• লাইসেন্স আছে ৪৮৬টির, চলছে ৭০০ প্রতিষ্ঠান
  • এক চিকিৎসকের নাম ভাঙিয়ে একাধিক ক্লিনিক
  • পরিবেশ ছাড়পত্র রয়েছে মাত্র ৮০টির

দুর্বল তদারকি ও অনিয়মের চক্রে আটকে পড়েছে বগুড়ার বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাত। সরকারি নথিতে নিবন্ধিত হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সংখ্যা ৪৮৬ হলেও বাস্তবে জেলার বিভিন্ন এলাকায় চালু রয়েছে প্রায় ৭০০ প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে অনেকগুলোর লাইসেন্স নেই, অনেকের লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হয়েছে বহু আগেই। কোথাও প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও নার্স ছাড়াই রোগী ভর্তি করা হচ্ছে, কোথাও আবার অপারেশন চলছে ন্যূনতম মানদণ্ড পূরণ না করেই। এমনকি একাধিক প্রতিষ্ঠানে একই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের নাম ব্যবহার করে রোগী আকর্ষণের অভিযোগও মিলেছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক রোগীর মৃত্যুর ঘটনায় আলোচনায় আসে জেলার কয়েকটি বেসরকারি ক্লিনিক। ভুল রক্ত প্রয়োগ, অ্যানেসথেসিয়ার ভুল ডোজ, চিকিৎসায় অবহেলা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না দেওয়ার অভিযোগে এসব মৃত্যুর ঘটনা জনমনে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কার্যকর নজরদারির অভাব, লাইসেন্সবিহীন প্রতিষ্ঠানের বিস্তার এবং মান নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতার সুযোগে একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে নিয়মের বাইরে চিকিৎসা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

নিয়ন্ত্রণের বাইরে বগুড়ার বেসরকারি স্বাস্থ্যখাত

নথিতে ৪৮৬, বাস্তবে ৭০০

বগুড়া সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় লাইসেন্সপ্রাপ্ত বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সংখ্যা ৪৮৬। এর মধ্যে ২১৫টি ক্লিনিক ও হাসপাতাল এবং ২৭১টি ডায়াগনস্টিক সেন্টার।

‘আগে দুই-একটি প্রতিষ্ঠানে রোগী দেখলেও এখন অনেক জায়গায় যাই না। তারপরও আমার নাম ব্যবহার করে রোগী টানা হচ্ছে। কোনো প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসায় অনিয়ম বা দুর্ঘটনা ঘটলে চিকিৎসকদেরও অযথা সমালোচনার মুখে পড়তে হয়। প্রশাসনের উচিত এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া।’

তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাস্তবে জেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ৭০০ প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে। অর্থাৎ দুই শতাধিক প্রতিষ্ঠান সরকারি নিবন্ধনের বাইরে অথবা লাইসেন্স নবায়ন ছাড়াই কার্যক্রম চালাচ্ছে।

স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ ২০২৩ সালে ১০টি নতুন প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ৭৬টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে কার্যক্রম বন্ধ করা হয়।

তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলো পরে নাম পরিবর্তন, মালিকানা বদল কিংবা অন্য এলাকায় স্থানান্তরের মাধ্যমে আবারো চালু হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও স্বীকার করছেন, জনবল সংকট ও সীমিত তদারকির কারণে কোন প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বৈধ, কোনটির মেয়াদ শেষ কিংবা কোথায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স ও সরঞ্জাম রয়েছে তার পূর্ণাঙ্গ ও হালনাগাদ তথ্য অনেক ক্ষেত্রেই তাদের কাছে নেই। ফলে নিয়মিত নজরদারির বাইরে থেকেই পরিচালিত হচ্ছে অসংখ্য প্রতিষ্ঠান।

আরও পড়ুন

তীব্র ওষুধ সংকটে ধুঁকছে কমিউনিটি ক্লিনিক

এক চিকিৎসকের নাম একাধিক প্রতিষ্ঠানে

অনুসন্ধানে বগুড়া শহরের বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে একই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের নাম একাধিক প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড, প্রচারপত্র ও সেবার তালিকায় ব্যবহার করার চিত্র পাওয়া গেছে। অনেক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকেরা নির্দিষ্ট দিনে বা অন-কল ভিত্তিতে সেবা দিলেও, কোথাও কোথাও তাদের নাম ব্যবহার করে নিয়মিত চিকিৎসাসেবা দেওয়ার ধারণা তৈরি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

নিয়ন্ত্রণের বাইরে বগুড়ার বেসরকারি স্বাস্থ্যখাত

শহরের জি.বি. জেনারেল হাসপাতাল, আল-সাফা জেনারেল হাসপাতাল, পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার, এলাইড হেলথ কেয়ার, নর্থ বেঙ্গল কার্ডিওভাসকুলার অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতাল, ডক্টর ক্লিনিকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে।

‘সরকারি দায়িত্ব শেষে অবসর সময়ে দুই-তিনটি ক্লিনিকে রোগী দেখি। প্রয়োজন হলে অন-কল ভিত্তিতেও যাই। তবে যেসব প্রতিষ্ঠানে আমি সেবা দিই না, সেখানেও আমার নাম ব্যবহার করা হচ্ছে।’

অনুসন্ধানে দেখা যায়, শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নাক, কান ও গলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও সার্জন ডা. হাবিবুর রহমান রতনের নাম শহরের সার্ক জেনারেল হাসপাতাল, সৃষ্টি জেনারেল হাসপাতাল, সারা হাসপাতালসহ প্রায় ১৫ থেকে ২০টি প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড ও প্রচারসামগ্রীতে ব্যবহার করা হচ্ছে।

একইভাবে নাক, কান ও গলা বিশেষজ্ঞ ডা. সৈয়দ ছানাউল ইসলামের নাম জি.বি. জেনারেল হাসপাতাল, আল-সাফা জেনারেল হাসপাতাল, গ্রীন লাইফ ক্লিনিক ও এলাইড হেলথ কেয়ারে পাওয়া গেছে।

এছাড়া মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. আমিনুল হাসান, নাক, কান ও গলা বিশেষজ্ঞ ডা. এম. এ. ওয়াহেদ, হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. অলোক চন্দ্র সরকার, নিউরো মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. মো. নাজমুল হক, ইউরোলজিস্ট ডা. আবেদীন বিল্লাহ, গাইনি বিশেষজ্ঞ ডা. রোকসানা শারমিন শান্তা, নিউরোসার্জন ডা. মিল্টন কুমার সাহা, কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. স্বপন কুমার সাহা, শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. হুর-ই-জান্নাত আফরোজা হক (রীমা), হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মো. ফয়সাল ফারুক, চর্ম ও যৌনরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মো. আলতাফ হোসেন, মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. রীপা কুণ্ডু, নবজাতক বিশেষজ্ঞ ডা. এ কে বাসক, ডা. মো. আব্দুল হাই, বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ ডা. অলোক কুমার সরকার এবং প্রসূতি বিশেষজ্ঞ ডা. নুসরাত শরমিনের নামও একাধিক প্রতিষ্ঠানে ব্যবহার হতে দেখা গেছে।

এ বিষয়ে ডা. হাবিবুর রহমান রতন বলেন, আগে দুই-একটি প্রতিষ্ঠানে রোগী দেখলেও এখন অনেক জায়গায় যাই না। তারপরও আমার নাম ব্যবহার করে রোগী টানা হচ্ছে। কোনো প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসায় অনিয়ম বা দুর্ঘটনা ঘটলে চিকিৎসকদেরও অযথা সমালোচনার মুখে পড়তে হয়। প্রশাসনের উচিত এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া।

নিয়ন্ত্রণের বাইরে বগুড়ার বেসরকারি স্বাস্থ্যখাত

প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. নুসরাত শরমিন বলেন, সরকারি দায়িত্ব শেষে অবসর সময়ে দুই-তিনটি ক্লিনিকে রোগী দেখি। প্রয়োজন হলে অন-কল ভিত্তিতেও যাই। তবে যেসব প্রতিষ্ঠানে আমি সেবা দিই না, সেখানেও আমার নাম ব্যবহার করা হচ্ছে।

অন্যদিকে নর্থ বেঙ্গল কার্ডিওভাসকুলার অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোকাব্বর হোসেন রাজু বলেন, তাদের প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসকেরা অন-কল ভিত্তিতে রোগী দেখেন এবং রোগীদের আগেই চিকিৎসকদের উপস্থিতির সময় জানিয়ে দেওয়া হয়।

বন্ধন হাসপাতালের পরিচালক রেজোয়ানুল ইসলাম বলেন, সরকারি হাসপাতালের দায়িত্ব শেষ করার পর চিকিৎসকরা বিকেল থেকে তাদের প্রতিষ্ঠানে রোগী দেখেন। অধিকাংশ অস্ত্রোপচারও রাতের দিকে সম্পন্ন করা হয়।

‘বিশেষ করে গ্রামাঞ্চল থেকে আসা অনেক রোগী দালালের মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠানে গিয়ে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। এ বিষয়ে সচেতনতার পাশাপাশি নজরদারিও আরও জোরদার করা হবে।’

স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক একাধিক প্রতিষ্ঠানে অন-কল ভিত্তিতে সেবা দিতেই পারেন। তবে কোনো চিকিৎসক নিয়মিত উপস্থিত না থেকেও তার নাম ব্যবহার করে রোগী আকর্ষণ করা হলে সেটি রোগীদের বিভ্রান্ত করতে পারে। এ ধরনের অভিযোগের বিষয়ে কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন বলেও মনে করছেন তারা।

আরও পড়ুন

ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠা ক্লিনিক সীমাবদ্ধ করতে হবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

একের পর এক মৃত্যুতে প্রশ্নের মুখে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা

জেলার বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়ে একের পর এক রোগীর মৃত্যুর ঘটনায় স্বাস্থ্যসেবার মান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগের ধরন ভিন্ন হলেও প্রায় প্রতিটি ঘটনার কেন্দ্রে রয়েছে চিকিৎসায় অবহেলা, ভুল চিকিৎসা, নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি কিংবা দায়িত্ব পালনে গাফিলতির বিষয়টি। প্রতিটি ঘটনার পর প্রশাসন তদন্ত কমিটি গঠন ও আইনি পদক্ষেপের কথা জানালেও অনিয়মের ধারাবাহিকতা থামেনি।

সম্প্রতি শহরের খান্দার এলাকার সুস্বাস্থ্য ক্লিনিকে ভুল রক্ত প্রয়োগের অভিযোগে প্রসূতি আফরিন জাহান অহনার মৃত্যু হয়। একই সময়ে কানছগাড়ী এলাকার সৃষ্টি জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসকদের অবহেলায় শিশু আব্দুল্লাহ আল আয়ানের মৃত্যুর অভিযোগ ওঠে। এর কিছুদিন পর বাদুড়তলা প্রেসপট্টি এলাকার সারা হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে টনসিল অপারেশনের সময় অ্যানেসথেসিয়ার ভুল ডোজ প্রয়োগের অভিযোগে মারা যান শাপলা বেগম।

এসবের আগে ঠনঠনিয়া এলাকার প্রভাতী ডায়াগনস্টিক সেন্টার অ্যান্ড হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়ে ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা জবা বালা রানীর মৃত্যু হয়। জলেশ্বরীতলার এনাম ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে প্রসূতি রোখসানা আক্তার ও তার গর্ভের সন্তানের মৃত্যুর অভিযোগও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। একইভাবে সোনার দেশ ক্লিনিকে চিকিৎসা নিতে গিয়ে উজ্জ্বল হোসেনের মৃত্যুর ঘটনায় স্বজনদের বিক্ষোভ দেখা দেয়।

নিয়ন্ত্রণের বাইরে বগুড়ার বেসরকারি স্বাস্থ্যখাত

এসব ঘটনার তদন্ত এখনো বিভিন্ন পর্যায়ে চলমান। তবে স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্টদের মতে, একের পর এক একই ধরনের অভিযোগ সামনে আসা বেসরকারি স্বাস্থ্যখাতে কার্যকর তদারকি ও মান নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে।

প্রয়োজনীয় জনবল ছাড়াই চলছে চিকিৎসাসেবা

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, জেলার অনেক বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতালে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নিবন্ধিত নার্স ও প্রশিক্ষিত জনবল ছাড়াই রোগী ভর্তি এবং চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। কোথাও পর্যাপ্ত ডিউটি ডাক্তার নেই, কোথাও আবার সীমিত জনবল দিয়ে তিন শিফটের কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এমনকি অস্ত্রোপচারের মতো ঝুঁকিপূর্ণ চিকিৎসাসেবাও পরিচালিত হচ্ছে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও জনবল ছাড়াই।

শহরের মফিজপাগলা মোড়ের একতা ক্লিনিকে কর্তৃপক্ষ বৈধ লাইসেন্স দেখাতে পারেনি। সেখানে চিকিৎসা কার্যক্রমে মেডিকেল টেকনোলজিতে অধ্যয়নরত কয়েকজন শিক্ষার্থী কাজ করছেন বলে অনুসন্ধানে দেখা গেছে। রোগীদের অপরিচ্ছন্ন কক্ষে রাখা হচ্ছে এবং ব্যবহৃত চিকিৎসাসামগ্রীও যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে না।

ঠনঠনিয়া এলাকার সার্ক জেনারেল হাসপাতাল ও রুপালী ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়া ওয়ার্ড, টয়লেট ও চিকিৎসা কক্ষের পরিচ্ছন্নতা নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন স্থানে ব্যবহৃত ব্যান্ডেজ ও চিকিৎসাবর্জ্য খোলা অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা গেছে।

সার্ক জেনারেল হাসপাতালের ডিউটি চিকিৎসক ডা. মোমিনুর ইসলাম বলেন, তাদের প্রতিষ্ঠানে তিনজন ডিউটি চিকিৎসক ও তিনজন নিবন্ধিত নার্স রয়েছেন এবং লাইসেন্স নবায়নের কার্যক্রম চলছে।

একই প্রতিষ্ঠানের নার্স তানিয়া আক্তার জানান, বিধি অনুযায়ী ছয়জন নার্স থাকার কথা হলেও বর্তমানে তিনজন দায়িত্ব পালন করছেন।

অন্যদিকে শতদল কমিউনিটি হাসপাতালের ডিউটি চিকিৎসক ডা. রাকিব হাসান বলেন, তাদের প্রতিষ্ঠানে তিন শিফটে তিনজন চিকিৎসক ও তিনজন নার্স দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া প্রায় ১৫ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অন-কল ভিত্তিতে সেবা দিয়ে থাকেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নীতিমালা অনুযায়ী, ১০ শয্যার একটি হাসপাতাল বা ক্লিনিকে কমপক্ষে তিনজন এমবিবিএস চিকিৎসক, ছয়জন নিবন্ধিত নার্স, সার্জন, অ্যানেসথেসিস্ট, মেডিসিন ও গাইনি বিশেষজ্ঞ থাকার কথা। কিন্তু অনুসন্ধানে জেলার অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে এই মানদণ্ড পুরোপুরি অনুসরণ করতে দেখা যায়নি।

আরও পড়ুন

জাতীয় হৃদরোগ হাসপাতাল / দালাল-চোরের দৌরাত্ম্যে অতিষ্ঠ রোগী-চিকিৎসক

অধিকাংশ ক্লিনিক পরিবেশ ছাড়পত্রহীন

চিকিৎসাসেবার অনিয়মের পাশাপাশি পরিবেশগত বিধি মানার ক্ষেত্রেও বগুড়ার অধিকাংশ বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে রয়েছে গুরুতর অভিযোগ।

পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় কয়েকশ বেসরকারি স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠান কার্যক্রম পরিচালনা করলেও পরিবেশ ছাড়পত্র রয়েছে মাত্র ৮০টির। ফলে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় পরিবেশগত অনুমোদন ছাড়াই চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী, হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পরিবেশগত ছাড়পত্র গ্রহণ এবং নির্দিষ্ট সময় পরপর তা নবায়ন বাধ্যতামূলক। একই সঙ্গে অপারেশন থিয়েটার, প্যাথলজি ল্যাব ও অন্যান্য ইউনিট থেকে উৎপন্ন সংক্রামক ও রাসায়নিক বর্জ্য নিরাপদে ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা থাকা এবং যেখানে প্রযোজ্য সেখানে বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি) স্থাপন করার বিধান রয়েছে।

তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেই চিকিৎসাবর্জ্য ব্যবস্থাপনা সন্তোষজনক নয়। অনেক জায়গায় ব্যবহৃত ব্যান্ডেজ, সিরিঞ্জ, রক্তমাখা তুলাসহ চিকিৎসাবর্জ্য সাধারণ ময়লার সঙ্গে ফেলে দেওয়া হচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।

নিয়ন্ত্রণের বাইরে বগুড়ার বেসরকারি স্বাস্থ্যখাত

পরিবেশ অধিদপ্তরের রাজশাহী বিভাগীয় পরিচালক নিলুফা ইয়াসমিন বলেন, পরিবেশ ছাড়পত্র ছাড়া কোনো হাসপাতাল, ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টার পরিচালনার সুযোগ নেই। কিন্তু অনেক প্রতিষ্ঠান এই বাধ্যবাধকতা মানছে না। বিষয়টি উদ্বেগজনক। নিয়ম না মানা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বগুড়ার সিভিল সার্জন খুরশীদ আলম বলেন, নিবন্ধনবিহীন ও অনুমোদনহীন যেসব ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার তালিকার বাইরে থেকে পরিচালিত হচ্ছে, সেগুলোর বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি বলেন, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চল থেকে আসা অনেক রোগী দালালের মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠানে গিয়ে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। এ বিষয়ে সচেতনতার পাশাপাশি নজরদারিও আরও জোরদার করা হবে।

স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্ট প্রবীণ চিকিৎসক আলী হাশেমের মতে, শুধু অভিযান চালিয়ে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বন্ধ করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। বেসরকারি স্বাস্থ্যখাতে নিয়মিত পরিদর্শন, লাইসেন্স নবায়নের কার্যকর তদারকি, চিকিৎসক ও জনবলের উপস্থিতি নিশ্চিত করা, চিকিৎসাবর্জ্য ব্যবস্থাপনার কঠোর নজরদারি এবং অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা না গেলে রোগীদের নিরাপদ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা কঠিন হবে।

এফএ/এএসএম