে ম্যানচেস্টার সিটির সমর্থক হয়ে উঠেছেন। স্ট্রাইকার পজিশনে খেলে গ্যাব্রিয়েল। তাই নিজের খেলায়ও হালান্ডকে অনুসরণ করার চেষ্টা করে সে।
‘হালান্ডই আমার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। সে প্রায় প্রতি ম্যাচেই গোল করে। এটা অবিশ্বাস্য’- বলে গর্বের সঙ্গে জানায় গ্যাব্রিয়েল। নিজের একাডেমিতেও সে দলের সর্বোচ্চ গোলদাতা। যদিও হাসতে হাসতেই স্বীকার করে, ‘এখন অবশ্য হালান্ড অনেক ভালো। তবে বড় হয়ে আমি ওর মতো হতে চাই।’
হালান্ডকে যতই ভালোবাসুক, ব্রাজিল-নরওয়ে ম্যাচে সমর্থন ছিল তার নিজের দেশ ব্রাজিলের পক্ষেই। ম্যাচের আগে গ্যাব্রিয়েল বলেছিল, ব্রাজিল জিতবে ২-১ ব্যবধানে এবং নরওয়ের গোলটি আসবে হালান্ডের পা থেকে।
কিন্তু গ্যাব্রিয়েলের বিশ্বাসকে ভঙ্গ করে হালান্ড করে বসেন ২ গোল এবং তার দল নরওয়ে ২-১ ব্যবধানে হারায় ব্রাজিলকে।
বিশ্বকাপে নরওয়ের প্রতিটি ম্যাচই অনুসরণ করছে গ্যাব্রিয়েল। এমনকি নরওয়ের ভাইকিংদের বিখ্যাত ‘রোয়িং’ উদযাপনও ইতোমধ্যে স্কুলের বন্ধুদের শেখানো শুরু করেছে সে।
তবে একটা জায়গায় হালান্ডকে অনুসরণ করতে রাজি নয় গ্যাব্রিয়েল। চুল বড় করা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই মজা করে বলে, ‘হালান্ডই বরং চুল কেটে আমার মতো হয়ে যাক!’
ব্রাজিলের মিনাস জেরাইস অঙ্গরাজ্যের ১৩ বছর বয়সী বেন্তো আফোনসো মাচাদোর গল্পও আলাদা নয়। স্থানীয় ক্লাব অ্যাটলেটিকো পম্পেয়ানোর এই তরুণ স্ট্রাইকারের খেলার ধরণও হালান্ডকে অনুসরণ করেই গড়ে উঠছে।
তার ভাষায়, ‘হালান্ড বিশ্বের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার। আমি তার মতো খেলতে চাই। আমার অনেকগুলো হালান্ডের জার্সিও আছে।’
শুধু খেলার ধরন নয়, হালান্ডকে অনুসরণ করে চুলও বড় করেছেন বেন্তো। মাঠে ভালো খেলতে শুরু করার পর আশপাশের মানুষ যখন তাকে ‘মিনি-হালান্ড’ বলে ডাকতে শুরু করে, তখন ভীষণ খুশি হয়েছিল সে। তবে শেষ ষোলোর ম্যাচে স্বাভাবিকভাবেই তার সমর্থন ছিল নিজের দেশের পক্ষেই।
ওই ম্যাচের আগে বেন্তো বলেছিলেন, ‘আমি হালান্ডকে খুব ভালোবাসি। আশা করি সে একটি গোল করবে, যাতে গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে এগিয়ে থাকে। কিন্তু আমি চাই ব্রাজিলই জিতুক।’ যদিও শেষ পর্যন্ত বেন্তোর প্রত্যাশা আর পূরণ হয়নি।
বেন্তোর বাবা অ্যাডিলসন মাচাদোর মতে, ছেলে শুধু হালান্ডের খেলাই নয়, তার পরিশ্রম ও শৃঙ্খলাকেও অনুসরণ করার চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, ‘সে দিনে দুবার অনুশীলন করে। পড়াশোনার পাশাপাশি নিজের স্বপ্ন পূরণে সপ্তাহান্তের ছুটিও ত্যাগ করে।’
হালান্ডের অসাধারণ গোল করার ক্ষমতা, ব্যক্তিত্ব ও মাঠের আধিপত্য তাকে ব্রাজিলের হাজারো শিশুর কাছে আদর্শে পরিণত করেছে। কিন্তু বিশ্বকাপের মঞ্চে দেশপ্রেমই শেষ পর্যন্ত জিতে যায়।
আইএইচএস/








