ফুটবলকে বলা হয় চরম অনিশ্চয়তার খেলা। মাঠের কখন কী ঘটবে, তা আগে থেকে শতভাগ নিখুঁতভাবে বলা অসম্ভব। এই তো সেদিন, ২০২৬ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বেই কী দারুণ এক কাণ্ড ঘটে গেল! কোথায় পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল, আর কোথায় মরক্কো—ম্যাচ শেষ হলো ড্রতে। স্পেনের মতো ফেভারিট দলকে গোলশূন্য ড্র করতে বাধ্য করালো র‌্যাংকিংয়ের ৬৭ নম্বরে থাকা কেপ ভার্দে!

কিন্তু একটা দল কীভাবে জেতে? কেবল কি পায়ের জাদু ও কোচের নিখুঁত ট্যাকটিকস? আসল রহস্যটা কিন্তু লুকিয়ে আছে তাঁদের মাথায়! খেলাধুলার পেছনে যে বিজ্ঞান কাজ করে, তার মধ্যে সবচেয়ে চমকপ্রদ হলো স্পোর্টস সাইকোলজি। ফুটবল মাঠের চরম হট্টগোল ও উত্তেজনার মধ্যেও এই বিশ্বসেরা তারকারা এমন ৫টি মনস্তাত্ত্বিক কৌশল ব্যবহার করেন, যা তাঁদের সাধারণ খেলোয়াড়দের চেয়ে আলাদা করে রাখে। চলুন, আজ সেই মগজের গোপন কলকব্জাগুলোর খোঁজ নেওয়া যাক।

এআই যুগে ফুটবল বিশ্বকাপ
চাপের মুখে সাধারণ মানুষের মনোযোগ যেখানে ভেঙে পড়ে, এই স্ট্রাইকাররা সেখানে নার্ভ ধরে রেখে ঠিক সময়ে একদম নিখুঁত জায়গায় পজিশন নেন। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে অ্যাটেনশনাল ফিটনেস।

প্রতিপক্ষের ছন্দ কেটে দেওয়া

ফুটবলে জেতার অন্যতম বড় চাবিকাঠি হলো প্রতিপক্ষের পরিকল্পনা ও ছন্দকে এলোমেলো করে দেওয়া। এর জন্য তারকারা মাঠে বুদ্ধি খাটিয়ে কিছু ট্যাকটিক্যাল ফাউল করেন, আচমকা এমন গতিতে কাউন্টার-অ্যাটাক করেন যেন প্রতিপক্ষ সামলে ওঠার সময়ই না পায়, কিংবা হাই-প্রেসার দিয়ে প্রতিপক্ষকে ভুল করতে বাধ্য করেন। মনস্তাত্ত্বিক এই ধাক্কা সামলাতে না পেরে অনেক বড় বড় দলও তখন ম্যাচ থেকে ছিটকে যায়।

গ্যালারির লাখো মানুষের চিৎকার ও প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের বাধা, কোনো কিছুই হলান্ড বা এমবাপ্পের মতো দুর্দান্ত স্ট্রাইকারদের টলাতে পারে না

মনোযোগের সুপার-ফিটনেস

হলান্ড বা এমবাপ্পের মতো দুর্দান্ত স্ট্রাইকাররা যখন বল নিয়ে গোলপোস্টের দিকে ছোটেন, তখন গ্যালারির লাখো মানুষের চিৎকার ও প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের বাধা—কোনো কিছুই তাঁদের টলাতে পারে না। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে অ্যাটেনশনাল ফিটনেস। চাপের মুখে সাধারণ মানুষের মনোযোগ যেখানে ভেঙে পড়ে, এই স্ট্রাইকাররা সেখানে নার্ভ ধরে রেখে ঠিক সময়ে একদম নিখুঁত জায়গায় পজিশন নেন। তাঁরা একাধারে মাঠের চারপাশের অনেকগুলো বিষয় মাথায় রাখেন এবং সুযোগ আসামাত্রই বাজপাখির মতো ছোঁ মারেন।

ফুটবলের বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানীদের ফুটবল
হলান্ড বা এমবাপ্পের মতো দুর্দান্ত স্ট্রাইকাররা যখন বল নিয়ে গোলপোস্টের দিকে ছোটেন, তখন গ্যালারির লাখো মানুষের চিৎকার ও প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের বাধা—কোনো কিছুই তাঁদের টলাতে পারে না।

মাইন্ড-ওয়ান্ডারিং

আর্জেন্টাইন জাদুকর লিওনেল মেসির খেলা খেয়াল করেছেন? ম্যাচের একটা বড় সময় তিনি হেঁটে বেড়ান। মনে হয় যেন তাঁর কোনো তাড়া নেই, খেলা নিয়ে কোনো ভাবনাই নেই! মেসির চোখ কোন দিকে তাকায় তা নিয়ে গবেষণা করে বিজ্ঞানীরা এক অদ্ভুত তথ্য পেয়েছেন। মেসি আসলে বেশিরভাগ সময় বলের দিকে তাকানই না! একে বলে নিয়ন্ত্রিতভাবে মনকে ঘুরে বেড়াতে দেওয়া। পুরো ৯০ মিনিট একটানা তীব্র মনোযোগ ধরে রাখা মানুষের মস্তিষ্কের পক্ষে অসম্ভব। মেসি যখন বলের বাইরে তাকান, তখন তাঁর মস্তিষ্ক আসলে অন্যভাবে তথ্য প্রসেস করে পুরো মাঠের একটা ত্রিমাত্রিক মানচিত্র তৈরি করে নেয়। আর ঠিক যখন সুযোগ আসে, চোখের পলকে তিনি খেলায় ফেরেন এবং প্রতিপক্ষকে খড়কুটোর মতো উড়িয়ে দেন।

২০২৬ বিশ্বকাপে রেফারিদের মাথায় ক্যামেরা থাকায় বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি চোখ সরাসরি তাঁদের ভিউ থেকে খেলা দেখছে

রেফারিদের লোহার মতো শক্ত মন

ফুটবলের মনস্তাত্ত্বিক লড়াইটা কিন্তু শুধু খেলোয়াড়দের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি রেফারিদের জন্যও সমান সত্য। খেলোয়াড়দের চোটের ভান করা, অফসাইডের সূক্ষ্ম হিসাব এবং পেনাল্টির মতো মহাগুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে রেফারিদের প্রচণ্ড মানসিক চাপের মুখোমুখি হতে হয়। বিশেষ করে ২০২৬ বিশ্বকাপে রেফারিদের মাথায় ক্যামেরা থাকায় বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি চোখ সরাসরি তাঁদের ভিউ থেকে খেলা দেখছে। এই পর্বতসমান চাপ সামলে একদম শান্ত মাথায় সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য রেফারিদের প্রয়োজন হয় বিশেষ ধরণের মানসিক দৃঢ়তা।

জার্সির রঙে কি দলের জয়ের সম্ভবনা বেড়ে যায়
মেসির চোখ কোন দিকে তাকায় তা নিয়ে গবেষণা করে বিজ্ঞানীরা অদ্ভুত তথ্য পেয়েছেন। মেসি আসলে বেশিরভাগ সময় বলের দিকে তাকানই না! একে বলে নিয়ন্ত্রিতভাবে মনকে ঘুরে বেড়াতে দেওয়া।

মাঠের ভেতরের সৃজনশীলতা

বিজ্ঞান বলে, সৃজনশীলতা কেবল কবি বা শিল্পীদের জন্য নয়, ফুটবলারদের জন্যও সমান সত্য। মাঠের জটিল পরিস্থিতি থেকে হুট করে এক অভিনব উপায়ে বল বের করে আনাকে বলে ডাইভারজেন্ট থিংকিং বা ভিন্নধর্মী চিন্তা। কেভিন ডি ব্রুইনা কিংবা লুকা মদরিচের মতো মিডফিল্ডাররা সাধারণের চেয়ে তিন-চার চাল সামনে চিন্তা করতে পারেন।

যুক্তরাষ্ট্রের কোচ মরিসিও পচেত্তিনো একবার বলেছিলেন, ‘শিশুদের মতো মন খুলে খেলো’। অর্থাৎ, যখন মাথায় কোনো আড়ষ্টতা থাকে না, তখনই মস্তিষ্ক সবচেয়ে সেরা এবং চোখ ধাঁধানো সৃজনশীল ফুটবল উপহার দিতে পারে।

লেখক: শিক্ষার্থী, পদার্থবিজ্ঞানবিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সূত্র: সায়েন্টিফিক আমেরিকান

ফুটবল বাতাসে বেঁকে যায় কেন