ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে শেষ শ্রদ্ধা জানানোর মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। শনিবার ছয় দিনের আনুষ্ঠানিকতার প্রথম দিনে রাজধানী তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা কমপ্লেক্স এলাকা কার্যত জনসমুদ্রে পরিণত হয়। লাখো মানুষ কালো পোশাক পরে, ইরানের পতাকা ও প্রয়াত নেতার ছবি হাতে জড়ো হন। গ্র্যান্ড মোসাল্লার ফটক খুলে দিলে মুহূর্তেই এর চত্বর পূর্ণ হয়ে যায়। ইরানিরা আলী খামেনি ও তার পরিবারের নিহত সদস্যদের কফিন দেখা ও শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগ পান।

গ্র্যান্ড মোসাল্লায় একটি মঞ্চসদৃশ উঁচু স্থানে তাদের কফিন রাখা হয়েছিল। তেহরান থেকে বার্তা সংস্থা এএফপির সংবাদদাতা জানান, আলী খামেনির কফিন সেখানে পৌঁছানোর আগেই অগণিত মানুষ জড়ো হন। অংশগ্রহণকারীদের অনেককে লাল পতাকা ও প্ল্যাকার্ড হাতে দেখা গেছে। তারা যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী নানা স্লোগান দিচ্ছিলেন। ইরানের তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানায়, মোসাল্লার প্রধান ফটক খোলার কয়েক ঘণ্টা আগেই ইরানের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লোকজন হাজির হয়েছিলেন। ভিড় এত বেশি ছিল যে, ফজরের আজানের সময়ই দরজা খুলে দেওয়া হয়, যাতে মানুষ গ্র্যান্ড মোসাল্লা মসজিদ কমপ্লেক্সের মূল প্রাঙ্গণে প্রবেশ করতে পারেন।

গ্র্যান্ড মোসাল্লা বা ইমাম খোমেনি মোসাল্লায় কফিন রাখার পর প্রয়াত নেতার প্রতি শ্রদ্ধা জানান ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, সরকারি কর্মকর্তা এবং বিদেশি অতিথিরাও। শ্রদ্ধা জানাতে আসা ইরানিদের পরনে ছিল কালো পোশাক, হাতে দেশের পতাকা। কারও কারও হাতে ছিল বদ্ধমুষ্টির প্রতীক, প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি ও বর্তমান নেতা মুজতবা খামেনির ছবি। তারা প্রয়াত নেতাকে বিদায় জানানোর পাশাপাশি নতুন নেতার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছেন।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, শ্রদ্ধা নিবেদনকারীদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি আলোচনার মধ্যস্থতায় ভূমিকা রাখা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট ও ভ্লাদিমির পুতিন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি দিমিত্রি মেদভেদেভ, চীনের ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের উপপ্রধান হে উই, ইরাকের প্রেসিডেন্ট নিজার আমেদি, আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকিও উপস্থিত ছিলেন।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, আলী খামেনিকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে প্রতিবেশী সৌদি আরব একটি প্রতিনিধিদল পাঠিয়েছে। দলটির নেতৃত্বে রয়েছেন সৌদির পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ওয়ালিদ আল-খুরাইজি। বিষয় দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের বড় ধরনের অগ্রগতি হিসাবে দেখা হচ্ছে। শ্রদ্ধা জানতে বাংলাদেশ থেকে গেছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদও (বীরবিক্রম)।

এছাড়া ইরাক, আর্মেনিয়া, তুরস্ক ও উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশের প্রতিনিধিরাও শোকযাত্রায় অংশ নিতে তেহরানে পৌঁছেছেন। এসব দেশের মধ্যে সৌদি আরব, কাতার এবং ওমানও রয়েছে। সর্বোচ্চ নেতাকে শ্রদ্ধা জানাতে ভারতও একটি প্রতিনিধিদল পাঠিয়েছে। দেশটির প্রতিনিধিত্ব করছেন বিহারের রাজ্যপাল সৈয়দ আতা হাসনাইন এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী পবিত্র মারঘেরিতা। লেবাননে ইসরাইলের হামলায় নিহত হিজবুল্লাহ নেতা হাসান নাসরাল্লাহ’র পরিবারে সদস্যরা এ আয়োজনে অংশ নিয়েছেন।

সিএনএনের প্রতিনিধি ফ্রেডেরিক প্লেটজেন তেহরান থেকে জানান, কালো পোশাক পরে লাখো মানুষ শোক জানাতে জড়ো হন। তারা ছিলেন শোকাহত; অনেকে কাঁদছিলেন। ৩০ বছরের নাফিসেহ সাদাত সাদরি সিএনএনকে বলেন, ‘আমি তাকে (আলী খামেনি) আমার বাবার চেয়েও বেশি ভালোবাসতাম। মনে হয়েছে-আবার বাবাকে হারালাম।’ এ সময় অনেকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো ধরনের সংলাপ চালিয়ে যাওয়ার বিরুদ্ধেও কথা বলেন।

আজ রোববারও গ্র্যান্ড মোসাল্লায় রাখা হবে আলী খামেনিসহ নিহতদের কফিন। সেখানে সাধারণ ইরানিরা শ্রদ্ধা জানাতে পারবেন। সকালে বিশেষ মোনাজাতের আয়োজন করা হয়েছে। এতে অংশ নেবেন ইরানের শীর্ষ ধর্মীয় নেতারা।

খামেনিকে শেষ শ্রদ্ধা জানানোর এ আয়োজনের মধ্যেই লেবাননে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরাইল। আলজাজিরা জানায়, দক্ষিণ লেবাননে অন্তত ১০টি স্থানে হামলা হয়েছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলের হামলায় নিহত হন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। এ সময় তার ১৪ মাস বয়সি নাতনিসহ পরিবারের আরও চারজন সদস্যও নিহত হন। গ্র্যান্ড মোসাল্লায় শ্রদ্ধা জানানোর জন্য খামেনির কফিনের পাশে যে ছোট্ট কফিনটি রয়েছে, সেটি তার ওই নাতনির।

চার মাসের বেশি সময় পর এ শেষ শ্রদ্ধার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। চলবে আগামী বৃহস্পতিবার পর্যন্ত। ইরান ও ইরাকের পাঁচ শহরে এ আনুষ্ঠানিকতাকে নজিরবিহীন বলছেন বিশ্লেষকরা। তেহরান থেকে আলী খামেনির কফিন কুম শহরে নেওয়া হবে। সেখান থেকে ইরাকের নাজাফ ও ঐতিহাসিক স্থান কারবালায় নেওয়া হবে। আগামী বৃহস্পতিবার নিজ জন্মশহর মাশহাদে তাকে দাফন করা হবে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, বৃহস্পতিবার গভীর রাতে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির কফিন জনসাধারণের সামনে আনা হয়। সে সময় ইরানের হাজারো মানুষ সেখানে উপস্থিত ছিলেন। অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। অনেকে কফিনে ফুল ছুড়ে দেন। শুক্রবার তিনি ও তার পরিবারের নিহত সদস্যদের কফিন রাখা হয় গ্র্যান্ড মোসাল্লার বৃহৎ নামাজের হলে।

আগামী কয়েক দিনের বড় শোকযাত্রাগুলোয় লাখো মানুষের যাতে সমস্যা না হয়, সেজন্য কর্তৃপক্ষ পরিবহণ, খাবার ও থাকার ব্যবস্থার পরিকল্পনা করেছে। ইরানের কর্মকর্তাদের ধারণা, সব মিলিয়ে খামেনির প্রতি শোক জানাতে দুই কোটি মানুষের সমাগম হতে পারে। রয়টার্স জানায়, তেহরানের সড়কগুলোয় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়। প্রধান সড়কজুড়ে মোতায়েন রয়েছে সামরিক ও পুলিশ যানবাহন। আর পুলিশ সদস্য ও কালো পোশাক পরিহিত স্বেচ্ছাসেবী বাসিজ আধাসামরিক বাহিনীর সদস্যরা মোটরসাইকেলে টহল দিচ্ছিলেন। শেষ শ্রদ্ধার এ আয়োজন চলাকালে কোনো হামলা চালানো নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে সতর্কও করেছে ইরান।

হরমুজ নিয়ে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের যৌথ বিবৃতি : যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এবং ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ হরমুজ প্রণালি নিয়ে একটি যৌথ বিবৃতি দিয়েছেন। এতে তারা বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ধমনি। আলজাজিরা জানায়, দুই নেতা এ প্রণালি দিয়ে সব দেশের জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন।

নেতারা জানান, ‘ওমান সালতানাত যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের সঙ্গে কাজ করতে সম্মত হয়েছে, যাতে তাদের সার্বভৌম জলসীমা নৌচলাচলের জন্য নিরাপদ রাখা যায়। হরমুজে নৌচলাচলের স্বাধীনতা রক্ষায় সহায়তার জন্য বৃহত্তর বহুজাতিক সামরিক মিশন মোতায়েন করতেও যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স প্রস্তুত আছে।’