- ৪৪ বছরে ১১ ফলের নতুন জাত আবিষ্কার
- কাজ চলছে সবজি ও তেল জাতীয় ফসল নিয়ে
জেলা শহর থেকে ৬ কিলোমিটার দূরে মৌলভীবাজারের আকবরপুরে অবস্থিতি আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্র। ১৯৮২ সালে এই কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর দীর্ঘ ৪৪ বছর ধরে চলছে বিভিন্ন ফল ও সবজির জাত নিয়ে গবেষণা। এরই মধ্যে ১১টি ফলের জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে এই গবেষণা কেন্দ্র থেকে। যা এখন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে আছে। এছাড়াও বিভিন্ন সবজি ও মাঠ ফসল নিয়ে গবেষণার কাজ করা হচ্ছে।
মৌলভীবাজার আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে ১৯৯৬ সালে গবেষণা করে বারি পেয়ারা-২, বারি লিচি-২, বারি লিচি-৩; ১৯৯৭ সালে বারি বাতাবি লেবু-১, বারি কামরাঙ্গা-১, বারি কামরাঙা-২; ২০০৮ সালে বারি কাঁঠাল-১; ২০১২ সালে বারি আম ১০; ২০১৮ সালে বারি জারা লেবু-১ ও সবশেষে ২০২৩ সালে বারি কাঁঠাল-৫ উদ্ভাবন করা হয়েছে। এই ১১টি ফলের জাত সারা দেশে চাষ করা হচ্ছে এখন। একেকটি ফলের জাত উদ্ভাবন করতে কমপক্ষে ৫ থেকে ১০ বছর সময় লাগে।

এদিকে বর্তমানে মৌলভীবাজার আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে ড্রাগন, কাঁঠাল, জাম্বুরা, পেয়ারা, আম, আনারস, লিচুসহ লেবু জাতীয় ফলের নতুন জাত উদ্ভাবনের জন্য গবেষণামূলক কাজ চলছে।
আরও পড়ুন
চাঁপাইনবাবগঞ্জে বসেছে ১৮৩ জাতের আমের মেলা
এছাড়া সবজির মধ্যে লাউ, মিস্টি কুমড়া, চিচিঙ্গা, বরবটি, লালসাক, শিম, পটোল, টমেটোসহ বিভিন্ন সবজির জাত নিয়ে গবেষণামূলক কাজ চলছে। বিগত দিনে এসব সবজির পাশাপাশি পানি কচু, লতি কচুসহ বিভিন্ন সবজি নিয়ে গবেষণা করা হয়েছে। বিশেষ করে যেসব সবজি অন্য অঞ্চলে অধিক ফলন হলেও এই অঞ্চলে কম হয় তা কীভাবে এই অঞ্চলের আবহাওয়া ও মাটির উপযোগী করা যায় তা নিয়ে পরীক্ষা চলছে।
আঞ্চলিক এই গবেষণা কেন্দ্রে তেল জাতীয় মাঠ ফসলের জাত নিয়েও গবেষণা করা হয়। এসবের মধ্যে বাদাম, সরিষা, সূর্যমূখী, কফি ও চিনা বাদাম, গোলমরিচের জাত নিয়ে গবেষণা চলছে। একেকটি জাতের ওপর গবেষণা করে উদ্ভাবন করতে ২ থেকে ৩ বছর সময় প্রয়োজন হয়।
আরও পড়ুন
কৃষিমন্ত্রী / কাঁঠাল দিয়ে তৈরি হচ্ছে শিঙাড়া-সমুসা-কাবাব, পুষ্টিগুণও অনেক বেশি
বিভিন্ন ফলের জাত নিয়ে গবেষণামূলক কাজ করতে প্রথমে যে ফলের জাত দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বেশি উৎপাদন হচ্ছে, এসব ফলের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। এরপর এই জাত কীভাবে এই অঞ্চলের আবহাওয়া ও মাটির সঙ্গে মিল রেখে ফসল উৎপাদন করা যায় তা নিয়ে গবেষণা শুরু হয়। যদি প্রাথমিকভাবে পরীক্ষা করে এর সুফল পাওয়া যায় তখন ব্যাপকভাবে গবেষণার কাজ চালানো হয়। এছাড়া এই অঞ্চলে নতুন যেসব ফল, সবজি ও মসলা ফসল আছে এগুলো সংগ্রহ ও মূল্যায়ন করে জাত হিসেবে নির্বাচন করা হয়। অনেক সময় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিদেশে থেকে ফসল নিয়ে এসে যাচাই-বাছাই করার জন্য আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে পাঠায়। সেগুলো পরীক্ষা করে দেখা হয় এই অঞ্চলে চাষ করে ফল বা ফসল ফলানো সম্ভব কি না।

সরেজমিনে ৩১৪ বিঘা জমির ওপর গড়ে উঠা এই আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্র ঘুরে দেখা যায়, এখানে কফি গাছ, গোলমরিচ, ড্রাগন, আম, জাম্বুরা, লিচু, চিনা বাদাম, চায়না লেবু, সিড লেবু, জারা ও কলেম্বুসহ নানান প্রজাতির ফল গাছ ও মাঠ ফসল রয়েছে। এসব গাছের জাত নিয়ে গবেষণামূলক পরীক্ষা চলছে। সবজি ফসল লাউ, মিষ্টি কুমড়া, পটোল, লতা সবজিসহ বিভিন্ন সবজি এবং তেল জাতীয় ফসল নিয়ে গবেষণামূলক পরীক্ষা চলছে। এছাড়া বিক্রির জন্য কয়েক জাতের লেবু, ড্রাগনসহ কয়েকটি ফলের চারার নার্সারি করা হয়েছে। এখন চারাগাছ বিক্রি করা হয়।
আরও পড়ুন
পাহাড়ে আমের ছড়াছড়ি: দাম কমায় ক্রেতা খুশি, লোকসানে চাষি
স্থানীয় মুত্তালিব মিয়া বলেন, আমরা ছোট বেলা থেকে এই প্রতিষ্ঠান দেখে আসছি। নিরিবিলি পরিবেশে কৃষি নিয়ে গবেষণা করা হয় এখানে। অনুমতি ছাড়া সাধারণ মানুষ ভেতরে প্রবেশ করতে পারে না। এখান থেকে বিভিন্ন ফল ও গাছের চারা বিক্রি করতে দেখা যায়। এই গবেষণা কেন্দ্র থেকে বিভিন্ন ফলের জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে শুনেছি।
মৌলভীবাজার আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (কৃষিতত্ত্ব) মো. আব্দুল মাজেদ মিয়া বলেন, এখানে ফল ও সবজি নিয়ে সবচেয়ে বেশি গবেষণা করা হয়। আমরা যেসব ফলের জাত ও সবজির জাত উদ্ভাবন করি তা কৃষকরা নিয়ে চাষ করছেন। এছাড়া তেল জাতীয় ফসল সরিষা, সূর্যমুখী, বাদাম এগুলো নিয়ে গবেষণা করা হয়।
আরও পড়ুন
লিচুর বাগানে বদলে গেছে পিরোজপুরের অর্থনীতি
মৌলভীবাজার আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ মহিউদ্দীন বলেন, আমাদের এখানে কৃষি গবেষণা নিয়ে কাজ করা হয়। কীভাবে অন্য অঞ্চলের একটা ফল বা সবজি এই অঞ্চলে চাষ করা যায় তা নিয়ে আঞ্চলিক গবেষণা করা হয়। সময় যত যাচ্ছে নতুন নতুন ফল ও সবজির জাত উদ্ভাবন করা সম্ভব হচ্ছে।

সার্বিক বিষয় নিয়ে মৌলভীবাজার আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ড. মাহমুদুল ইসলাম নজরুল বলেন, এটি হচ্ছে আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্র। এখানে ফল, সবজি ও মাঠ ফসল নিয়ে গবেষণা করা হয়। আমাদের এখান থেকে এরই মধ্যে ১১টি ফলের জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। যা এখন দেশের বিভিন্ন জায়গায় চাষ হচ্ছে। আমাদের গবেষণার কাজ হচ্ছে অঞ্চলভিত্তিক। যেসব ফল, সবজি ও ফসল অন্য জায়গায় উৎপাদন হচ্ছে, কিন্তু আবহাওয়া ও মাটির বৈশিষ্ট্যের কারণে এই অঞ্চলে হচ্ছে না। তখন আমার ওইসব চারা বা বীজের বিভিন্ন গুণাগুণ দেখি। কীভাবে পোকামাকড় থেকে রক্ষা করে এই অঞ্চলে চাষ করা যায়। আমরা তখন বিভিন্ন গবেষণা করে এই অঞ্চলের আবহাওয়া ও মাটির সঙ্গে মিল রেখে জাত তৈরি করি।
আরও পড়ুন
আমের লাভ গিলে খাচ্ছে ‘ঢলন’ প্রথা
তিনি আরও বলেন, আমাদের এখানে সবকিছু নন-প্রফিটেবল অরগানাইজেশান। আমরা সীমিত মূল্যে চারা ও বীজ বিক্রি করি। আঞ্চলিক গবেষণা কেন্দ্র থাকায় এখন সময় যত যাচ্ছে নতুন নতুন ফলের জাত ও সবজি চাষ হচ্ছে এই অঞ্চলে। একটা সময় এই অঞ্চলে যেসব ফল ও সবজি চাষ হতো না, এখন সেগুলো হচ্ছে। কৃষকরাও আগ্রহী হচ্ছেন।
এফএ/জেআইএম








