পাচার করা অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকার আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জোরালো উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। 

তিনি জানিয়েছেন, এ পর্যন্ত ১৩টি দেশে ২৩টি আইনি সহযোগিতা অনুরোধ (Mutual Legal Assistance Request) পাঠানো হয়েছে। একইসঙ্গে প্রায় ৭২ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকার সম্পদ জব্দ বা ফ্রিজ করা হয়েছে।

সোমবার (২৯ জুন) জাতীয় সংসদ প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব তথ্য জানান। 

অর্থমন্ত্রী বলেছেন, “জনগণের অর্থ আত্মসাৎকারীদের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে। অর্থপাচার রোধ ও পাচার হওয়া সম্পদ ফেরাতে কার্যকর কূটনৈতিক ও আইনি প্রক্রিয়া অব্যাহত আছে।”

তিনি জানান, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ও সম্পদ পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে একাধিক দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ চলছে। সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর আওতায় ইতোমধ্যে সম্পদ শনাক্ত, জব্দ ও ফ্রিজ করার কার্যক্রম এগিয়েছে, যা ভবিষ্যতে অর্থ ফেরত আনার প্রক্রিয়াকে আরো শক্তিশালী করবে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, “সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হলো— জনগণের সম্পদ পুনরুদ্ধার এবং আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে দেশি ও বিদেশি আইনি সহায়তা গ্রহণের পাশাপাশি কূটনৈতিক উদ্যোগও জোরদার করা হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী বাজেটকে কেবল আর্থিক দলিল নয়, বরং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, কাঠামোগত সংস্কার ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির রূপরেখা হিসেবে উল্লেখ করে তা পাসের আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, বাজেট নিয়ে সংসদে দীর্ঘ, প্রাণবন্ত ও গঠনমূলক আলোচনা হয়েছে। সংসদ সদস্যদের পাশাপাশি অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী সংগঠন, সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যমের মতামতকে সরকার গুরুত্ব দিয়েছে। 

সংসদীয় গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হিসেবে তিনি মতের ভিন্নতা সত্ত্বেও জাতীয় স্বার্থে একসঙ্গে কাজ করার বিষয়টি তুলে ধরেন।

অর্থমন্ত্রী দাবি করেন, সরকার একটি ভঙ্গুর ও বিপর্যস্ত অর্থনীতি উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছে। বিগত সময়ের আর্থিক খাতের দুর্বলতা, বিনিময় হার অস্থিতিশীলতা ও বৈশ্বিক চাপ অর্থনীতিকে চ্যালেঞ্জে ফেলেছে। তবে, সরকার পুনরুদ্ধার, উত্তরণ ও পুনর্গঠনের (3R) কৌশলের মাধ্যমে অর্থনীতিকে এগিয়ে নিচ্ছে।

তিনি জানান, সরকারের লক্ষ্য—মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং ৬.৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন। মুদ্রানীতি ও রাজস্ব নীতির সমন্বয়, কর ব্যবস্থার ডিজিটালাইজেশন, বাজার ব্যবস্থাপনা শক্তিশালীকরণ এবং সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কাজ চলছে।

রাজস্ব আহরণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, করহার না বাড়িয়ে করভিত্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজস্ব বৃদ্ধির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এনবিআর ইতোমধ্যে ৪ লাখ কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের মাইলফলক অতিক্রম করেছে।

ঋণ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তরই সরকারের লক্ষ্য। পুঁজিবাজার, বন্ড মার্কেট ও বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনাকে টেকসই করার পাশাপাশি ব্যাংক ঋণনির্ভরতা ধীরে ধীরে কমানো হবে।

তিনি বলেন, বেসরকারি খাতই ভবিষ্যৎ অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। বিদেশি বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, এসএমই ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে বিনিয়োগ বৃদ্ধির মূল ভিত্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

অর্থমন্ত্রী স্বীকার করেন, বাজেট বাস্তবায়নই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, রাজস্ব ঘাটতি ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এর প্রধান বাধা। 

তিনি বলেন, বাজেটের সাফল্য তার ঘোষণায় নয়, বরং বাস্তবায়নে। সরকার একটি সমৃদ্ধ, ন্যায়ভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে।