ফুটবল মানেই আনন্দ, উচ্ছ্বাস, গ্যালারিভর্তি দর্শক–সমর্থকের চিৎকার আর পতাকা ওড়ানোর উৎসব। তবে ইতিহাস বলছে—এই সুন্দর খেলাটাই কখনো কখনো রূপ নিয়েছে টান টান রাজনৈতিক উত্তেজনা আর যুদ্ধের প্রতীক হয়ে। আবার কখনো এই ফুটবলই যুদ্ধ থামিয়ে এনে দিয়েছে শান্তির পথ।

১১ জুন বিশ্বকাপ ফুটবল শুরু হতে যাচ্ছে। ঠিক এমন সময়েই ইরানের ওপর আক্রমণ চালিয়েছে আমেরিকা ও ইসরায়েল। পাল্টা লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে তেহরান। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যখন যুদ্ধের ছায়া ঘন হয়ে উঠছে, তখন তোমরাই বলো, খেলা কি সত্যিই রাজনীতির বাইরে থাকতে পারে?

না, পারে না। অন্তত ইতিহাস তা–ই বলছে। ১৯৬৯ সালে হন্ডুরাস ও এল সালভাদরের মধ্যে ম্যাচ ঘিরে শুরু হওয়া উত্তেজনা পরিণত হয়েছিল ভয়াবহ সংঘাতে। মাঠের খেলা তখন আর শুধু খেলা ছিল না, হয়ে উঠেছিল দেশ, সম্মান আর আবেগের যুদ্ধ। ইতিহাসে এই ম্যাচ ‘ফুটবল যুদ্ধ’ নামে পরিচিত। তবে ইতিহাসে খেলার জন্য যুদ্ধ থামার উদাহরণও আছে।

সান্তোসের জার্সিতে পেলে নাইজেরিয়ার বিপক্ষে খেলেছিলেন ১৯৬৯ সালে।

ফুটবল ম্যাচের জেরে দুই দেশের যুদ্ধ

১৯৬৯ সালের ঘটনা। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ম্যাচে মুখোমুখি হওয়ার কথা ছিল দুই প্রতিবেশী দেশ—হন্ডুরাস ও এল সালভাদরের। ফুটবল মাঠে নামার আগেই দুই দেশের সম্পর্ক ছিল বেশ টান টান। কারণ, তাদের ঝামেলা শুধু খেলা নিয়ে ছিল না—ছিল অভিবাসন, জমির বণ্টন আর রাজনৈতিক চাপ ঘিরে।

এল সালভাদরের চেয়ে ভৌগোলিকভাবে হন্ডুরাস প্রায় পাঁচ গুণ বড় ছিল। কিন্তু জনসংখ্যার হিসাবে আবার উল্টো চিত্র। এল সালভাদরে মানুষ ছিল বেশি, হন্ডুরাসে তুলনামূলক কম। ফলে জমির সংকটে বহু সালভাদোরিয়ান জীবন-জীবিকার খোঁজে বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই হন্ডুরাসে পাড়ি জমান। এতে ১৯৬৯ সালের মধ্যেই দেখা গেল, প্রায় তিন লাখ সালভাদোরিয়ান সেখানে বসতি গড়ে তুলেছে।

এই পরিস্থিতি আরও জটিল হয় ১৯৬০–এর দশকে হন্ডুরাসের ভূমি সংস্কার কর্মসূচিকে ঘিরে। সেই সংস্কারের অংশ হিসেবে পাঁচ বছরের মধ্যেই হাজারো সালভাদোরিয়ান অভিবাসীকে দেশে ফেরত পাঠায় হন্ডুরাস। আর তাদের দখলে থাকা জমি বণ্টন করে দেয় হন্ডুরানদের মধ্যে। এতে দুই দেশের মানুষের মধ্যে ক্ষোভ জমতে থাকে, আর সম্পর্ক ক্রমেই খারাপের দিকে যায়।

এমন উত্তেজনার মধ্যেই শুরু হয় ১৯৭০ বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব। ১৯৬৯ সালের ৮ জুন হন্ডুরাসের রাজধানী তেগুচিগালপায় প্রথম ম্যাচে হন্ডুরাস ১–০ গোলে জেতে। মাঠে দুই দলের সমর্থকদের মধ্যে ছোটখাটো সংঘর্ষও হয়, কিন্তু তখনো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ছিল।

বিশ্বকাপের ২৭ শতাংশ কোচ কেন দায়িত্ব ছেড়েছেন
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় বড়দিনে শত্রুপক্ষের সৈন্যরা সাময়িকভাবে যুদ্ধ থামিয়ে বেলজিয়ামের যে মাঠে একসঙ্গে ফুটবল খেলেছিলেন, সেই ঐতিহাসিক জায়গাটি এখন একটি কাঠের ক্রস দিয়ে স্মরণ করা হয়।

এর এক সপ্তাহ পর সান সালভাদরে দ্বিতীয় ম্যাচে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। ১৯৭৮ সালে পোলিশ সাংবাদিক রিজার্ড কাপুসিনস্কির লেখা বই ওনজা ফুতবলোয়া (ফুটবলযুদ্ধ) থেকে জানা গেছে, ম্যাচের আগের রাতেই হন্ডুরাস দলের হোটেলের বাইরে শব্দ, হইচই, পচা ডিমসহ নোংরা জিনিস ছুড়ে মেরেছিলেন সালভাদর–সমর্থকেরা—সব মিলিয়ে খেলোয়াড়েরা প্রায় ঘুমাতেই পারেননি। ম্যাচের দিন গ্যালারিতে ছিল চরম উত্তেজনা, অপমানজনক স্লোগান আর মাঠে হন্ডুরান খেলোয়াড়দের ওপর ইচ্ছাকৃতভাবে ফাউলের পর ফাউল। শেষ পর্যন্ত সালভাদর ৩–০ গোলে জেতে।

পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয়ে যায় যে হন্ডুরাস কোচ মারিও গ্রিফিন পরে বলেন, ‘খেলার চেয়েও বেঁচে ফিরতে পারবে কি না, সেই চিন্তায় ছিল খেলোয়াড়েরা। আমরা অনেক বেশি ভাগ্যবান যে ম্যাচে হেরেছি।’

এর ১২ দিন পর, ২৭ জুন, দুই দল মেক্সিকো সিটিতে মুখোমুখি হয় প্লে-অফে। প্রতিবেশী দেশ দুটির মধ্যে উত্তেজনা এতটাই চরমে পৌঁছেছিল যে ম্যাচের দিনই এল সালভাদরের সঙ্গে সব ধরনের কূটনৈতিক সম্পর্ক বাতিল করে হন্ডুরাস। ম্যাচেও ছিল উত্তেজনা। অতিরিক্ত সময়ে গড়ানো সেই ম্যাচে ৩-২ গোলে জেতে এল সালভাদর। এরপর কনক্যাকাফ অঞ্চলের ফাইনাল প্লে-অফে হাইতিকেও হারিয়ে ১৯৭০ বিশ্বকাপের টিকিট পায় (বিশ্বকাপে অবশ্য গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচেই হেরে বিদায় নেয় সালভাদর, একটিও গোল করতে পারেনি)।

কিন্তু ফুটবলের এই উত্তেজনা ধীরে ধীরে রাজনৈতিক সংঘাতে রূপ নেয়। ম্যাচের মাত্র ১৬ দিন পর, ১৯৬৯ সালের ১৪ জুলাই হন্ডুরাস আক্রমণ করে এল সালভাদর। দুই দেশের মধ্যে শুরু হয় সশস্ত্র যুদ্ধ। ছয় দিন ধরে চলা এই যুদ্ধে প্রাণ হারায় প্রায় দুই হাজার মানুষ, আর বাস্তুচ্যুত হয় লাখো মানুষ। পরে আন্তর্জাতিক চাপ ও মধ্যস্থতায় যুদ্ধ থেমে যায়, কিন্তু দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক হতে লেগে যায় ১১ বছর।

ফুটবল আসলে এই যুদ্ধের কারণ ছিল না। তবে ফুটবল ম্যাচকে ঘিরেই দুই দেশের উত্তেজনার পারদ চড়েছিল উঁচুতে। শুরু হয়েছিল রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ।

বিশ্বকাপে খেলোয়াড়দের সঙ্গে মাঠে নামা শিশুরা কীভাবে নির্বাচিত হয়
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অনানুষ্ঠানিক বিরতি চলাকালে নো ম্যানস ল্যান্ডে একসঙ্গে ব্রিটিশ ও জার্মান সৈন্যরা। ২৫ ডিসেম্বর ১৯১৪।

এক লাথিতেই যুদ্ধ শুরু

ফুটবলযুদ্ধের গল্প এখানেই শেষ নয়। কখনো কখনো ফুটবল মাঠ হয়ে উঠেছে স্বাধীনতার প্রতীকও। ফুটবল আর রাজনীতি—এই দুই জগৎ একসঙ্গে মিশে গেলে যে ইতিহাস কখনো কখনো জটিল, কখনো ভয়াবহ, আবার কখনো বিতর্কিত হয়ে ওঠে, জভোনিমির বোবান সেই ইতিহাসেরই এক আলোচিত নাম। ক্রোয়েশিয়ার সাবেক এই মিডফিল্ডারকে অনেকে মনে রাখেন তাঁর ফুটবল–দক্ষতার জন্য, আবার অনেকে মনে রাখেন রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল ঘটনার কারণে।

সে সময় যুগোস্লাভিয়া ছিল বহু জাতিগোষ্ঠীর একটি রাষ্ট্র। রাষ্ট্রটি দীর্ঘদিন এক নেতা মার্শাল টিটোর শাসনে ছিল। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে বিভাজন ও রাজনৈতিক সংঘাত বাড়তে থাকে। স্টেডিয়ামগুলোও তখন হয়ে ওঠে রাজনৈতিক মতপ্রকাশের জায়গা।

ক্রোয়েশিয়া, যুগোস্লাভিয়ার বাইরে বেরিয়ে স্বাধীন দেশ হিসেবে প্রথম ম্যাচ খেলে যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে ১৯৯০ সালে। ফিফা এই ম্যাচকে অনুমোদন দেয়নি, তবু এটিই তাদের ইতিহাসের প্রথম ম্যাচ। কাগজে-কলমে সার্ব নিয়ন্ত্রিত যুগোস্লাভিয়ার বিপক্ষে ক্রোয়েশিয়ায় স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরু হয়েছিল ১৯৯১ সালের ৩১ মার্চ। কিন্তু ক্রোয়েশিয়ার আসল স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরু হয়েছিল ১৯৯০ সালের ১৩ মে।

তখন যুগোস্লাভিয়াজুড়ে চলছে ভাঙনের আন্দোলন। একেকটি জাতিগোষ্ঠী নিজেদের আলাদা রাষ্ট্র গড়ার স্বপ্নে উত্তাল। সেই রাজনৈতিক উত্তেজনার ছায়া এসে পড়ে ফুটবল মাঠেও। ক্রোয়েশিয়ার সবচেয়ে বড় ফুটবল দল দিনামো জাগরেব, আর অখণ্ড যুগোস্লাভিয়ার রাজধানী বেলগ্রেডের শক্তিশালী দল রেড স্টার বেলগ্রেড হয়ে ওঠে সেই উত্তেজনার প্রতীক। দুই দলের উগ্র সমর্থকেরা তখন শুধু খেলায় সীমাবদ্ধ ছিল না; মাঠের লড়াই তাদের কাছে পরিণত হয় রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের জায়গায়।

এ পরিস্থিতির মধ্যেই ১৯৯০ সালের ১৩ মে যুগোস্লাভিয়ার লিগে মুখোমুখি হয় দিনামো জাগরেব ও রেড স্টার বেলগ্রেড। সাধারণ একটি ম্যাচ ধীরে ধীরে রূপ নেয় ভয়াবহ সংঘর্ষের আশঙ্কায় ঘেরা এক উত্তপ্ত ঘটনায়।

ম্যাচ শুরুর ১০ মিনিটের মাথায় রেফারির ভুল সিদ্ধান্তে ফুঁসে ওঠেন দিনামো জাগরেবের সমর্থকেরা। ম্যাচ তখন আর শুধু খেলা নেই—পুরো স্টেডিয়াম যেন রণক্ষেত্র। দুই দলের সমর্থকদের লড়াই নেমে এল মাঠে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ নামানো হয়, কিন্তু তাতেও দাঙ্গা থামে না। একপর্যায়ে পুলিশ একজন ডায়নামো জাগরেব সমর্থককে আটক করে। এই ঘটনা চোখে পড়ে তখনকার যুগোস্লাভিয়ার তারকা ফুটবলার জভোনিমির বোবানের। রাগ আর প্রতিবাদে তিনি হঠাৎ ওই পুলিশ কর্মকর্তার মুখ বরাবর লাথি মারেন। সেই মুহূর্তেই সুযোগ পেয়ে আটক হওয়া সমর্থক পালিয়ে যান। ওই সময় থেকে সেই লাথি হয়ে দাঁড়ায় স্বাধীনতার প্রথম সোপান, ‘বোবানের লাথি’। এ যুদ্ধ প্রভাব ফেলেছে সেই সময়ের খেলোয়াড়দের ওপর, বাদ যায়নি পরবর্তী প্রজন্মও।

মিসরের গোলটি বাতিল হলো কেন, ফুটবলের রুলবুক কী বলছে

বোবানের সেই ঘটনার পর দাঙ্গা আরও ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে এটিকে আসন্ন যুদ্ধের ইঙ্গিত হিসেবে দেখেন। পরে এই উত্তেজনা থেকেই শুরু হয় ক্রোয়েশিয়ার স্বাধীনতাযুদ্ধ। সে সময় ফুটবল সমর্থক গোষ্ঠীগুলোও রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে। কিছু সমর্থক পরে সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

এই ঘটনার কারণে বোবানকে যুগোস্লাভ জাতীয় দল থেকে নিষিদ্ধ করা হয় এবং ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ হারান। পরে তাঁকে এসি মিলান কিনে নেয়। কিন্তু বোবানের এক লাথি যেন ক্রোয়েটকে স্বপ্ন দেখিয়েছিল—যুগোস্লাভিয়ায় আর নয়। এর এক বছর পর থেকে স্বাধীনতার স্বাদ পায় ক্রোয়েশিয়া।

২০১১ সালে সিএনএন ওই ফুটবল ম্যাচটিকে ‘বিশ্ব পরিবর্তনকারী পাঁচটি ফুটবল ম্যাচ’-এর একটি হিসেবে চিহ্নিত করে। বোবান পরবর্তী সময়ে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, এটি কোনো সাধারণ ফুটবল সহিংসতা ছিল না; বরং এটি ছিল একনায়কতান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার লড়াই। আর সেই লড়াইয়ে তাঁরা জিতেছিলেন।

হন্ডুরাস ও এল সালভাদর দুই দেশই যুদ্ধ বিমান ব্যবহার করেছিল।

ফুটবল থামাল গৃহযুদ্ধ

এবার বলা যাক ফুটবলে যুদ্ধ শেষের কথা। পশ্চিম আফ্রিকার দেশ আইভরিকোস্ট তখন গৃহযুদ্ধে জর্জর। ২০০২ সালে শুরু হওয়া গৃহযুদ্ধে অনেক রক্ত ঝরলেও তা থামার নাম নেই। গৃহযুদ্ধ দেশটিকে দুই ভাগে ভাগ করে ফেলেছে। প্রেসিডেন্ট লঁরা গাগবোর সরকার নিয়ন্ত্রণ করছে দেশটির দক্ষিণ অংশ আর বিদ্রোহীদের দখলে রয়েছে দেশটির উত্তর অংশ। কোনো পক্ষই কাউকে ছাড় দিতে নারাজ। হত্যা আর অরাজকতায় পুরো দেশ ছিন্নভিন্ন হয়ে আছে।

উভয় পক্ষের প্রায় ৬০০ সেনা ও প্রায় ১ হাজার ৫০০ সাধারণ মানুষের মৃত্যুর শোক নিয়ে তারা তখন এক ‘মহান নেতা’র আগমনের প্রতীক্ষায়। এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেই ২০০৫ সালের অক্টোবরে আফ্রিকার প্রতিনিধি হিসেবে ২০০৬ জার্মানি বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে আইভরিকোস্ট।

আইভরিকোস্ট যদি সুদানকে পরাজিত করতে পারে, তবে প্রথমবারের মতো সরাসরি বিশ্বকাপে যাবে। তবে হিসাব অন্য জায়গায় কিছু বাকিও ছিল। ক্যামেরুনকে হারতে বা ড্র করতে হবে মিসরের সঙ্গে। এ রকম এক সমীকরণ নিয়ে ২০০৫ সালের ৮ অক্টোবর ম্যাচ খেলতে সুদানে গিয়েছিল আইভরি কোস্ট। ওই ম্যাচেই মাঠে এলেন আইভরিকোস্টের প্রতীক্ষিত সেই ‘মহান নেতা’। পরনে কমলা রঙের জার্সির নম্বর ১১। তাঁর নাম দিদিয়ের দ্রগবা।

ক্যামেরুনের ম্যাচটি হচ্ছিল নিজ দেশের রাজধানী ইয়ন্ডি আর আইভরিকোস্টের ম্যাচটি হচ্ছিল সুদানের ওম্বারডানে। দ্রগবাদের দল হেসেখেলেই সুদানকে পরাজিত করল। ৩–১ গোলে ম্যাচ শেষ হওয়ার পর আইভরিয়ানরা তাকিয়ে ছিল ক্যামেরুনের ম্যাচের দিকে। ক্যামেরুন ২০ মিনিটে ১-০ গোলে এগিয়ে যায়। তবে ৭৯ মিনিটে ম্যাচে সমতায় ফেরে মিসর। ম্যাচের অতিরিক্ত সময়ের ৪ মিনিটে পেনাল্টি পায় ক্যামেরুন। কিন্তু পেনাল্টি স্পট থেকে গোল করতে ব্যর্থ হন ক্যামেরুনের ফুটবলার পিয়েরি ওহ। পিয়েরির পেনাল্টি মিসে কপাল খুলে যায় আইভরিকোস্টের। প্রথমবারের মতো বিশ্বের সবচেয়ে বড় আসর বিশ্বকাপ ফুটবলে যাওয়ার টিকিট পেয়ে যান দ্রগবারা।

আইরিশ ব্যাংকার থেকে যেভাবে কেপ ভার্দের বিশ্বকাপ দলে ছিলেন পিকো
বেলজিয়ামের ওয়েস্ট ফ্ল্যান্ডার্স এলাকায় প্লোয়েগস্ট্রিট উডের কাছে যুদ্ধের বিরতিতে দুই পক্ষের ফুটবল খেলার ঘটনার স্মরণে ‘ক্রিসমাস ট্রুস’ নামে ভাস্কর্য নির্মাণ করা হয়।

২০০৬ বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করার দিনই স্টেডিয়ামের সাজঘরে জাতীয় দলের প্রত্যেক খেলোয়াড়কে পাশে নিয়ে মাইক্রোফোনে দ্রগবা দেশবাসীর উদ্দেশে এক আবেগঘন বক্তৃতা দেন। তিনি বলেন, ‘আইভরিয়ানরা, উত্তর থেকে দক্ষিণ, পূর্ব থেকে পশ্চিম—আজ আমরা প্রমাণ করেছি, আমরা একসঙ্গে থাকতে পারি। আজকের এই জয় আমাদের ঐক্যের প্রমাণ। আমরা প্রতিজ্ঞা করছি, এই উদ্‌যাপন আমাদের আরও একত্র করবে। আমরা হাঁটু গেড়ে আপনাদের অনুরোধ করছি, আফ্রিকার একটি দেশ, যেখানে অনেক ধনী-গরিব বসবাস করে, সেটা যুদ্ধের কারণে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে না। দয়া করে আপনাদের অস্ত্র সমর্পণ করুন এবং নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দিন। আমরা আনন্দ চাই, তাই অস্ত্র ছেড়ে দিন।’

এই ঘোষণার পর দ্রগবা তাঁর সতীর্থ কালুতোরে, ইমানুয়ের আবুয়ে ও দিদিয়ে জোকরার কাঁধে কাঁধ রেখে আনন্দে নাচা শুরু করেন।

এই বক্তব্য মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে পুরো দেশে। টেলিভিশন ও রেডিওতে বারবার প্রচারিত হতে থাকে সেই ভাষণ। ধীরে ধীরে সরকার ও বিদ্রোহীদের মধ্যে আলোচনার পরিবেশ তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত তারা যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয় এবং আলোচনার পথ তৈরি হয়। কোনো সহিংসতা ছাড়াই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

পরের বছর আবার গৃহযুদ্ধের পূর্বাভাস দেখা গেলে আফ্রিকান নেশনস কাপে মাদাগাস্কারের বিপক্ষে একটি ম্যাচ বাওয়াকুতে খেলার অনুমতি নিয়েছিলেন দ্রগবা। বাওয়াকু ছিল বিদ্রোহী বাহিনীর মূল ঘাঁটি। আবিদজান থেকে ৩০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বাওয়াকুতে আয়োজিত মাদাগাস্কারের ওই ম্যাচই ছিল আইভরিকোস্টের গৃহযুদ্ধ থামিয়ে দেওয়ার মূলমঞ্চ। সেদিন বিবাদমান দুই পক্ষের নেতারাই পাশাপাশি বসে উপভোগ করেছিলেন মাদাগাস্কারের বিপক্ষে ম্যাচ। সরকারি পুলিশ বাহিনী ও সেনারা দায়িত্ব পালন করেছিল বাওয়াকু স্টেডিয়ামের শান্তিশৃঙ্খলা বিধানে।

ওই ম্যাচে দলটি ৫-০ গোলে পরাজিত করে মাদাগাস্কারকে। আইভরিকোস্টের হয়ে পঞ্চম গোলটি করেন দ্রগবা। ম্যাচ শেষে দ্রগবার আহ্বানে সাড়া দিয়ে বাকি বিদ্রোহীরাও অস্ত্র সমর্পণ করে। এভাবেই ফুটবল রক্ষা করেছিল একটি দেশ, একটি জাতিকে।

দিনামো জাগরেব ও রেড স্টার বেলগ্রেডের ম্যাচে মাঠে পুলিশ কর্মকর্তার মুখ বরাবর লাথি মারেন জভোনিমির বোবান। ১৯৯০ সালের ১৩ মে।

যুদ্ধ থামিয়েছিলেন পেলে

ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি পেলের নাম নিশ্চয়ই তোমরা জানো। একবার তাঁর জন্য নাকি আফ্রিকায় যুদ্ধ থেমেছিল! এই ঘটনা সত্য না মিথ্য, লোকে তা নিয়ে এখনো তর্ক করে। তবে পেলে নিজেই এর সত্যতা নিশ্চিত করে গেছেন।

ব্রাজিলের সংবাদমাধ্যম ‘গ্লোবো স্পোর্ত’–এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেটি ১৯৬৯ সালের ঘটনা। আফ্রিকা মহাদেশ সফরে বের হয়েছিল ব্রাজিলের ক্লাব সান্তোস। নাইজেরিয়ায় তখন চলছিল গৃহযুদ্ধ। সে বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি দেশটির মাটিতে অবতরণ করে সান্তোসের খেলোয়াড়দের বহনকারী বিমান। নাইজেরিয়া থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিল দেশটির দক্ষিণ–পূর্বাঞ্চল, যার নাম দেওয়া হয়েছিল ‘বায়াফ্রা’। তাতে নাইজেরিয়ার দুটি জাতিগোষ্ঠী ‘ইগাবো’ ও ‘হাউসা’ রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এই যুদ্ধে মারা গিয়েছিল ২০ লাখের বেশি সাধারণ মানুষ। ঘরছাড়া হয় আরও ৪৫ লাখ।

এই যুদ্ধের মধ্যেই নাইজেরিয়ায় নেমেছিল সান্তোস ফুটবল দল। সান্তোস শর্ত দিয়েছিল, সব রকম নিরাপত্তা নিশ্চিত করলেই শুধু বেনিনে তাদের বিমান অবতরণ করবে। স্থানীয় গভর্নর স্যামুয়েল ওগবেমুদিয়া নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সেদিন সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেন। সান্তোস দল পা রাখার পর বন্দুকের গর্জন থেমে গিয়েছিল। পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টার জন্য যুদ্ধবিরতি রাখে দুই পক্ষ।

নাইজেরিয়ার রাজধানী লাগোস ও বায়াফ্রার মধ্যে বেনিন সিটির স্থানীয় এক দলের মুখোমুখি হয়েছিল সান্তোস। প্রায় ২৫ হাজার দর্শকের সামনে ম্যাচটি ২–১ গোলে জিতেছিল সান্তোস। গোল করেছিলেন তোনিনহো, গুয়েরেইরো ও এদু।

তবে অন্য কিছু সূত্রের দাবি, এই যুদ্ধবিরতি হয়েছিল প্রীতি ম্যাচের দুই সপ্তাহ পর বেনিনে। তখনকার বায়াফ্রা রাষ্ট্রের সীমান্ত অঞ্চলে।

২০২০ সালে পেলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেই এ ঘটনা সম্বন্ধে লিখেছিলেন, ‘১৯৬৯ সালে নাইজেরিয়ায় গৃহযুদ্ধ থামানো আমার ক্যারিয়ারের অন্যতম গর্বের মুহূর্ত। তখন সান্তোস বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সফর করছিল। সেখানে গৃহযুদ্ধের মধ্যেই বেনিন সিটিতে একটি প্রীতি ম্যাচের আয়োজন করা হয়েছিল। সান্তোসকে সবাই এত ভালোবাসত যে ম্যাচের দিন যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়। “সান্তোস যেদিন যুদ্ধ থামিয়েছিল’’—পরে এই ঘটনা এভাবেও বলা যায়।’

সান্তোসে পেলের সঙ্গে খেলা সাবেক ফরোয়ার্ড এদু ‘গাজেত্তা এসপোর্তিভা’য় এক সাক্ষাৎকারেও এ ঘটনা নিয়ে বলেছিলেন, ‘মনে আছে, এক ব্যবসায়ী বলেছিলেন, কিছু দেশ আমাদের যুদ্ধের মধ্যে খেলতে দেখতে চায়। পরে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে যুদ্ধবিরতি হয়।’

আবার ২০০৫ সালে টাইম সাময়িকী এ নিয়ে লিখেছিল,‌ ‘বড় বড় কূটনীতিবিদ দুই বছর চেষ্টা করেও আফ্রিকার ভয়ংকরতম এই রক্তপাত থামাতে পারেননি। কিন্তু ১৯৬৯ সালে নাইজেরিয়ায় ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি পেলে পা রাখার পর তিন দিনের জন্য যুদ্ধ থেমেছিল।’

তবে পেলের দলীয় সতীর্থ গিলমার ও কুতিনহোর ভাষ্য, যুদ্ধবিরতি খুব কম সময় টিকেছিল। সান্তোসের বিমান উড়াল দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আবার যুদ্ধ শুরু হয়। বিমান থেকেই অস্ত্রের গর্জন শুনতে পেয়েছিলেন তাঁরা। সান্তোস কিংবদন্তি লিমার ভাষ্য,‌ ‘যুদ্ধ থামিয়ে দেওয়া আমাদের দাপটের পক্ষে একটি অর্জন। আমরা বলতে পারতাম, চারপাশে তো যুদ্ধ, ওখানে যাব কেন? কিন্তু আমরা তা করিনি। সেখানে যেতে চেয়েছি, খেলাটা বাধ্যতামূলক ছিল না।’

গোলরক্ষকই যখন গোলদাতা

ফুটবল ইন নো ম্যানস ল্যান্ড

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছিল মাত্র পাঁচ মাস আগে। এর মধ্যেই যুদ্ধ ভয়ংকর রূপ নেয়। একদিকে টানা গোলাগুলি, অন্যদিকে হাড়কাঁপানো শীত—দুই পক্ষের সৈন্যরাই তখন ক্লান্ত ও বিধ্বস্ত। যুদ্ধ থামানোর কোনো ঘোষণা ছিল না। তবু ১৯১৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর ঘটে এক অবিশ্বাস্য ঘটনা।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ‘ট্রেঞ্চ ওয়ার’। যুদ্ধক্ষেত্রে দুই পক্ষ নিজেদের অবস্থানের সামনে লম্বা ও গভীর খাত খুঁড়ে রাখত। সেই ট্রেঞ্চে থাকত মেশিনগান, কামান, গোলাবারুদ। সৈন্যরাও সেখান থেকেই যুদ্ধ চালাতেন।

২৪ ডিসেম্বর রাতে ব্রিটিশ সৈন্যরা হঠাৎ জার্মান ট্রেঞ্চ থেকে গান শোনেন। একেকজন সৈন্য নিজের ভাষায় গলা ছেড়ে গাইছিল বড়দিনের গান। সেই গান শুনে কৌতূহলী ব্রিটিশ সৈন্যরা সীমান্তের দিকে এগিয়ে যান। কাছে গিয়ে তাঁরা দেখেন, জার্মান সৈন্যরা ট্রেঞ্চ থেকে বেরিয়ে হাতে লন্ঠন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। ভাঙা ইংরেজিতে তাঁরা বারবার বলছিলেন, ‘তোমরা বেরিয়ে এসো, তোমাদের কোনো ক্ষতি করা হবে না।’

এরপর ‘মেরি ক্রিসমাস’ বলতে বলতে দুই পক্ষের সৈন্যরা ধীরে ধীরে ‘নো ম্যানস ল্যান্ডে’ জড়ো হন। এই জায়গাই ছিল যুদ্ধরত দুই বাহিনীর মাঝের ফাঁকা এলাকা। ব্রিটিশ ও জার্মান বাহিনী বড়দিন উপলক্ষে যুদ্ধে বিরতি নেয়। কিছু সময়ের জন্য যুদ্ধ ভুলে সেখানে তাঁরা একে অপরের সঙ্গে হাত মেলান এবং খাবার ভাগাভাগি করেন।

শুধু তা-ই নয়, ট্রেঞ্চের পাশে পড়ে থাকা মৃতদেহগুলোর শেষকৃত্যও করা হয় যৌথভাবে। শোনা যায়, ফ্রান্সের ফ্রেলিঙ্গিয়েন গ্রামের কাছে কিছু ব্রিটিশ ও জার্মান সৈন্য ফুটবল ম্যাচও খেলেছিলেন। কাদামাখা বুট পরে, যুদ্ধের পোশাক গায়েই তাঁরা হাসিমুখে ফুটবলে লাথি মেরেছিলেন। পরে বেলজিয়ামের ওয়েস্ট ফ্ল্যান্ডার্স এলাকায় প্লোয়েগস্ট্রিট উডের কাছে এ ঘটনার স্মরণে ‘ক্রিসমাস ট্রুস’ নামে একটি ভাস্কর্য নির্মাণ করা হয়। ভাস্কর্যটি এখনো আছে।

১৯১৫ সালের জানুয়ারি থেকে আবার আগের মতো যুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধের সেই ভয়ংকর পরিবেশেও ফুটবলের মাধ্যমে বড়দিনে হঠাৎ নেমে এসেছিল অদ্ভুত শান্তি। গুলি আর কামানের শব্দের মধ্যেও সেই এক রাত ইতিহাসে আলাদা হয়ে আছে। যে রাতে যুদ্ধের ময়দানে মানুষ কিছু সময়ের জন্য মানুষকেই চিনেছিল।

তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, বিবিসি, দিজফুটবলটাইমস ডট কো, সিএনএন, দ্য টেলিগ্রাফ, দ্য ইনডিপেনডেন্ট, গোল ডটকম, ফিফা মিউজিয়াম, ইমপেরিয়াল ওয়ার মিউজিয়াম ডট অর্গ ডট ইউকে।

লুকা মদরিচ: যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে ফুটবলের অর্কেস্ট্রা কন্ডাক্টর