ঢাকা বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ শহর। অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রশাসন ও বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে প্রতিদিন লাখো মানুষ এখানে জীবিকা ও জীবনের প্রয়োজনে ছুটে আসে। সেই রাজধানী ঢাকা এখন আর শুধু মেঘের ডাক শোনে না, মেঘ দেখলেই আঁতকে ওঠে। সামান্য বৃষ্টিতেই এই শহরের অনেক এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যায়। কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টি রাস্তাঘাট, অলিগলি, বাসাবাড়ি, বাজার এমনকি গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো অচল করে দেয়। অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, রোগী, ব্যবসায়ী—সকলের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। ফলে জলাবদ্ধতা এখন আর মৌসুমি দুর্ভোগ নয়; এটি ঢাকার একটি দীর্ঘমেয়াদি নগর-সংকটে পরিণত হয়েছে।
অনেকেই এ সমস্যার জন্য শুধু অতিবৃষ্টি বা জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করেন। আবার কেউ কেউ কেবল ড্রেন পরিষ্কার না হওয়াকে একমাত্র কারণ হিসেবে দেখেন। বাস্তবে জলাবদ্ধতা একটি বহুমাত্রিক সমস্যা, যার পেছনে রয়েছে পরিকল্পনার দুর্বলতা, অব্যবস্থাপনা, পরিবেশ ধ্বংস, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং নাগরিক অসচেতনতার সম্মিলিত প্রভাব।
নাগরিক অসচেতনতা জলাবদ্ধতার অন্যতম বড় কারণ। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন, খাবারের প্যাকেট, নির্মাণবর্জ্য এবং গৃহস্থালির আবর্জনা রাস্তায়, নালায় কিংবা খালে ফেলে দেন। এসব বর্জ্য ড্রেনের প্রবাহ বন্ধ করে দেয়। বৃষ্টি হলেই পানি দ্রুত নিষ্কাশিত হতে পারে না। একটি প্লাস্টিকের ব্যাগ হয়তো তুচ্ছ মনে হতে পারে, কিন্তু হাজার হাজার প্লাস্টিক একত্রিত হয়ে পুরো ড্রেনেজ ব্যবস্থাকে অকার্যকর করে দিতে পারে। নাগরিক দায়িত্ববোধের অভাব তাই জলাবদ্ধতার একটি মৌলিক কারণ।
তবে শুধু নাগরিকদের দোষারোপ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। অপরিকল্পিত নগরায়ণ ঢাকার জলাবদ্ধতার অন্যতম প্রধান কারণ। গত কয়েক দশকে দ্রুত নগর সম্প্রসারণের ফলে অসংখ্য জলাভূমি, নিম্নভূমি, পুকুর, বিল ও প্রাকৃতিক পানি ধারণক্ষম এলাকা ভরাট করে আবাসন, মার্কেট ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে। একসময় যে জমিগুলো অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি ধারণ করত, সেগুলো আজ কংক্রিটে ঢেকে গেছে। ফলে বৃষ্টির পানি জমে থাকার প্রবণতা বেড়েছে।
ঢাকার ঐতিহাসিক খালগুলোও আজ অস্তিত্ব সংকটে। এক সময় শহরের পানি দ্রুত নদীতে পৌঁছে দিতে খালগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। কিন্তু দখল, ভরাট, অবৈধ স্থাপনা এবং অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে অনেক খাল সংকুচিত হয়েছে, অনেকগুলো প্রায় বিলুপ্ত। ফলে প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনের পথ নষ্ট হয়ে গেছে।
ড্রেনেজ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও বড় কারণ। শহরের অনেক ড্রেন কয়েক দশক আগে নির্মিত হয়েছিল, যখন জনসংখ্যা ও নির্মাণ অনেক কম ছিল। আজ সেই পুরোনো ড্রেন দিয়ে বহুগুণ বেশি বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের চেষ্টা করা হচ্ছে। অনেক ড্রেন সরু, অপর্যাপ্ত বা নকশাগতভাবে দুর্বল। কোথাও কোথাও ড্রেনের সংযোগও সঠিক নয়। ফলে বৃষ্টির পানি দ্রুত প্রবাহিত হতে পারে না। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। ড্রেন, কালভার্ট ও খাল সময়মতো পরিষ্কার না করলে পলি, ময়লা ও আবর্জনা জমে পানি চলাচলের পথ সংকুচিত হয়ে যায়। বর্ষাকাল শুরু হওয়ার আগে ব্যাপকভাবে ড্রেন পরিষ্কার করা হলেও সারা বছর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি থেকে যায়।
নির্মাণকাজও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। ভবন নির্মাণের সময় বালু, সিমেন্ট ও ইটের টুকরো প্রায়ই ড্রেনে পড়ে যায়। অনেক ঠিকাদার নির্মাণবর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ না করে রাস্তার পাশে বা নালায় ফেলে রাখেন। এতে ড্রেনের কার্যক্ষমতা কমে যায়। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টির প্রবণতা বেড়েছে। অল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ বৃষ্টির পানি শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা সামাল দিতে পারে না। ফলে অল্প সময়েই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়।
নদী ও আশপাশের জলাশয়ের নাব্যতা কমে যাওয়াও একটি কারণ। শহরের নিষ্কাশিত পানি শেষ পর্যন্ত নদীতে গিয়ে পড়ে। নদীতে পানি ধারণক্ষমতা কমে গেলে বা নদীর পানি বেড়ে গেলে শহরের পানি দ্রুত বের হতে পারে না। তখন উল্টো নদীর পানি শহরের নিম্নাঞ্চলে ঢুকে পরিস্থিতি আরও খারাপ করে। প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের অভাবও দীর্ঘদিনের সমস্যা। নগর উন্নয়ন, পানি নিষ্কাশন, সড়ক, খাল, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ—এসব কাজ বিভিন্ন সংস্থার আওতায় থাকায় অনেক সময় পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে সমন্বয়হীনতা দেখা যায়। একটি সংস্থা রাস্তা নির্মাণ করছে, অন্যটি পরে সেটি কেটে পাইপ বসাচ্ছে, আবার অন্য সংস্থা ড্রেন সংস্কার করছে। সমন্বয়ের অভাবে ব্যয় বাড়ে, কিন্তু সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয় না।
জলাবদ্ধতার প্রভাব শুধু চলাচলের অসুবিধায় সীমাবদ্ধ নয়। এটি অর্থনীতির ওপরও বড় চাপ সৃষ্টি করে। যানজটে কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়, ব্যবসায়িক ক্ষতি হয়, পণ্য পরিবহন ব্যাহত হয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপস্থিতি কমে যায় এবং জরুরি স্বাস্থ্যসেবাও বিঘ্নিত হয়। জলাবদ্ধ পানিতে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে, মশাবাহিত রোগের বিস্তার ঘটে এবং দূষিত পানির মাধ্যমে বিভিন্ন সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে।
এই নারকীয় ভোগান্তি থেকে ঢাকাবাসীকে মুক্ত করতে হলে জোড়াতালির সমাধান বন্ধ করতে হবে। প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদী, বৈজ্ঞানিক এবং কঠোর সদিচ্ছাসম্পন্ন মহাপরিকল্পনা। এজন্য নিচের পদক্ষেপসমূহ গ্রহণ করা যেতে পারে।
খাল উদ্ধার ও জলাশয় সংরক্ষণ: জলাবদ্ধতা দূর করার প্রথম এবং প্রধান শর্ত হলো ঢাকার হারিয়ে যাওয়া খালগুলো উদ্ধার করা। সিএস ও আরএস পর্চা অনুযায়ী খালের সীমানা নির্ধারণ করে সব ধরনের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে হবে। উচ্ছেদকৃত খালের গভীরতা ও প্রশস্ততা বাড়িয়ে সেগুলোকে নদীর সাথে যুক্ত করতে হবে। হাতিরঝিলের মডেলে শহরের অন্যান্য অংশেও ওয়াটার রিটেনশন পন্ড বা কৃত্রিম জলাধার তৈরি করতে হবে, যা বৃষ্টির উদ্বৃত্ত পানি সাময়িকভাবে ধরে রাখবে।
বক্স কালভার্ট ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন: অতীতে ঢাকার অনেক জীবন্ত খালকে বক্স কালভার্ট বানিয়ে কার্যত মেরে ফেলা হয়েছে। এই বক্স কালভার্টগুলোর ভেতরে বর্জ্য জমে পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যায় এবং তা পরিষ্কার করাও কঠিন। আধুনিক নগর পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই বক্স কালভার্টগুলো ভেঙে উন্মুক্ত লেক বা খালে রূপান্তর করা প্রয়োজন। পাশাপাশি, পুরো শহরের ড্রেনেজ নেটওয়ার্ককে আধুনিক ও জিপিএস প্রযুক্তির আওতায় এনে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
স্পঞ্জ সিটি ধারণার প্রয়োগ: আধুনিক বিশ্বে নগর বন্যা বা জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণে ‘স্পঞ্জ সিটি’ ফর্মুলা ব্যবহার করা হচ্ছে। এর মূল কথা হলো শহরকে এমনভাবে গড়ে তোলা যাতে তা স্পঞ্জের মতো পানি শুষে নিতে পারে। এজন্য ঢাকার ফুটপাত এবং উন্মুক্ত স্থানগুলোতে কংক্রিটের বদলে পারমিয়েবল বা পানিভেদ্য ব্লক ব্যবহার করতে হবে, যাতে বৃষ্টির পানি মাটির নিচে চলে যায়। ভবনের ছাদে ‘গ্রিন রুফ’ বা ছাদবাগান বাধ্যতামূলক করা এবং বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করা উচিত।
কঠোর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও আইন প্রয়োগ: নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। যত্রতত্র প্লাস্টিক ও পলিথিন ফেলা বন্ধ করতে হবে। শহরের সব ড্রেনের মুখে বিশেষ নেট বা ছাঁকনি ব্যবহার করা যেতে পারে, যা বর্জ্যকে ড্রেনের ভেতরে ঢুকতে বাধা দেবে এবং তা সহজে অপসারণ করা যাবে। পলিথিন ও একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা, উন্নয়নের নামে প্রকৃতিকে ধ্বংস করার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। প্রকৃতিকে প্রতিপক্ষ নয়, সহযোগী হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। যে শহর তার খাল, জলাভূমি ও প্রাকৃতিক পানি চলাচলের পথ ধ্বংস করে, সে শহর একসময় নিজেই পানির কাছে পরাজিত হয়।
ঢাকার জলাবদ্ধতা কোনো অনিবার্য নিয়তি নয়। বিশ্বের অনেক ঘনবসতিপূর্ণ শহর যেখানে বৃষ্টিপাত ঢাকার চেয়েও বেশি—সুশাসন, পরিকল্পিত নগরায়ণ, আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং নাগরিক শৃঙ্খলার মাধ্যমে জলাবদ্ধতা উল্লেখযোগ্যভাবে নিয়ন্ত্রণে এনেছে। ঢাকা আমাদের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রাণকেন্দ্র। এই শহরকে এভাবে প্রতি বর্ষায় ডুবতে দেওয়া যায় না। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আগামী দিনগুলোতে বৃষ্টিপাতের ধরন আরও অনিয়মিত এবং ভারি হতে পারে, যা বিপদ আরও বাড়াবে। তাই এখনই সময় একে অপরকে দোষারোপ করার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে একটি বাসযোগ্য, বন্যামুক্ত ও আধুনিক ঢাকা গড়তে সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার। দক্ষ পরিকল্পনা, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং নাগরিক দায়িত্ববোধ একসঙ্গে কাজ করলে তিলোত্তমা ঢাকা এই জলাবদ্ধতার সংকট থেকে মুক্তি পাবে।
লেখক: অতিরিক্ত পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক








