বাংলাদেশ এবং দুর্যোগ, যেন একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের দুর্যোগের ধরন ও এর গভীরতা কেবল প্রাকৃতিক সীমানায় আটকে নেই, তা আমাদের মানবসৃষ্ট অবহেলা ও কাঠামোগত ব্যর্থতার এক নির্মম দলিল হয়ে উঠেছে। কয়েক দিন ধরে দেশের এক বিশাল অংশ একদিকে ভয়াবহ বন্যা, অন্যদিকে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতায় আক্ষরিক অর্থেই নাকাল। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও সমতলের বন্যার পাশাপাশি এবারও আমরা দেখছি পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন পাহাড়ি জেলা এবং বন্দরনগরী চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকার অবরুদ্ধ রূপ। ভৌগোলিক ও নৃ-তাত্ত্বিক বাস্তবতার ঊর্ধ্বে উঠে এই জলাবদ্ধতা আমাদের উন্নয়ন দর্শন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং নাগরিক মূল্যবোধের দেউলিয়াত্বকে নতুন করে কাঠামোর কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে।

সাধারণত বন্যা ও জলাবদ্ধতা নদীমাতৃক নিম্নভূমি বা সমতলের বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং বন্দরনগরী চট্টগ্রাম সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে পর্যাপ্ত উঁচুতে অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও সেখানে যেভাবে বছরের পর বছর কৃত্রিম বন্যা ও জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে, তা দেশের সচেতন মানুষকে গভীরভাবে বিস্মিত করেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি নদী ও ছড়াগুলো (প্রাকৃতিক নালা) একসময় পাহাড়ের ঢল দ্রুত সমুদ্রে নিয়ে যেত। কিন্তু পাহাড় কাটা, বন উজাড় এবং নদীবক্ষে অপরিকল্পিত বর্জ্য ফেলার কারণে আজ কর্ণফুলী, সাঙ্গু, মাতামুহুরী, চেঙ্গি বা মাইনির নাব্য তলানিতে ঠেকেছে।

একই অবস্থা বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামের। জোয়ার-ভাটার সুবিধা থাকা সত্ত্বেও অপরিকল্পিত নগরায়ন, পাহাড় কেটে আবাসন তৈরি এবং প্রাকৃতিক খালগুলো দখল করে বহুতল ভবন নির্মাণের ফলে বৃষ্টির পানি নামার কোনো পথ অবশিষ্ট নেই। পানি নিষ্কাশনের নালাগুলোতে আজ কেবল ময়লা আর প্লাস্টিক বর্জ্যের স্তূপ। ফলে, প্রকৃতির নিজস্ব পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা আজ মানুষের তৈরি প্লাস্টিকের প্রাচীরে রুদ্ধ। পাহাড়ের উচ্চতাও আজ অপরিকল্পিত নগরায়নের রাহুগ্রাস থেকে রক্ষা পাচ্ছে না।

ঢাকায় কক্সবাজারের ‘ফিল’এবং নাগরিক উপহাস:

রাজধানী ঢাকা হয়তো দেশের দূরবর্তী অঞ্চলের মতো চাক্ষুষ প্রলয়ংকরী বন্যার কবলে সরাসরি পড়ে না, কিন্তু সামান্য কয়েক মিলিমিটার বৃষ্টিতেই ঢাকার বিভিন্ন সড়ক যেভাবে প্রমত্তা নদীতে রূপ নেয়, তা নগরবাসীর জন্য এক চীরস্থায়ী অভিশাপ। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও গণমাধ্যমে নাগরিক ক্ষোভের এক অভিনব প্রকাশ দেখা গেছে। জলাবদ্ধতায় আটকে থাকা রাজধানীবাসী ব্যঙ্গাত্মকভাবে বলছেন, তারা ঢাকার রাজপথেই ‘কক্সবাজারের ফিল’ বা সমুদ্রের আবহ পাচ্ছেন! জলাবদ্ধ রাস্তায় নৌকা চালানো, মাছ ধরা বা সাঁতার কাটার ভিডিওগুলো যখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়, তখন তা কেবল কৌতুক সৃষ্টি করে না, বরং দেশের হৃদয়কে এক গভীর লজ্জায় নিমজ্জিত করে।

যে শহরকে একসময় ‘বাহান্ন বাজার তিপ্পান্ন গলির’ সাথে ‘খাল ও ঝিলের শহর’ বলা হতো, সেই ঢাকার প্রায় অর্ধশতাধিকেরও বেশি ঐতিহাসিক খাল আজ বিলুপ্ত বা দখলদারদের কবলে। বক্স কালভার্ট করে খালের টুঁটি চেপে ধরা হয়েছে, আর বাকি নালাগুলো পলিথিন ও গৃহস্থালি বর্জ্যে নিরেট দেয়ালে পরিণত হয়েছে। ফলে আকাশ একটু মেঘলা হলেই ঢাকা হয়ে পড়ে এক অচল ও অবরুদ্ধ জল-কারাগার।

প্রকৃতির প্রতিশোধ বনাম প্রতিবেশী রাষ্ট্রের পানি-কূটনীতি:

বাংলাদেশের বর্তমান সংকটের পেছনে একদিকে রয়েছে স্থানীয় ও বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা, অন্যদিকে রয়েছে প্রতিবেশীর ভূ-রাজনৈতিক পানিনীতি। জলবায়ুর খামখেয়ালিপনায় আমরা দেখছি অতিবৃষ্টি ও অনাবৃষ্টির এক চরম বৈপরীত্য। যখন বৃষ্টির প্রয়োজন নেই, তখন মেঘভাঙা বৃষ্টিতে ভেসে যাচ্ছে মাঠ-ঘাট; আবার যখন চাষাবাদের মৌসুম, তখন নদীগুলো খাঁ খাঁ করছে খরার দাহে। পার্বত্য অঞ্চলসহ দেশের গ্রামীণ এলাকার বনাঞ্চল ধ্বংস, নির্বিচারে গাছ কাটা এবং জলাশয় ভরাট করার ফলে প্রকৃতির ভারসাম্য সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে।

এর ওপর যোগ হয়েছে প্রতিবেশী ভারতের একতরফা ও নোংরা পানি-কূটনীতি। অভিন্ন ৫৪টি নদীর উজানে বাঁধ ও ব্যারেজ দিয়ে শুষ্ক মৌসুমে পানি প্রত্যাহার করে বাংলাদেশকে মরুভূমি বানানো হয়, আর বর্ষাকালে যখন ভারত নিজে বন্যার হুমকিতে পড়ে, তখন কোনো ধরনের পূর্বসতর্কতা ছাড়াই ডুম্বুর বা গজলডোবার মতো বাঁধের গেটগুলো খুলে দিয়ে বাংলাদেশের লাখ লাখ মানুষকে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। এই উজানের ঢল ও আন্তর্জাতিক নদী আইনের লঙ্ঘন আমাদের প্রতি বছর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে ফেলছে। কিন্তু শুধু প্রতিবেশী বা জলবায়ুকে দোষ দিয়ে কি আমরা পার পেতে পারি? ঘরের ভেতরের ক্ষত যদি আমরা নিরাময় না করি, তবে বাইরের আঘাত ঠেকানো অসম্ভব।

দোষারোপের রাজনীতি বনাম নাগরিক উটপাখি নীতি:

বছর বছর এমন দুর্ভোগের মুখোমুখি হওয়ার পরও আমাদের রাষ্ট্র বা সাধারণ জনগণের হুঁশ ফিরছে না। সংকট আসলেই শুরু হয় তীব্র কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি। নাগরিকেরা দোষ দেন সরকার ও সিটি কর্পোরেশনকে; আর রাষ্ট্র বা স্থানীয় প্রশাসন দোষ চাপায় অতিরিক্ত বৃষ্টি কিংবা প্রকৃতির ওপর। কিন্তু নিজেদের ওপর অর্পিত দায়িত্বটি কেউ আমলে নিচ্ছেন না।

আমরা যেন এক উটপাখির জাতিতে পরিণত হয়েছি—ঝড় আসলে বালিতে মাথা গুঁজে ভাবি বিপদ কেটে গেছে। আমরা ঘরের ময়লা ড্রেনে ফেলছি, চিপসের প্যাকেট ও প্লাস্টিকের বোতল নির্দ্বিধায় গাড়ির জানালা দিয়ে রাস্তায় ছুঁড়ে মারছি, আর বৃষ্টি হলে প্রশাসনের চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করছি। এই দ্বিচারিতা ও আত্মঘাতী আচরণ কোনো সভ্য সমাজের পরিচয় হতে পারে না।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বার্তাপকেটই হোক সাময়িক ডাস্টবিন:

নাগরিক দায়িত্বহীনতার এই অন্ধকার বৃত্ত থেকে বের হয়ে আসার এক যুগান্তকারী ও সহজ দিকনির্দেশনা দিয়েছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সম্প্রতি সচেতন মহলে বিপুলভাবে সমাদৃত এক বক্তব্যে তিনি অতি সাধারণ অথচ গভীর জীবনমুখী বার্তা দিয়েছেন। তিনি তার বক্তব্যে জানান— সারা দিনের ব্যবহৃত টিস্যু এই পকেট, ওই পকেটে জমা করেন। বাসায় গিয়ে বা সুবিধাজনক স্থানে সেগুলো ঝুঁড়িতে বা ময়লার বক্সে ফেলেন।

প্রধানমন্ত্রীর এই বার্তাটি কেবল আবর্জনা ফেলার কোনো সাধারণ নিয়ম নয়, এটি আসলে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও আচরণগত সংস্কারের ডাক। আমরা যখন রাষ্ট্র সংস্কারের কথা বলি, তখন ভুলে যাই যে রাষ্ট্রের ক্ষুদ্রতম একক হলো ব্যক্তি নিজে। ব্যক্তি যদি নিজেকে সুশৃঙ্খল না করে, তবে রাষ্ট্রের কোনো বৃহৎ সংস্কারই ফলপ্রসূ হবে না।

আপনার ব্যবহৃত একটি ছোট্ট টিস্যু পেপার, চিপসের প্যাকেট কিংবা প্লাস্টিকের বোতলের ছিপি যখন আপনি যত্রতত্র ফেলে দেন, তখন সেটি বৃষ্টির পানির সাথে ভেসে গিয়ে ড্রেনের মুখ বন্ধ করে দেয়। কোটি মানুষের এই সামান্য অবহেলার পুঞ্জীভূত রূপই হলো আজকের জলাবদ্ধতা। তাই সভ্য জাতি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে হলে ব্যক্তিগত জায়গা থেকে এই ছোট ছোট অভ্যাসগুলোর চর্চা শুরু করা আজ অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।

সংকট উত্তরণে রাষ্ট্র নাগরিকের করণীয়:

একটি আধুনিক, নিরাপদ ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ বিনির্মাণে আমাদের বহুমুখী ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

নাগরিক সচেতনতা আচরণগত পরিবর্তন: প্রত্যেকের ব্যক্তিগত পকেট বা স্কুলব্যাগকে সাময়িক ডাস্টবিন হিসেবে ব্যবহার করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। প্রতিটি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিশেষ সচেতনতা ক্লাস চালুকরণ আবশ্যক।

বর্জ্য নিষ্কাশন ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন: শহরের ড্রেন ও নালাগুলোকে ময়লা ফেলার উন্মুক্ত ভাগাড় বানানো বন্ধ করতে হবে। প্লাস্টিক বর্জ্য পুনর্ব্যবহার (Recycling) নিশ্চিত করতে কঠোর আইন প্রয়োগ ও ড্রেনে ময়লা ফেললে জরিমানার বিধান কার্যকর করা প্রয়োজন।

দখলকৃত জলাশয় খাল পুনরুদ্ধার: ঢাকা, চট্টগ্রামসহ সকল বড় শহরের বেদখল হওয়া খাল, নদী ও জলাশয়গুলো কোনো রাজনৈতিক বা ব্যবসায়িক প্রভাবের তোয়াক্কা না করে পুনরুদ্ধার করে সেগুলোর সীমানা ও নাব্য রক্ষা করতে হবে।

জলবায়ু অভিযোজন প্রকৃতিভিত্তিক সমাধান: পাহাড় কাটা ও বনাঞ্চল উজাড় করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে। পাহাড়ি অঞ্চলে ঢালু জমিতে বিশেষ বৃক্ষরোপণ এবং পানির প্রাকৃতিক প্রবাহকে বাধা না দিয়ে অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে।

আন্তর্জাতিক পানিনীতি সক্রিয় কূটনীতি: আন্তর্জাতিক নদী আইন (যেমন ১৯৯৭ সালের জাতিসংঘ জলপ্রবাহ কনভেনশন) অনুযায়ী অভিন্ন নদীগুলোর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে এবং আকস্মিক বন্যা রোধে প্রতিবেশী দেশের সাথে একটি জবাবদিহিতামূলক ও কার্যকর দ্বিপাক্ষিক পানি বণ্টন চুক্তি সম্পাদন করতে হবে।

পরিশেষে লতে চাই—প্রকৃতিকে অবহেলা করে এবং নিজের নাগরিক দায়িত্বকে অস্বীকার করে কোনো জাতি দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে পারে না। আজ আমাদের চারপাশের বন্যা ও জলাবদ্ধতা আসলে প্রকৃতির এক নীরব সতর্কবার্তা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর টিস্যু পেপার পকেটে রাখার যে আহ্বান, তা আমাদের আত্মশুদ্ধি ও নাগরিক সভ্যতার প্রথম পাঠ। রাষ্ট্রকে দূষণমুক্ত ও অখণ্ড রাখার দায় যেমন সরকারের, তেমনি নিজের চারপাশ পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব প্রতিটি নাগরিকের। দোষারোপের সস্তা সংস্কৃতি পরিহার করে যেদিন আমরা প্রত্যেকে নিজের ঘর, নিজের পকেট এবং নিজের আঙিনা থেকে সচরব, ঠিক সেদিনই আমরা একটি জলমগ্ন ও অবরুদ্ধ দেশের গ্লানি মুছে একটি সুন্দর, সমৃদ্ধ ও আধুনিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সক্ষম হব।

লেখক:

এ এইচ এম ফারুক (A H M Faruk)
সাংবাদিক ও কলামিস্ট। 
[email protected]

এইচআর/জেআইএম