প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া, বিশেষ করে চীনে রাষ্ট্রীয় সফরকে ‘ঐতিহাসিক’ সফরই বলতে হবে। তার শহীদ পিতা প্রেসিডেন্ট জিয়া ও জননী দেশনেত্রী বেগম জিয়াও এরকম মর্যাদাপূর্ণ চীনা আতিথেয়তায় মুগ্ধ করেছিলেন দেশবাসীকে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর এ সফর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যথোপযুক্ত আগ্রহ ও ইতিবাচক মূল্যায়নের নতুন বাস্তবতায় উন্নীত হয়েছে, যা ফুটে উঠেছে এ সফর নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রধান আলোচ্য বিষয় হিসাবে। দেশের সামগ্রিক অগ্রগতি ও প্রতিরক্ষা কৌশলপটে প্রধানমন্ত্রীর এ সফরের গুরুত্ব এবং তাৎপর্য অকল্পনীয়। দেখে খুশি হলাম যে, বিরোধীদলীয় নেতাও তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফর নিয়ে সংসদে প্রশংসা করেছেন এবং এ বিষয়ে সর্বাত্মক সহযোগিতা ও সমর্থনের আশ্বাস দিয়েছেন।

এ সফরে চুক্তি স্বাক্ষরসহ ১৭টি সমঝোতা দলিল স্বাক্ষরিত হয়েছে, যা একটি বিরল ব্যতিক্রম। অতীতের এহেন শীর্ষ পর্যায়ের সফরে আর্থিক সহায়তা, প্রকল্প অর্থায়ন, সমঝোতা স্মারক এ পর্যায়ে সীমিত থাকত। এবারই প্রথম দুই বন্ধুপ্রতিম প্রতিবেশী দেশের মধ্যে এ অঙ্কের বিশাল বিনিয়োগ সহযোগিতা এবং রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সবচেয়ে বৈশ্বিক, আঞ্চলিক ও দ্বিপাক্ষিক গুরুত্ব বহন করেছে স্বাগতিক চীনা শীর্ষ নেতা শি জিনপিং ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মধ্যে বৈঠকে। এর আগে চীনা প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বৈঠকটিও ছিল সমধিক গুরুত্বপূর্ণ। স্বাক্ষরিত চুক্তি ও সমঝোতা দলিলাদির মধ্যে ছিল দ্বিপাক্ষিক উন্নয়ন সহযোগিতা, মোংলা বন্দর আধুনিকায়ন ও সংস্কারের বিষয়ে রূপরেখা প্রণয়ন, চীনা ভাষা শিক্ষার সুযোগ ও কাঠামো সম্প্রসারণ, পরিবেশবান্ধব বিকল্প জ্বালানি, ভূতাত্ত্বিক জরিপ পরিচালনা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিকাশে সহযোগিতা, চীনা মিডিয়া গ্রুপের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্প্রচার কর্তৃপক্ষগুলোর মধ্যে সহযোগিতা সর্বোপরি প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে যথোপযুক্ত অগ্রাধিকার প্রদান।

২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর বাংলাদেশ সফরকালে স্বাক্ষরিত চীনের বৈশ্বিক উন্নয়ন ও সংযোগ অবকাঠামোর প্রতীক যে বেল্ট অ্যান্ড রোড (বিআরআই) ইনিশিয়েটিভে যুক্ত হয়েছিল, তার ১০ বছর পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এ ঐতিহাসিক সফরে সেই বিশ্ববন্ধনই যেন মূর্ত হয়ে উঠল। সূচিত হলো বাংলাদেশ-চীন সম্প্রীতি ও সৌভ্রাতৃত্বের এক নতুন যুগের।

মালয়েশিয়া সফর এবং একই যাত্রায় চীন সফরের মধ্য দিয়ে ‘বিএনপি’ সরকার জোটবলয় নির্বাচনে যথার্থই প্রাচ্যপ্রীতির এক সুদূরপ্রসারী কূটনৈতিক অভিমুখ তৈরি করেছে। এটাই বাংলাদেশের জন্য ‘বেস্ট অ্যান্ড স্মার্টেস্ট’ মুভ। আমাদের দুর্ভাগ্য যে, আমরা তিন দিক দিয়ে একটি শত্রু রাষ্ট্র দ্বারা বেষ্টিত। এ বেষ্টনীর হিংস্র খাঁচায় থেকে স্বাধীনতা ও জাতীয় স্বার্থ সম্পূর্ণ সমুন্নত রাখতে আমাদের প্রাচ্যমুখী হওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। এ প্রয়াসে আমাদের পাশে পেতে হবে পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ইরান, আরব বিশ্ব এবং যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়াকে। চীনের ‘বিআরআই’ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে আমরা মিয়ানমারের সঙ্গে তিক্ততা কাটিয়ে উঠতে পারব বলে আশা রাখি। রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে মালয়েশিয়া বিশ্ব ফোরামে সব সময়ই সরব এবং সোচ্চার। জাতীয় স্বার্থ এবং মানবিকতার নিরিখে তাই মালয়েশিয়ার সঙ্গে সুসম্পর্ক, বিশেষ করে বাংলাদেশের বিশাল জনশক্তির গন্তব্য হিসাবে মুসলিম মালয়েশিয়ার সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক অনিবার্যতই অগ্রাধিকারযোগ্য।

দ্বিতীয়ত, বর্তমান সরকার যথার্থই দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক অগ্রাধিকারে শীর্ষে রেখেছে চীনকে। এর প্রধান কারণ চীনের বিনিয়োগ, যা বাংলাদেশের যোগাযোগ অবকাঠামোর জন্য অত্যন্ত জরুরি। চীনের ইউনান প্রদেশের সঙ্গে সমুদ্রপথে সংযোগের স্বার্থেই তারা চাইছে বাংলাদেশের সম্মতি এবং সেই লক্ষেই তারা মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে স্থল সংযোগ (করিডর) গড়ার প্রস্তাব করেছে। এতে বাংলাদেশের লাভ দুদিক দিয়েই। এটি একদিক দিয়ে স্থলপথ ও বন্দর ব্যবহারের রাজস্ব, অন্যটি হলো বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের সরাসরি স্থল সংযোগ।

এ সফরের মধ্য দিয়ে দুটি দেশের মধ্যে এমন নিবিড়তার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, যা বাংলাদেশর অর্থনীতি, নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা ও আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক গতিপথও বদলে দিতে পারে। চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডরের যে প্রস্তাবনা, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বা চীনের ব্যাপক বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি, সেটা হবে। চীন এখন পৃথিবীর দ্বিতীয় অর্থনৈতিক ও সামরিক পরাশক্তি। চীনের বিআরআই অ্যাপ্রোচটি নতুন এক পৃথিবীর বার্তা দিচ্ছে, যে বার্তা একসময় দিয়েছিল দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ-পরবর্তী আমেরিকার মার্শাল প্ল্যান।

এ প্ল্যানে ক্ষতবিক্ষত ইউরোপ ও জাপান কোমর সোজা করে দাঁড়াতে পেরেছিল। চীনের এ মহাপরিকল্পনা এখন থেকে এশিয়া-আফ্রিকা-লাতিন আমেরিকার কোটি কোটি মানুষের জীবনমান বাড়াতে, সংযোগ সহজ করতে এবং বৈশ্বিক উন্নয়নে রীতিমতো বিপ্লব আনবে। এ বিআরআই অ্যাপ্রোচ অনুযায়ী এবং চুক্তি মোতাবেক এখন থেকে নিয়মিত চীন ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী পর্যায়ে বৈঠক হবে দুই দেশের মধ্যে। পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী পর্যায়ের নিয়মিত বৈঠকের ব্যাপারে ঐকমত্য এবারের চীন সফরের সত্যিই এক বিরলতম বৈশিষ্ট্য। এ বিআরআই অ্যাপ্রোচ অনুযায়ী এবং চুক্তি মোতাবেক এখন থেকে সংযুক্ত হবে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর, পাকিস্তানের গোয়াদার বন্দর, শ্রীলংকার হাম্বানটোটা বন্দর, নেপালের স্থলবন্দর কিংবা মিয়ানমারের কিয়াউকপিয়ো গভীর সমুদ্র বন্দরকে। ইতিহাস যেমন বাংলাদেশ ও চীনকে চিরকাল কাছে টেনেছে, ভূগোলও তেমনি নিবিড়ভাবে কাছে টানছে বাংলাদেশ ও চীনকে। তাই এ সফরের সবচেয়ে বড় দিক হলো, চীন এখন শুধু একটি সরকারের সঙ্গেই নয়, বরং গোটা রাষ্ট্র ও জনগণের সঙ্গে এক দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়। কয়েক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের থেকেও বড় মূল্যায়নটি হলো বাংলাদেশ ও চীন দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক-কাঠামোর নতুন শিলান্যাস ঘটাল এ রাষ্ট্রীয় সফর। এমনিতেই বাংলাদেশের মিলিটারি হার্ডওয়্যারের বড় অংশটি আসে চীন থেকে। এখন থেকেই দেশে যৌথ উদ্যোগে অর্ডন্যান্স কারখানা বা সমরাস্ত্র নির্মিত হবে। আসবে তুরস্ক থেকে অ্যাটাক ড্রোন, চীন এবং পাকিস্তান দিচ্ছে অতিসাম্প্রতিক প্রজন্মের জঙ্গিবিমান। শুধু সমরাস্ত্র উৎপাদনই নয়, গোটা প্রতিরক্ষা, জাতীয় নিরাপত্তা এবং কৌশলগত বিষয়েও ঢাকা-বেইজিং-এর মধ্যে গড়ে উঠেছে যৌথ নিরাপত্তার ব্যবস্থা ও ব্যবস্থাপনা।

এটা বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ বর্তমান বাংলাদেশ সরকার এবং সংসদে প্রধান বিরোধী দল যৌথ সহায়তায় ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে (ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ) একটি কূটনৈতিক ভারসাম্য বহাল রাখতে পারবে। চীন যেমন বাংলাদেশের বৃহত্তম উন্নয়ন শরিক, তেমনি বৃহৎ প্রতিবেশী ভারত এবং আমেরিকা বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাজার। কাজেই ভারতের গণমাধ্যম যেমন তারেক রহমানের বিরুদ্ধে ‘চীনের দিকে ঝুঁকে পড়ার’ অভিযোগ তুলছে, বিষয়টি মোটেও সেরকম নয়। চীন আমাদের প্রধানতম নিরাপত্তা অংশীদার এবং প্রতিরক্ষা সহযোগী। সেই অর্থে, চীন-পাকিস্তান-তুরস্কের সঙ্গে বাংলাদেশের ক্রমবর্র্ধমান সম্পর্ক লালন করতে বাংলাদেশ বদ্ধপরিকর। বাংলাদেশ তার কৌশলগত বিবেচনায় যে কোনো দেশের সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়ার অধিকার রাখে। চীন সফর সাফল্যের সঙ্গে সম্পন্ন করার মাধ্যমে বাংলাদেশ সেই বার্তাটিই জগৎকে দেখাতে পেরেছে এখানেই রাষ্ট্রনেতা তারেক রহমানের সাফল্য। তবে ভারতের আগ্রাসনবাদী নীতির সামনে মাথানত না করে তাকে তার বাবা-মায়ের মতোই বাংলাদেশের স্বার্থকে সমুন্নত রাখার গণদাবি মানতে হবে, এটাই সময়ের চাহিদা, এটাই গোটা জাতির প্রত্যাশা।

খন্দকার হাসনাত করিম : সিনিয়র সাংবাদিক