আমার বয়স তখন চুয়াল্লিশ|ঠিক চুয়াল্লিশ কি না জানি না| গরিব মানুষের জন্মের দিন তারিখ লেখা থাকে না| তাদের বয়স ক্যালেন্ডারে মাপা যায় না| তাদের বয়স মাপা যায় ভাঙা চোয়াল, ক্ষয়ে যাওয়া স্যান্ডেল আর অপূর্ণ স্বপ্নের সংখ্যা দিয়ে| সেদিন ভোরে ঘুম ভাঙলে দেখি আমার তেল চিটচিটে দাগ পড়া বালিশের নিচে একটা নীল শামুক|আমি অবাক হইনি|অবাক হওয়ার ক্ষমতা বহু আগেই তো হারিয়ে ফেলেছি| যে মানুষ দারিদ্র্যের সঙ্গে বছরের পর বছর জীবন কাটায়, তার কাছে শামুক আর ব্যাংক ম্যানেজারের মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য থাকে না| দুজনেই ধীরে চলে|শামুকটা আমার দিকে তাকিয়ে বলল,-তুমি এখানেও দেরি করে ফেলেছো|আমি বললাম,-কোথায়?-বিশ্ববিদ্যালয়ে|আমি চারপাশে তাকালাম|আমার টিনের ঘর|ভাঙা জানালা|পুরোনো খাতা|সব ঠিকই আছে|কিন্তু শামুকটা হঠাৎ বড় হতে শুরু করল|বড় হতে হতে একটা নৌকার সমান হয়ে গেল|তারপর সে নিজের খোলসের দরজা খুলে দিল|ভেতরে সিঁড়ি|আমি সিঁড়ি বেয়ে নামতে লাগলাম|নামতে নামতে বুঝলাম, আমি পৃথিবীর নিচে চলে যাচ্ছি|আরও নিচে|আরও|শেষে গিয়ে দেখি একটা বিশাল শহর|শহরের প্রবেশদ্বারে এক বিশ্ববিদ্যালয়| “নীল শামুক বিশ্ববিদ্যালয়”| প্রবেশদ্বারের ফটকের উপরে লেখা—“হে অপ্রকাশিত অতিথি, সত্যানুসন্ধানে আপনাকে স্বাগতম|” আমি ঢুকে পড়লাম| ধীরে হাঁটতে লাগলাম| হাঁটতে হাঁটতে আমি একটা মাঠের কাছে পৌঁছালাম| সেই মাঠের ভেতর দেখি হাজার হাজার মানুষ বসে আছে|কেউ কবি|কেউ বিজ্ঞানী|কেউ চিত্রকর|কেউ আবিষ্কারক|তাদের কারও বই প্রকাশিত হয়নি|কারও গবেষণা লেখা হয়নি|কারও ছবি আঁকা হয়নি|কারও আবিষ্কার তৈরি হয়নি|সবাই শুধু ভাবতে পেরেছে|আমি একজন বৃদ্ধকে জিজ্ঞেস করলাম,-আপনার পরিচয়?লোকটা হেসে বলল,-আমি সেই মানুষ, যে বিমান আবিষ্কারের ধারণা রাইট ভাইদ্বয়ের পঞ্চাশ বছর আগে ভেবেছিলাম| কিন্তু আমার গ্রামের বাইরে যাওয়ার ভাড়া ছিল না|আরেকজন বলল,-আমি এমন এক কবিতা লিখতে চেয়েছিলাম যা মানুষকে কাঁদাবে| ‘ইলিয়াড’ আমার লেখার কথা ছিল| কিন্তু সারাজীবন আমি শুধু চাল কিনতেই সময় খেলাম|আমি চুপ করে গেলাম|মনে হলো যেন আমি আমার আত্মীয়দের মধ্যে এসে পড়েছি|বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঝখানে একটা বিশাল গ্রন্থাগার|আমি ভেতরে ঢুকলাম|সেখানে কোনো বই নেই|শুধু বইয়ের আকারে মলাট|লক্ষ লক্ষ মলাট|আমি গ্রন্থাগারিককে জিজ্ঞেস করলাম,-বই কোথায়?সে বলল,-এগুলোইতো সেই বই, যেগুলো লেখা হয়নি|-লেখা হয়নি?-হ্যাঁ| পৃথিবীতে যত অপূর্ণ বই আছে, সব এখানে রাখা হয়|আমি একটা মলাট টেনে বের করলাম| কিন্তু আশ্চর্য তাতে আমার নাম লেখা|হাত কাঁপতে লাগল| খুলে দেখি ভেতরে সাদা পৃষ্ঠা|একেবারে ফাঁকা|আমি রাগে বললাম,-আমি তো লিখেছি!গ্রন্থাগারিক মাথা নাড়ল|-না| তুমি খাতায় লিখেছ| বইয়ে লেখোনি|-পার্থক্য কী?-খাতার লেখা নিজের জন্য| বইয়ের লেখা পৃথিবীর জন্য|কথাটা শুনে আমার বুকের ভেতর কেমন যেন ব্যথা করল|আমি বইটা বন্ধ করে বেরিয়ে এলাম|বাইরে তখন সন্ধ্যা|কিন্তু আকাশে সূর্য নয়, ঝুলছে বিশাল একটা চোখ|চোখটা পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে আছে|আমি জিজ্ঞেস করলাম,-ওটা কী?এক ছাত্র বলল,-ওটাই সময়|-সময়?-হ্যাঁ| সবাই ভাবে সময় নদীর মতো| আসলে সময় একটা চোখ| সে শুধু দেখে| কাউকে সাহায্য করে না|আমি হাঁটতে হাঁটতে শহরের শেষ প্রান্তে গেলাম|সেখানে একটা পাহাড়|পাহাড়ের গায়ে লক্ষ লক্ষ দরজা|প্রতিটি দরজার ওপর একটা নাম|আমি একটা দরজা খুললাম|ভেতরে দেখি, আমি|কিন্তু অন্য এক আমি|তার নিজের কম্পিউটার আছে|নিজের প্রকাশনী আছে|তার বই বিক্রি হচ্ছে|মানুষ তাকে চেনে|আমি দরজা বন্ধ করে দিলাম|আরেকটা খুললাম|সেখানে আরেক আমি|সে বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক|আরেকটা খুললাম|সেখানে আমি বড় প্রযুক্তি উদ্যোক্তা|আমি একের পর এক দরজা খুলতে লাগলাম|প্রতিটা দরজার ওপারে একটা বিকল্প জীবন|একটা জীবনে আমি ধনী|একটাতে বিখ্যাত|একটাতে ক্ষমতাবান|হঠাৎ একটা দরজায় গিয়ে থামলাম|সেখানে দেখি আমি ঠিক আমার মতোই|একই টিনের ঘর|একই দারিদ্র্য|একই খাতা|কিন্তু সে লিখছে|লিখেই যাচ্ছে|তার চোখে কোনো অভিযোগ নেই|আমি ভেতরে ঢুকে তাকে জিজ্ঞেস করলাম,-তুমি কি সফল হবে?সে মাথা তুলে হাসল|-জানি না|-তাহলে লিখছ কেন?-কারণ গল্প লেখা আর সফল হওয়া এক জিনিস না|আমি কিছু বলতে পারলাম না|লোকটা আবার খাতায় ঝুঁকে গেল| ঠিক তখনই সবকিছু কাঁপতে শুরু করল|পাহাড়|দরজা|আকাশের চোখ|গ্রন্থাগার|সব|আমি দৌড়াতে লাগলাম|দূরে দেখি নীল শামুকটা দাঁড়িয়ে আছে|সে বলল,-ফিরে যাওয়ার সময় হয়েছে|-আমি আবার আসতে পারব?-না|-কেন?-কারণ এটা কোনো জায়গা না|-তাহলে?শামুকটা হাসল|-এটা তোমার মাথার ভেতর|তারপর সব অন্ধকার|হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল|আমি আমার টিনের ঘরে|ভোর হয়ে গেছে|বালিশের নিচে কোনো শামুক নেই|কোনো বিশ্ববিদ্যালয় নেই|কোনো পাহাড় নেই|শুধু একটা খাতা|আমি খাতাটা খুললাম|প্রথম পাতায় লেখা—“খাতার লেখা নিজের জন্য| বইয়ের লেখা পৃথিবীর জন্য|”আমি অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলাম|তারপর লিখতে শুরু করলাম|বাইরে সূর্য উঠছিল|আর আমার মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দারিদ্র্য অর্থের অভাব নয়| অলিখিত গল্পের অভাব|

কেননা যে গল্প লেখা হয়নি, সেটাই পৃথিবীর সবচেয়ে গরিব গল্প|