নিরাপত্তা বাড়াতে নেওয়া হয়েছিল প্রকল্প। কিন্তু সেই নিরাপত্তা নিয়েই উঠেছে বড় প্রশ্ন। কারণ, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ডের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি শর্তই পূরণ করতে পারেনি যশোর, সৈয়দপুর ও রাজশাহীর শাহ মখদুম বিমানবন্দর। প্রয়োজনের তুলনায় সংকীর্ণ রানওয়ে স্ট্রিপ, বিমানবন্দরের শেষ প্রান্তে নিরাপত্তা এলাকায় বড় ঘাটতি, রানওয়ের কোথাও তৈরি হয়েছে ‘বাম্পিং’, অসম্পূর্ণ লাইটিং ব্যবস্থা ও দুর্বল ড্রেনেজ। সব মিলিয়ে তিন বিমানবন্দরের নিরাপদ পরিচালনা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ফলে শত শত কোটি টাকা ব্যয়ের পরও আন্তর্জাতিক মানের নিরাপদ বিমানবন্দর বলা যাচ্ছে না। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) পরিচালিত নিবিড় পরিবীক্ষণ সমীক্ষায় উঠে এসেছে এমন চিত্র।
আইএমইডির প্রতিবেদন বলছে, প্রকল্পের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা নিরাপত্তা অবকাঠামোতে। আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (আইকাও) মানদণ্ড অনুযায়ী রানওয়ের দুই প্রান্তে কমপক্ষে ২৪০ মিটার দীর্ঘ রানওয়ে অ্যান্ড সেফটি এরিয়া (রেসা) থাকার কথা। কিন্তু তিনটি বিমানবন্দরের কোথাও সেই মান পূরণ হয়নি। যশোরের এক প্রান্তে মাত্র ৬০ দশমিক ৯৫ মিটার এবং অন্য প্রান্তে ১২০ মিটার নিরাপত্তা এলাকা রয়েছে। রাজশাহীতে উভয় প্রান্তে ৯০ মিটার এবং সৈয়দপুরে এক প্রান্তে ২৩৮ মিটার থাকলেও অন্য প্রান্তে মাত্র ৯৮ মিটার পাওয়া গেছে। সমীক্ষায় বলা হয়েছে, বিমান রানওয়ে অতিক্রম করলে বা রানওয়ের আগেই ছিটকে পড়লে এই ঘাটতি বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
শুধু নিরাপত্তা এলাকা নয়, তিনটি বিমানবন্দরের কোনোটিই রানওয়ে স্ট্রিপের (নিরাপত্তা এলাকা) আন্তর্জাতিক মান পূরণ করতে পারেনি। যেখানে আইকাও’র মান অনুযায়ী ১৫০ মিটার পর্যন্ত স্ট্রিপ প্রয়োজন, সেখানে যশোরে সর্বোচ্চ ১২০ মিটার এবং রাজশাহী ও সৈয়দপুরে মাত্র ৭০ থেকে ১০৫ মিটার পাওয়া গেছে। আইএমইডির মতে, এই সীমাবদ্ধতা জরুরি পরিস্থিতিতে বিমানের ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। তাই তিনটি বিমানবন্দরেই রানওয়ে স্ট্রিপ দ্রুত সম্প্রসারণের সুপারিশ করা হয়েছে।
সমীক্ষায় সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে যশোর বিমানবন্দর নিয়ে। সেখানে আংশিক ওভারলে (পুরনো সড়কের উপর নতুন সড়ক) করার কারণে রানওয়ের বিভিন্ন অংশে ‘বাম্পিং ইফেক্ট’ (উঁচুনিচু) তৈরি হয়েছে। আইএমইডিকে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, উড্ডয়ন ও অবতরণের সময় বিমান কেঁপে ওঠে, ল্যান্ডিং গিয়ারে অতিরিক্ত চাপ পড়ে এবং যাত্রীদেরও অস্বস্তির মধ্যে পড়তে হয়। রানওয়ের নতুন ও পুরোনো অংশের উচ্চতার পার্থক্যের কারণেই এই সমস্যা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে রানওয়ে-১৬ প্রান্তের একটি অংশকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে সেখানে অতিরিক্ত লেয়ার দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রকল্পের আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর কাজ শেষ না হওয়া। রাতের ফ্লাইট পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক এয়ারফিল্ড গ্রাউন্ড লাইটিং (এজিএল) ব্যবস্থা এখনো পুরোপুরি স্থাপন করা যায়নি। যশোর বিমানবন্দরে অ্যাপ্রোচ লাইটিং সিস্টেমও (রাতে আকাশ থেকে রানওয়ে দেখানোর ব্যবস্থা) বসানো হয়নি। একই সঙ্গে তিনটি আধুনিক অগ্নিনির্বাপণ গাড়ি কেনার পরিকল্পনা থাকলেও মে মাস পর্যন্ত একটি গাড়িও কেনা হয়নি। ড্রেনেজ উন্নয়ন কাজও অনেকাংশে বাকি রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ড্রেনেজ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে ভারী বৃষ্টির সময় রানওয়ের কিছু অংশে দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকে। বিশেষ করে যশোর বিমানবন্দরের ৩৪ প্রান্তে জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী হয়। এতে দীর্ঘমেয়াদে রানওয়ের স্থায়িত্ব ও বিমান পরিচালনার নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পানি দ্রুত নিষ্কাশনের জন্য নিকটবর্তী খাল বা জলাধারের সঙ্গে কার্যকর সংযোগ স্থাপনের সুপারিশ করেছে আইএমইডি।
তিন বিমানবন্দরের কাজের অগ্রগতিতেও বড় পার্থক্য দেখা গেছে। মে পর্যন্ত যশোরে কাজ শেষ হয়েছে মাত্র ৫৩ দশমিক ৩৫ শতাংশ। অন্যদিকে সৈয়দপুরে ৮৯ দশমিক ৬ শতাংশ এবং শাহ মখদুম বিমানবন্দরে ৮৬ দশমিক ১২ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। ভূমি-সংক্রান্ত জটিলতা, সচল বিমানবন্দরে নির্মাণকাজ পরিচালনা এবং অপারেশনাল সীমাবদ্ধতার কারণে যশোরে কাজ পিছিয়ে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ক্রয় কার্যক্রম পর্যালোচনায়ও ব্যয় বৃদ্ধি ও ধীরগতির চিত্র উঠে এসেছে। রানওয়ে ওভারলের তিনটি প্যাকেজেই চুক্তিমূল্য প্রাক্কলিত ব্যয়ের তুলনায় ৫২ থেকে ৫৮ শতাংশ পর্যন্ত বেশি হয়েছে। পরামর্শক সেবার ক্ষেত্রেও চুক্তিমূল্য ২৭ থেকে ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। অথচ পণ্য ক্রয়ের পাঁচটি প্যাকেজের বেশিরভাগই এখনো বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। অগ্নিনির্বাপণ গাড়ি কেনার দরপত্র পর্যন্ত আহ্বান করা হয়নি।
বাহ্যিক নিরীক্ষাতেও প্রকল্প ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ধরা পড়েছে। নিরীক্ষায় দেখা যায়, ঠিকাদারদের হালনাগাদ কর্মপরিকল্পনা দাখিল না করা সত্ত্বেও বিল থেকে অর্থ স্থগিত না রেখে পরিশোধ করা হয়েছে। এ ঘটনায় ৯ লাখ টাকার একটি অডিট আপত্তি এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। নিরীক্ষকদের মতে, সময় ব্যবস্থাপনা ও চুক্তি তদারকির দুর্বলতার কারণেই প্রকল্পের অগ্রগতি নির্ধারিত সময়ের তুলনায় পিছিয়ে পড়েছে।
তবে আইএমইডি বলেছে, রানওয়ের অ্যাসফল্ট ওভারলের নির্মাণমান, বিটুমিনের গুণগত মান এবং পেভমেন্টের শক্তি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী সন্তোষজনক। বুয়েট, রুয়েট ও কুয়েটের পরীক্ষাগারেও ব্যবহৃত উপকরণের মান গ্রহণযোগ্য পাওয়া গেছে। প্রকল্পটি পুরোপুরি শেষ হলে রানওয়ের বহনক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে এবং বড় আকারের উড়োজাহাজ পরিচালনার সুযোগ সৃষ্টি হবে। তবে তার আগে রেসা সম্প্রসারণ, রানওয়ে স্ট্রিপ প্রশস্তকরণ, এয়ারফিল্ড গ্রাউন্ড লাইটিং সম্পন্ন, ড্রেনেজ উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত না হলে প্রকল্পের প্রত্যাশিত সুফল পুরোপুরি মিলবে না বলে সতর্ক করেছে আইএমইডি।
উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা সূত্রে জানা গেছে, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) ৫৬৬ কোটি ৭৬ লাখ টাকা ব্যয়ে তিনটি বিমানবন্দরের রানওয়ে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। ২০২১ সালে শুরু হওয়া প্রকল্পটি ২০২৩ সালের মধ্যেই শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় ব্যয় না বাড়িয়ে মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। তবুও মে ২০২৬ পর্যন্ত প্রকল্পটির ভৌত অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৭৬ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি ৬১ দশমিক ৮ শতাংশ। অর্থাৎ মেয়াদ শেষের মুখেও প্রায় এক-চতুর্থাংশ কাজ অসমাপ্ত।
এসব বিষয়ে জানতে প্রকল্প পরিচালক আমিনুল হাসিব ও বেবিচকের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন শাখার পরিচালক মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমানের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের পাওয়া যায়নি।








