বোস্টনে গতকাল রাতে কিলিয়ান এমবাপ্পের পেনাল্টি মিস কি ফ্রান্সের সমর্থকেরা মনে রাখবেন? সম্ভবত না।

মরক্কোকে ২-০ গোলে হারিয়ে ফ্রান্সের সেমিফাইনালে ওঠার আনন্দে সেটা ঢাকা পড়ার কথা। কিন্তু ইতিহাস তো কিছুই ভোলে না। ইতিহাস বলছে, বিশ্বকাপে ফ্রান্সের খেলোয়াড়ের পেনাল্টি মিস বিরল ব্যাপার। এমন কিছু বিশ্বকাপে দেখা গেল মাত্র দুবার। ২০১৪ বিশ্বকাপে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে করিম বেনজেমার পর এমবাপ্পে মিস করলেন পেনাল্টি।

এমবাপ্পের পেনাল্টি মিসে একবার ফিরে তাকানো যাক। শট নেওয়ার মাঝপথে মরক্কো গোলকিপার ইয়াসিন বুনুর দিকে তাকিয়ে একটু থেমে গিয়েছিলেন ফরাসি তারকা। বুনু সহজেই তাঁর বাঁ দিকে ঝাঁপিয়ে দুর্বল শটটি ঠেকান। তবে এমবাপ্পে যেভাবে শটটি নিয়েছেন, সেটা কিন্তু বেশ পরিচিত ও সফল কৌশল। নেইমার ওভাবে পেনাল্টি নিয়ে অনেকবারই সফল হয়েছেন। অনেকের কাছে গোলকিপারকে ফাঁকি দিতে পেনাল্টি শট নিতে দৌড় দিয়ে একটু থেমে যাওয়াটা ফুটবলের আধুনিক কৌশল।

কিন্তু এই প্রশ্নও উঠছে, পেনাল্টি শট নিতে দৌড় দিয়ে থেমে যাওয়ার এই কৌশল থেকে সরে আসার সময়টা কি এখন?

❌ - MBAPPE PENALTY IS SAVED! pic.twitter.com/gb3Q7GB3t6

— Low Res Replay (@lowresreplay) July 9, 2026

ফিফার নিয়ম অনুযায়ী, বল কিক করার ঠিক আগমুহূর্ত ছাড়া দৌড়ানোর যেকোনো পর্যায়ে খেলোয়াড়েরা গতি কমাতে বা ছক পরিবর্তন করতে পারবেন। অতীতে জন অলড্রিজ, হুগো সানচেজ কিংবা পেলে পেনাল্টিতে বাড়তি সুবিধা পেতে এই কৌশলের আশ্রয় নিয়েছেন। তবে গোলরক্ষক যদি আগেভাগেই কোনো একদিকে ঝাঁপিয়ে না পড়ে নিজের জায়গায় অনড় থাকেন, তবে এই কৌশল চরমভাবে বুমেরাং হতে পারে।

চলতি বিশ্বকাপে পেনাল্টি নেওয়ার সময় এভাবে গতি কমিয়ে এমবাপ্পে একাই মিস করেননি। তাঁর সঙ্গী হয়েছেন ব্রুনো গিমারাইস, জর্গেন স্ট্র্যান্ড লারসেন, লিওনেল মেসি ও হ্যারি কেইন। অবশ্য কেইন ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে আবার পেনাল্টি শট নেওয়ার সুযোগ পেয়ে দ্বিতীয়বার থমকে না গিয়ে সাধারণভাবে নেওয়া শটে গোল করেন।

বিবিসি জানিয়েছে, এবার বিশ্বকাপে টাইব্রেকারসহ মোট ২৬টি পেনাল্টি নেওয়া হয়েছে এই থমকে যাওয়া কৌশলে। এর মধ্যে ১১টি থেকেই গোল আসেনি। অর্থাৎ এই কৌশলে গোল পাওয়ার হার মাত্র ৫৭ শতাংশ।

দৌড়ের সময় একটু থমকে গিয়ে পেনাল্টি থেকে গোল করায় বেশ দক্ষ নেইমার

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম আইটিভিকে আর্সেনাল কিংবদন্তি ইয়ান রাইট এ নিয়ে বলেন, ‘মনে হচ্ছে থমকে যাওয়ার কৌশল গোলরক্ষকেরা ধরে ফেলেছেন। তাঁরা এ ধরনের শটের গতিপ্রকৃতি বেশ ভালোভাবেই বুঝে গেছেন।’

পাল্টা যুক্তি হতে পারে, মার্কো আরনাউতোভিচ, নেইমার, এমবাপ্পে, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, কাই হাভার্টজ তো একই কৌশলে এবার পেনাল্টি থেকে গোল পেয়েছেন।

কিন্তু পরিসংখ্যান জানাচ্ছে, থমকে না গিয়ে সাধারণ গতিতে দৌড়ে নেওয়া ৩৫ পেনাল্টির মধ্যে গোল হয়েছে ২৪টিতে। অর্থাৎ স্বাভাবিক কৌশলে সফলতার হার ৬৮ শতাংশ।

তবে সব মিলিয়ে এবার বিশ্বকাপে পেনাল্টি থেকে গোলে সফলতার হার মোটেই সন্তোষজনক নয়। এবারের বিশ্বকাপে টাইব্রেকার বাদে পেনাল্টি মিসের হার ৩০ শতাংশ। ১৯৬৬ সালে পেনাল্টির পরিসংখ্যান রাখা শুরু হওয়ার পর থেকে যেকোনো বিশ্বকাপে এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মিসের রেকর্ড। যদি টাইব্রেকারকেও এই হিসাবে যোগ করা হয়, তবে মিসের হার বেড়ে দাঁড়ায় ৩৫ শতাংশে। ১৯৬৬ সালের পর যেকোনো বিশ্বকাপ ইতিহাসে এটি সর্বোচ্চ পেনাল্টি মিসের রেকর্ড।

ফ্রান্সের হয়ে এটি এমবাপ্পের দ্বিতীয় পেনাল্টি মিস। জাতীয় দলে ১৬টি পেনাল্টির ১৪টিতেই গোল করেছেন। ক্লাব ফুটবলে সাফল্যের হার কিছুটা কম—৬২টি পেনাল্টিতে ৫০ গোল।

মরক্কো গোলকিপার ইয়াসিন বুনু

অবশ্য গতকাল রাতে এমবাপ্পের পেনাল্টি শটের সামনে ছিলেন খুব কঠিন এক প্রতিপক্ষ। মরক্কো গোলকিপার বুনু এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপে টাইব্রেকারসহ ৯টি পেনাল্টির মুখোমুখি হয়ে দুটিতে গোল হজম করেছেন। বাকি ৭টির মধ্যে ৪টি সেভ, ২টি পোস্টে লেগেছে এবং অন্যটি পোস্টের বাইরে ছিল। টাইব্রেকারসহ বিবেচনা করলে বিশ্বকাপে বুনু এখন যৌথভাবে সর্বোচ্চ পেনাল্টি সেভ করা গোলকিপার। এর আগে তাঁর সমান ৪টি সেভ করেছেন জার্মানি টনি শুমাখার, আর্জেন্টিনার গয়কোচিয়া, স্পেনের ক্যাসিয়াস ও ক্রোয়েশিয়ার লিভাকোভিচ।

চুক্তি ছিঁড়ে ফেলে বলতাম, গোল্লায় যান—আনচেলত্তির ওপর ক্ষোভ উগরে দিলেন রোমারিও

মরক্কোর বিপক্ষে পেনাল্টি নেওয়ার আগে এমবাপ্পেকে যে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে, সেটিও সম্ভবত তাঁর বিপক্ষে গেছে। ভিএআরের হস্তক্ষেপের কারণে পেনাল্টির বাঁশি বাজা থেকে প্রায় ৩ মিনিট ১২ সেকেন্ড পর শটটি নেন এমবাপ্পে।

আয়ারল্যান্ডের সাবেক মিডফিল্ডার রয় কিন এ নিয়ে আইটিভিকে বলেন, ‘৩ মিনিটের বেশি সময় ধরে অপেক্ষা করতে বাধ্য করানোটা অন্যায়। এমন মুহূর্তে সময় হলো স্ট্রাইকারদের প্রধান শত্রু। দীর্ঘ অপেক্ষার সুবিধা গোলরক্ষক ও পেনাল্টি হজম খাওয়া দলই পায়।’

পেনাল্টি মিস করলেও গোল করেছেন এমবাপ্পে

ম্যাচ শেষে এমবাপ্পের কথাতেও বোঝা যায়, পেনাল্টি শটটি নেওয়ার আগে দীর্ঘ অপেক্ষায় মনঃসংযোগ হারান। শুনুন তাঁর মুখেই, ‘উসমান বলটা আমার দিকে বাড়িয়ে দেয়। এরপর আমি কিক নেওয়ায় মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করছি, ঠিক তখনই রেফারি বললেন, এটা পেনাল্টি নয়...বলটা আবার তুলে নিয়ে মাঠে বসাই। রেফারি ফিরে এসে বললেন, হ্যাঁ, এটা পেনাল্টিই। কিন্তু এরপরই আবার বলেন, একটু দাঁড়াও, দুই মিনিট আগের একটি খেলার মুহূর্ত রিভিউ করতে হবে। শেষ পর্যন্ত আমি মনোযোগ হারিয়ে ফেলি।’

এমবাপ্পের মনের মধ্যে আসলে কী ঘটেছিল, সেটা ব্যাখ্যার চেষ্টা করেছেন ইয়ান রাইট, ‘পেনাল্টি নিতে যত বেশি সময় অপেক্ষা করতে হবে, নিজের নেওয়া সিদ্ধান্ত নিয়ে আপনার মনে তত বেশি সংশয় তৈরি হতে থাকবে।’

এমবাপ্পে–দেম্বেলেদের অবিশ্বাস্য ফ্রান্সকে থামাবে কে