কারো কারো মতে আর্জেন্টিনাকে রেফারি সবচেয়ে বেশি ফেভার করে। এমনও বলা হচ্ছে, আর্জেন্টিনা আর মেসি রেফারির সর্বাধিক আনুকূল্য পায়। একই সঙ্গে মেসি ও আর্জেন্টিনা রেফারির ওই আনুকুল্য নিয়েই সাফল্য পায়। পাচ্ছেও।

দালিলিক প্রমাণ হিসেবে আর্জেন্টিনা-বিরোধীরা সবার আগে উপস্থাপন করে পেনাল্টির সিদ্ধান্তকে। ২০২২ থেকে এবার মিশরের সঙ্গে প্রি-কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচ পর্যন্ত আর্জেন্টিনা ৮টি পেনাল্টি পেয়েছে। এর মধ্যে কাতার বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পথে মেসির দল পেয়েছিল ৫টি পেনাল্টি। আর এবার তাদের পাওয়া পেনাল্টির সংখ্যা ৩টি।

এর বাইরে ৭ জুলাই মঙ্গলবার, আমেরিকার আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে মিশরের সঙ্গে সেরা ষোলোর লড়াইয়ে আর্জেন্টিনার পক্ষে ফরাসি রেফারি ও ভিএআরের পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ, সিদ্ধান্তের কথা বলা হচ্ছে। মিশরের সঙ্গে ০-২ গোলে পিছিয়ে পড়া ম্যাচে প্রথমে পেনাল্টি মিস করেও শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনা যে জানপ্রাণ দিয়ে লড়াই করে নিজেদের বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সংগ্রামী জয় পেয়েছে, তা প্রশংসিত হচ্ছে কম।

দলের প্রধান চালিকাশক্তি মেসির পেনাল্টি মিস, তারপর ২ গোলে পিছিয়ে পড়ে ভড়কে না গিয়ে, হাল ছেড়ে না দিয়ে উল্টো সাহস ও সামর্থ্যে আস্থা এবং বুকভরা আত্মবিশ্বাস নিয়ে লড়ে ফুটবলের এক অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করে মিশরের সঙ্গে আর্জেন্টিনা যে ৩-২ গোলের অবিস্মরণীয় জয়ে সেরা আটে পৌঁছে গেছে, তা নিয়ে যত না আর্জেন্টিনার প্রশংসা হচ্ছে, তার চেয়ে বেশি শোনা যাচ্ছে ফরাসি রেফারির খেলা পরিচালনা, তার দেওয়া সিদ্ধান্ত আর ভিএআরে মিশরের গোল বাতিল এবং আর্জেন্টিনার জয়সূচক গোলের আগে ফাউলের আবেদন অগ্রাহ্য করার কথা।

Messi

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক পোস্ট দেখে মনে হচ্ছে, আর্জেন্টিনা আসলে ভালো খেলেনি। মানে জেতার খেলা খেলেনি। বরং মিশর ভালো খেলেছে বেশি। বলের নিয়ন্ত্রণ বেশির ভাগ সময় সালাহ আর জিকো ও ইব্রাহিমদের পায়েই বেশি ছিল। শুধু ২ গোলে এগিয়ে যাওয়াই নয়, আক্রমণ শানানো, গোলের সুযোগ তৈরি এবং গোলে শট ও হেড নেওয়ার ক্ষেত্রেও মিশর এগিয়ে ছিল। কিন্তু রেফারি ইচ্ছে করে মিশরকে হারিয়ে দিয়েছেন।

মানে ভাবখানা এমন, আর্জেন্টিনা জেতেনি। জেতার খেলা খেলেনি। এমনি এমনি রেফারি তাদের তিনটি গোল উপহার দিয়েছেন। অভিযোগের সুরে বলা হচ্ছে, মিশরের একটি ন্যায্য গোল বাতিল করা হয়েছে এবং আর্জেন্টিনার জয়সূচক গোলটিও ফেয়ার ছিল না। গোলের আগে সালাহকে ফাউল করেছিলেন আর্জেন্টাইন ফুটবলার এবং সেটা পেনাল্টিও হতে পারত। রেফারি তা আমলে আনেননি।

আসলে কি তাই? সত্যিই ফরাসি রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ে আর্জেন্টিনাকে জিতিয়ে দিয়েছেন? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গেলে কিন্তু তাই মনে হবে। কারো কারো বক্তব্য, আর্জেন্টিনা ‘কমিটির দল’।

শুধু মঙ্গলবার রাতের ম্যাচটিই না। তাদের অভিযোগ, গত দুই বিশ্বকাপ ধরে আর্জেন্টিনার প্রায় প্রতি ম্যাচেই শোনা যাচ্ছে একই ধরনের অভিযোগ। আর্জেন্টিনা নিজের যোগ্যতায় ভালো খেলে, প্রতিপক্ষের চেয়ে উন্নত ফুটবলশৈলী ও নৈপুণ্য উপহার দিয়ে, গোলের উৎস রচনা করে এবং গোলে বেশি শট ও হেড নিয়ে যোগ্যতর দল হিসেবে জেতে না। রেফারিই আর্জেন্টাইনদের জিতিয়ে দিয়েছেন। দিচ্ছেনও।

খেলায় রেফারি খেলার অংশ। এবং মাঠে তার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। জয়-পরাজয়ের পাশাপাশি রেফারির সিদ্ধান্ত শেষ কথা জেনে, বুঝেই সব দল মাঠে নামে। রেফারিও রক্তে-মাংসে গড়া মানুষ। তারও ভুল হতে পারে। হয়ও। কিন্তু রেফারির বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে তার সঙ্গে আর্জেন্টিনাকে ‘কমিটির দল’ অভিহিত করা কেন? আর্জেন্টিনা কি তবে রেফারিনির্ভর দল?

সময় এসেছে, এ বিষয়টা খোলাসা করার। না হয় এমনভাবে বলা ও লেখা হচ্ছে, যা শুনে ও পড়ে মনে হচ্ছে আর্জেন্টিনা বোধ হয় বাজে দল। ফিফার নির্দেশে রেফারিরা আর্জেন্টিনাকে বারবার টেনে তুলছেন। মানছি, রেফারির কোনো সিদ্ধান্ত ভুল হতে পারে। রেফারির ভুল বাঁশি কোনো দলের ক্ষতির কারণ হতেই পারে। তাই বলে রেফারির জোরেই আর্জেন্টিনা একের পর এক ম্যাচ জিতে চলেছে, তা যে মোটেই সত্য নয়, এ অভিযোগ যুক্তিহীন। অসাড়।

Mesi

এ প্রতিবেদনে আমি তা প্রমাণের চেষ্টা করব।

আমার প্রশ্ন হলো, মেসি ও আর্জেন্টিনাকে রেফারি ফেভার করছেন, এই অভিযোগ করার আগে কেউ কেন খুঁটিয়ে দেখছে না, আর্জেন্টিনা শুধু নয়, কোনো দলের পক্ষে শুধু রেফারি ও কারিগরি প্রযুক্তির বাড়তি সুবিধা নিয়ে একের পর এক ম্যাচ জেতা ও বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়া সম্ভব না।

একটি উদাহরণ দেই, আশা করছি পুরো বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। সেটা হলো, আর্জেন্টিনার গোল, পেনাল্টি নিয়ে যে এত কথা, নানা অভিযোগ, সেগুলো যারা উত্থাপন করছেন, তারা কেন একটিবার ভাবছেন না যে, আর্জেন্টাইনরা যদি আক্রমণ না করত, তারা যদি প্রতিপক্ষ রক্ষণভাগে হানা দিতে না পারত, আর্জেন্টাইনদের মুহুর্মুহু আক্রমণে যদি প্রতিপক্ষ রক্ষণভাগ ভেঙে না পড়ত, তাদের মিডফিল্ডার, ফরোয়ার্ড ও উইংরা যদি প্রতিপক্ষের ডি-বক্সের ভেতরে বল নিয়ে ঢুকতে না পারত, গোলের সুযোগ তৈরি না হতো, তাহলে কি রেফারি চাইলেই পেনাল্টি দিয়ে আর্জেন্টিনাকে জেতার সুযোগ করে দিতে পারতেন?

মানে প্রতিপক্ষের হাফ সীমানা কিংবা বক্সের বাইরে ফাউল বা হ্যান্ডবলের কারণে কি আর্জেন্টিনাকে পেনাল্টি দেওয়া সম্ভব হতো?

নিশ্চয়ই হতো না। এটা বোঝার জন্য বড় ফুটবলবোদ্ধা হতে হয় না, পাড়ার, গলির অবুঝ কিশোরও বোঝে, জানে; আক্রমণ না করে প্রতিপক্ষের ডি-বক্স বা বিপজ্জনক এলাকার ভেতরে ঢুকতে না পারলে পেনাল্টি হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে। এখন আর্জেন্টিনা বারবার পেনাল্টি পাচ্ছে, মানেই যে রেফারি সেই বক্সের বাইরের ফাউল আর হ্যান্ডবল থেকে পেনাল্টির বাঁশি বাজাচ্ছেন, তা তো নয়।

মেসি, নিকো গনসালেস, হুলিয়ান আলভারেজ, এনজো ফার্নান্দেজ, লাউতারো মার্টিনেজ ও রোমেরোরা অবশ্যই প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগে বারবার হানা দিয়েছেন, দিচ্ছেন। তাদের আটকাতে কেপ ভার্দে, মিশরের রক্ষণভাগের খেলোয়াড়রা হিমশিম খাচ্ছেন। হয় ইচ্ছাকৃত, না হয় অনিচ্ছাকৃতভাবে ফাউল করে বসছেন। কিংবা কারও হাতে বল লেগে যাচ্ছে। আর তাতেই রেফারি পেনাল্টির বাঁশি বাজাচ্ছেন।

Messi

আর তাই আর্জেন্টিনা পেনাল্টি পাচ্ছে। সে পেনাল্টি থেকে গোল আদায় করে নিয়ে হয়তো এগিয়ে যাচ্ছে। না হয় পিছিয়ে থাকা অবস্থায় গোল শোধ করে ম্যাচে ফিরছে।

বেশি দূর পিছনে ফিরে তাকানোর দরকার নেই। কেপ ভার্দে আর মিশরের সঙ্গে পরপর দুই ম্যাচে আর্জেন্টিনা যে পিছিয়ে থেকে ৩-২ গোলে জিতেছে, সেই দুই ম্যাচের চালচিত্র ও মিনিট-টু-মিনিট খেলার বর্ণনা পড়ুন, দেখবেন, পিছিয়ে পড়ে হতোদ্যম না হয়েও কী আক্রমণটাই না শানিয়েছে আর্জেন্টিনা। যাকে বলে মুহুর্মুহু আক্রমণ। সাঁড়াসি আক্রমণ। ফুটবল জাদুকর লিওনেল মেসির সাজিয়ে, গুছিয়ে দেওয়া বল থেকেই বেশির ভাগ আক্রমণের উৎস রচিত হচ্ছে। নিকো গনসালেস, হুলিয়ান আলভারেজ, এনজো ফার্নান্দেজ ও লাউতারো মার্টিনেজদের সেই সাজানো-গোছানো ও ধারালো আক্রমণই আর্জেন্টিনার সাফল্যের মূল শক্তি।

আসুন দেখে নেই, শেষ দুই ম্যাচে, মানে নেক ভার্দে আর মিশরের সঙ্গে আর্জেন্টিনার আক্রমণের তীব্রতা, তীক্ষ্ণ ধার কতটা ছিল।

কেপ ভার্দে ও মিশরের বিপক্ষে টানা দুই নকআউট ম্যাচে আর্জেন্টিনা দেখিয়েছে, তারা পিছিয়ে পড়লেও নিজেদের খেলার ধরন বদলায় না; বরং শেষ দিকে আক্রমণের তীব্রতা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়। কেপ ভার্দের বিপক্ষে ৩-২ জয়ের ম্যাচে লিওনেল স্কালোনির দল বলের দখল রেখেছিল ৫৯.২ শতাংশ সময়।

ওই ম্যাচে আর্জেন্টাইনরা গোলে ২২টি শট নেয়, যার ১২টি ছিল লক্ষ্যে। প্রত্যাশিত গোল ছিল ২.৭৩। নিকোলাস গনসালেস, লিওনেল মেসি, হুলিয়ান আলভারেজ, এনজো ফার্নান্দেজ ও লাউতারো মার্টিনেজদের নেতৃত্বে শেষ ভাগে আক্রমণের গতি বাড়িয়ে ম্যাচ ঘুরিয়ে দেয় আর্জেন্টিনা।

গতকাল মঙ্গলবার মিশরের বিপক্ষেও একই চিত্র আরও নাটকীয়ভাবে দেখা গেছে। ২-০ গোলে পিছিয়ে থাকার পর শেষ ১১ মিনিটে ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো (৭৯'), লিওনেল মেসি (৮৩') এবং এনজো ফার্নান্দেজ (যোগ করা সময়) গোল করে ৩-২ ব্যবধানে জেতায় আর্জেন্টিনা। পুরো ম্যাচে তাদের বল দখল ছিল ৫৮ থেকে ৬৪ শতাংশের মধ্যে (বিভিন্ন পরিসংখ্যান সরবরাহকারীর হিসেবে)।

মিশরের সঙ্গে ম্যাচে আর্জেন্টাইনরা গোলে ১৭ থেকে ১৯টি শট নেয়, যার ৭টি লক্ষ্যে ছিল। প্রত্যাশিত গোল ছিল প্রায় ২.৬২ থেকে ২.৯০, বিপরীতে মিশরের মাত্র ০.৫৯-০.৯৭। সবচেয়ে বড় কথা হলো, সমতায় ফেরার আগে গোলের নেশায় মত্ত আর্জেন্টিনা ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করে মিশরের গোলমুখে ৩০টি ক্রস ফেলে। যা থেকে ১২টি সুযোগ তৈরি হয়। ৬টি কর্নারও মেলে।

নিজেদের মাঝে দেওয়া-নেওয়ার সময় ৯১ শতাংশ পাস সফল হওয়ায় মিশরকে নিজেদের সীমানায়ই আটকে রাখে আর্জেন্টিনা। মেসির গোল ও অ্যাসিস্ট, রোমেরোর হেড এবং লাউতারো মার্টিনেজের অ্যাসিস্টে এনজো ফার্নান্দেজের জয়সূচক গোল প্রমাণ করে, স্কালোনির দল শেষ বাঁশি বাজার আগ পর্যন্ত আক্রমণাত্মক ফুটবলেই বিশ্বাস করে।

প্রতিপক্ষের ‘কাউন্টার অ্যাটাক’ সামলাতে আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডাররা কয়েকবার ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে গোল হজম করলেও স্কালোনির দলের গোলপোস্ট মোটামুটি নিখুঁত। মিডফিল্ডাররা বেশির ভাগ সময় নিয়ন্ত্রণ রেখেছেন।

আর আক্রমণভাগ ছিল অত্যন্ত সচল। পুরো দলকে দেখে মনে হচ্ছে, একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্যে নেমেছেন সবাই। জিততে হবে। এবং একটার পর একটা ম্যাচ জিতে ধীরে ধীরে লক্ষ্যে পৌঁছানোর সংকল্প সবার চোখেমুখে। আর্জেন্টাইনদের শারীরিক অভিব্যক্তিই বলে দিচ্ছে, তারা শিরোপা ধরে রাখার মিশনে নেমেছেন। মাঠে তাদের ছুটোছুটি, বল তাড়া করা, বল নিয়ন্ত্রণ, পাসিং আর কখনো দুই উইং, কিংবা কখনো প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের মাঝখানে ফাটল ধরিয়ে ডিফেন্স-চেরা থ্রুতে গোলের উৎস রচনা করে প্রতিপক্ষ দলকে ব্যতিব্যস্ত রাখছে আর্জেন্টাইনরা।

Messi

প্রতিটি খেলোয়াড় সামর্থ্যের সবটুকু নিংড়ে চেষ্টা করছেন। বল হারালে তা পুনরুদ্ধারের প্রাণান্ত চেষ্টা থাকে। মাঝমাঠের খেলোয়াড়রা কখনো রক্ষণভাগে সহায়তা করা, আবার পরক্ষণে আক্রমণে শরিক হওয়ার কাজটিও করছেন সমান দক্ষতা ও বিশ্বস্ততায়। নিজেদের মধ্যে দেওয়া-নেওয়া করে সাজানো-গোছানো আক্রমণেই হোক কিংবা কাউন্টার অ্যাটাকেই হোক, উইংগুলো বিদ্যুতের গতিতে প্রতিপক্ষের বক্সে ঢুকে পড়ছেন। কখনো ক্রস, সেন্টার, আবার কোনো সময় শট নিয়ে গোলের উৎস রচনার কাজে বেশ পারদর্শিতা দেখিয়েছেন উইঙ্গাররা। ৭ জুলাই মিশরের বিপক্ষে জয়সূচক গোলটিও ঠিক তেমনি এক আক্রমণ থেকেই হয়েছে।

মিশরের স্ট্রাইকার সালাহ বলের নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর তা চলে যায় হুলিয়ান আলভারেজের পায়ে। তিনি কালবিলম্ব না করে সেই বল লম্বা শটে ডান দিকের টাচলাইন বরাবর বাড়িয়ে দেন লাউতারো মার্টিনেজের কাছে। তা ধরে খানিকটা দৌড়ে সামনে গিয়ে লাউতারো মার্টিনেজ একদম মাপা সেন্টার করেন মিশরের বক্সের ঠিক মাঝামাঝি। বিপরীত দিক থেকে ছুটে আসা এনজো ফার্নান্দেজ সেই বলে দারুণ প্লেসিং হেডে মুহূর্তে পাঠিয়ে দেন মিশরের জালে। ওই গোলটিই বলে দেয়, খেলার অন্তিম মুহূর্তেও জয়সূচক গোলের তাগিদ শুধু নয়, বুদ্ধি খাটিয়ে জয়সূচক গোল আদায়ের চিন্তা, চেষ্টাও ছিল প্রচুর।

লিওনেল মেসি আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় সম্পদ। শক্তি। কার্যকর অস্ত্র। কখনো পায়ের কাজ দিয়ে, কখনো অল্প জায়গায় বুদ্ধি ও মেধা খাটিয়ে বল বের করা, জায়গা বাড়িয়ে আক্রমণের তীব্রতা বাড়ানোর কাজ করছেন মেসি। চোখের পলকে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে ফাঁকি দিয়ে নিজে ঢুকে পড়ার পাশাপাশি দুই দিকে কিংবা সামনে খুব ভালো পাস দিয়ে গোলের সম্ভাবনা তৈরির কাজেও মেসি এখনো সবার সেরা।

যে কোনো জায়গা থেকে মুহূর্তে লক্ষ্যভেদী প্রচণ্ড শটে প্রতিপক্ষের গোলরক্ষককে কঠিন পরীক্ষায় ফেলে দেওয়ার ক্ষমতা যে মেসির কতটা, তা এবারের বিশ্বকাপে করা ৮ গোলের অন্তত চারটিতে সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। চোখের পলকে কখনো প্লেস করে, আবার কোনো সময় প্রচণ্ড শট বা ভলি (কালকের গোলটি ছিল দারুণ এক ফুল ভলি থেকে), পাশাপাশি ‘সেট পিস’ তথা স্পট কিক বা ডেড বলেও মেসির কার্যকারিতা যে কারও চেয়ে বেশি।

একটি কর্নার, দূরহ কোণ থেকে নেওয়া ডিরেক্ট ও ইনডাইরেক্ট ফ্রি-কিক থেকেও গোলের সুযোগ, সম্ভাবনা তৈরিতে মেসি মাস্টার। বাতাসে ভাসানো সেই সেট পিসগুলো যখন পোস্টে থাকে, তাতে পাওয়ার আর প্লেসমেন্ট বেশি থাকে। আর যখন মেসি কর্নার ও ফ্রি-কিক থেকে গোলমুখে বল ফেলেন, সেটা হয় অনেক নরম।

এমনভাবে বাতাসে ভেসে নিজ দলের ফরোয়ার্ডদের মাথায় কিংবা পায়ে পড়ে, যা নিয়ন্ত্রণে আনতে বা হেড করতে সমস্যা হয় না। পাশাপাশি দলের প্রয়োজনে গোল করার ক্ষেত্রেও মেসি অনেক বেশি দক্ষ। কার্যকর। গোলক্ষুধা, গোলের তীব্র বাসনা এবং গোল করার দক্ষতা বাকিদের চেয়ে অনেক বেশি বলেই বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ২১ গোলের মালিক মেসি।

কেউ কেউ আর্জেন্টিনাকে মেসিনির্ভর দল, ‘ওয়ানম্যান শো’ বা ‘ওয়ানম্যান আর্মি’ বলেছেন। কিন্তু সময়ের প্রবাহে সে ধারণাও ভুল প্রমাণ হচ্ছে। হ্যাঁ, প্রতি ম্যাচে গোল করা মেসির একার গোল যদিও ৮টি; কিন্তু গোল করায় জিওভান্নি লো সেলসো, লাউতারো মার্টিনেজ, লিসান্দ্রো মার্টিনেজ, ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো আর এনজো ফার্নান্দেজরাও প্রয়োজনের সময় গোল করে দলের সাফল্যে কার্যকর ভূমিকা রাখছেন। শেষ কথা হলো, আর্জেন্টিনার আক্রমণের ধার, গতি ও তীব্রতা অনেক বেশি।

সব মিলিয়ে আর্জেন্টিনার গতি, ছন্দ আর প্রাণবন্ত ফুটবলের সামনে পেরে ওঠাও কঠিন। তাই প্রতিপক্ষ দলের মাঝমাঠ খেলার নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে। ডিফেন্স ‘ছ্যাড়া-বেড়া’, লণ্ডভণ্ড হয়ে পড়ছে এবং ওই সময়ই ভুল করে খেলার নিয়ন্ত্রণ হারানোর পাশাপাশি গোল হজম করছে। একই ঘটনা নেক ভার্দের সঙ্গে ঘটেছে।

গতকাল মঙ্গলবার মিশরও তাই করেছে। রেফারিং, ভিএআর নিয়ে যত বিতর্কই থাকুক না কেন, ২-০ গোলে এগিয়ে গিয়েও মিশর পারেনি জয় নিয়ে মাঠ ছাড়তে। শুধু ফরাসি রেফারি আর্জেন্টিনার পক্ষে বাঁশি বাজিয়েছেন, তাদের ন্যায্য গোল বাতিল করেছেন, আর্জেন্টিনার জয়সূচক গোলের আগে পেনাল্টি দেননি- এসব অভিযোগের পাশাপাশি ভিএআরে আর্জেন্টাইনরা ফেভার পেয়েছে, এই অভিযোগের পাশাপাশি মিশর যে ২ গোলে এগিয়ে থেকেও শেষ ১৫ মিনিট লিড ধরে রাখতে পারেনি, সে কথাও ভেবে দেখা দরকার।

যার পায়ে বল গেলে যে কোনো মুহূর্তে বিপদ ঘটতে পারে, যিনি এক মুহূর্তে যে কোনো ঘটনা ঘটিয়ে ফেলতে পারেন, সেই বিপজ্জনক প্লেয়ার মেসিকে ‘বোতলবন্দি’ করতে না পারা, মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া না করা- এসব কাজ কি ঠিকমতো করতে পেরেছে কেপ ভার্দে আর মিশর?

একটু খুঁটিয়ে দেখুন, উত্তর আসবে, না, পারেনি। ভাইটাল সময়ে নিজেরা সঠিক কাজ করার বদলে এলোমেলো ও আবেগতাড়িত ফুটবল খেলতে গিয়ে বিপদ ডেকে এনেছে। এবং সেই করা ভুলের চড়া মাশুল গুনে এগিয়ে থেকেও শেষ রক্ষা করতে পারেনি মিশর ও কেপ ভার্দে। কোনো না কোনো ভুল করছে। এবং তাদের রক্ষণদুর্গও ভেঙে পড়ছে। তাই তো পেনাল্টি মিস করে ২ গোলে পিছিয়ে পড়েও শেষ পর্যন্ত ৩-২ গোলের ঐতিহাসিক জয় নিয়ে মাঠ ছেড়ে আর্জেন্টিনা সেরা আটে।

এআরবি/আইএইচএস/