নারীদের বিরুদ্ধে সাইবার বুলিং, চরিত্রহনন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে ভুয়া কনটেন্ট ছড়ানোর বিষয়ে এক সংসদ সদস্যের প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে দীর্ঘ আইনি ব্যাখ্যা দিচ্ছিলেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। তখন তাঁকে থামিয়ে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বলেন, সংসদ সদস্যের মূল প্রশ্নের উত্তর তাঁর বক্তব্যে আসছে না। ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রশ্নের উত্তর যারা প্রস্তুত করেন, তাদের ‘আরও ভালোভাবে প্রিপারেশন (প্রস্তুত) করে’ সংসদে আসার পরামর্শও দেন তিনি।

আজ সোমবার জাতীয় সংসদে কার্যপ্রণালি বিধির ৭১ বিধিতে জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য সেলিনা সুলতানার নোটিশের জবাব দেওয়ার সময় এ ঘটনা ঘটে। ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে তখন সংসদের বৈঠক চলছিল।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীদের লক্ষ্য করে সাইবার বুলিং, চরিত্রহনন এবং এআই ব্যবহার করে ভুয়া ছবি, ভিডিও ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার বিষয়টি সংসদে তোলেন সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য সেলিনা সুলতানা। তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশেষ করে ভিন্নমত পোষণকারী ব্যক্তি ও নারীদের লক্ষ্য করে সাইবার বুলিং ও চরিত্রহননের ঘটনা বাড়ছে। এআই ব্যবহার করে ভুয়া ছবি ও ভিডিও তৈরি করে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।

এসব অপপ্রচারের ফলে নারীরা সামাজিকভাবে হেয় হচ্ছেন, মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছেন এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে আত্মহত্যার পথও বেছে নিচ্ছেন বলে মন্তব্য করেন সেলিনা সুলতানা। তিনি বলেন, একজন নারীর কান্নার কোনো দলীয় পরিচয় নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাইবার বুলিং, চরিত্রহনন এবং তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহারে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।

জবাবে তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, সাইবার অপরাধ প্রতিরোধে দেশে আইন রয়েছে, তবে অনেক ক্ষেত্রে তার প্রয়োগ হয় না। এরপর তিনি সাইবার সুরক্ষা আইনের ২৫ ধারায় ব্ল্যাকমেল, যৌন হয়রানি, রিভেঞ্জ পর্নো, শিশুর যৌন নিপীড়ন সংক্রান্ত উপাদান, সেক্সটরশন এবং এআই দিয়ে তৈরি বা সম্পাদিত কনটেন্ট প্রচারের অপরাধ ও শাস্তির বিধান পড়ে শোনাতে শুরু করেন।

মন্ত্রী বলেন, এ ধরনের অপরাধে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড, ১০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। কোনো নারী বা ১৮ বছরের কম বয়সী শিশুর বিরুদ্ধে এ অপরাধ করা হলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড, ২০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে। পরে এআই প্রযুক্তির বিস্তারের কারণে ডিপফেক ছবি, ভিডিও, অডিও এবং মানহানিকর ও বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট সহজে তৈরি ও ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি তুলে ধরেন তিনি।

মন্ত্রী যখন বিদ্যমান আইন ও প্রস্তাবিত সংশোধনীর বিভিন্ন ধারা বিস্তারিত পড়ছিলেন, তখন তাঁকে থামিয়ে ডেপুটি স্পিকার বলেন, ‘পরবর্তীতে এ ধরনের কোশ্চেনের আনসার যারা আপনাকে এসিস্ট করে, একটু ভালোভাবে প্রিপারেশন করে এখানে আসবেন। উনার যে কোশ্চেন বা কনসার্ন ছিল, সেটার আনসার আসছে না এখানে।’

জবাবে মন্ত্রী বলেন, তাঁর বক্তব্যের আরও অংশ রয়েছে এবং তাঁকে পুরোটা পড়ার সুযোগ দিতে হবে। এরপর ডেপুটি স্পিকার তাঁকে মূল বিষয়ে সংক্ষেপে বক্তব্য দিতে বলেন। এরপর তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী বলেন, বিদ্যমান সাইবার সুরক্ষা আইন আরও যুগোপযোগী ও কার্যকর করতে সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

প্রস্তাবিত সংশোধনীতে কোনো ব্যক্তিকে মানহানি বা হেয় করার উদ্দেশ্যে এআই দিয়ে তৈরি কিংবা সম্পাদিত কনটেন্ট প্রচারকে স্পষ্টভাবে অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ধরনের অপরাধের সাজা বাড়ানো এবং মানহানির একটি সুস্পষ্ট সংজ্ঞা আইনে যুক্ত করার প্রস্তাবও রয়েছে বলে জানান তিনি।

কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সাধারণ জনগণ বা রাষ্ট্রকে বিভ্রান্ত, প্রতারিত বা ক্ষতিগ্রস্ত করতে ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা, বিকৃত বা বিভ্রান্তিকর তথ্য তৈরি ও প্রচারকেও আইনি কাঠামোর আওতায় আনার উদ্যোগ চলছে বলে জানান মন্ত্রী। মানহানিকর তথ্য, গুজব ও অপতথ্য দ্রুত অপসারণ বা ব্লক করার বিধান আরও স্পষ্ট করার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি। ফকির মাহবুব আনাম বলেন, বিটিআরসির মাধ্যমে ইউটিউব, টিকটকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরকার যোগাযোগ করেছে।

দেশে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে কিংবা কোনো জনগোষ্ঠীর অনুভূতিতে আঘাত করে, এমন কনটেন্ট সরাতে প্রতিষ্ঠানগুলো আগ্রহ দেখালেও ব্যক্তিগত চরিত্রহননমূলক কনটেন্ট সহজে অপসারণ করতে চায় না। তিনি বলেন, ‘ব্যক্তিগত ক্যারেক্টার অ্যাসাসিনেশন যেগুলি হয়, উনারা সহজে সরাতে চায় না।’

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কনটেন্ট সরানোর ব্যবস্থা, সমন্বয় এবং প্রয়োজনীয় বিধিমালা প্রণয়নের ক্ষমতা আইনে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি। মন্ত্রী জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সাইবার বুলিং ও চরিত্রহননমূলক কনটেন্ট মোকাবিলায় একটি পাঁচ সদস্যের মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়েছে। তিনি বলেন, কমিটি চলতি সপ্তাহেই বৈঠকে বসবে। সেখানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত চরিত্রহনন, এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া কনটেন্ট এবং দ্রুত সেগুলো অপসারণের উপায় নিয়ে আলোচনা হবে।

প্রথম দফার বক্তব্য শেষে ডেপুটি স্পিকার মন্ত্রীকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘ধন্যবাদ মাননীয় মন্ত্রী বাহাদুর।’ এরপর তিনি সেলিনা সুলতানাকে সম্পূরক প্রশ্ন করার সুযোগ দেন। সম্পূরক প্রশ্নে সেলিনা সুলতানা বলেন, এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া ছবি ও ভিডিও কয়েক মিনিটের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

এ ধরনের কনটেন্ট দ্রুত শনাক্ত ও অপসারণ এবং জড়িত ব্যক্তিদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আইনের আওতায় আনতে বিশেষ সাইবার রেসপন্স টিম গঠনের পরিকল্পনা সরকারের আছে কি না, তা জানতে চান তিনি। ভুক্তভোগীদের জন্য ওয়ানস্টপ সাইবার সাপোর্ট ব্যবস্থা চালুর বিষয়েও সরকারের সিদ্ধান্ত জানতে চান এই সংসদ সদস্য।

জবাবে তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী আবারও মন্ত্রিসভার ওই কমিটির কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘আমরা এই সপ্তাহে একটা মিটিং করব। আমরা আলোচনা করব এবং সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নেব।’ সাইবার হয়রানির শিকার শুধু নারীরা নন, নারী-পুরুষ সবাই ভুক্তভোগী উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকার বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। মন্ত্রী জানান, জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সি অনলাইনে প্রচারিত ক্ষতিকর কনটেন্ট, ভুয়া তথ্য ও গুজব শনাক্ত ও বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সহায়তা করছে।

জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের আইসিটি কার্যালয়ে সাইবার নিরাপত্তা সেবা হেল্প ডেস্ক স্থাপন করা হয়েছে। সেখান থেকে সাধারণ মানুষ সাইবার নিরাপত্তাবিষয়ক পরামর্শ ও প্রাথমিক সহায়তা নিতে পারবেন। সাইবার বুলিং বা ডিজিটাল হয়রানির শিকার নারীরা ৩৩৩ নম্বরে অভিযোগ জানাতে পারবেন। অভিযোগ পাওয়ার পর প্রাথমিক অনুসন্ধান ও তথ্য যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে তা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হবে বলে জানান তিনি। এ ছাড়া সাইবার অপরাধের অভিযোগ গ্রহণ, মূল্যায়ন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে পাঠানো এবং অভিযোগের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের জন্য ‘সাইবার ইনসিডেন্ট রিপোর্টিং সিস্টেম’ নামে একটি কেন্দ্রীয় সফটওয়্যার প্ল্যাটফর্মও তৈরি করা হয়েছে বলে সংসদকে জানান তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী।