জি বি এম রুবেল আহম্মেদ
পূর্ব আকাশে সূর্যের আলো ফোটার আগেই প্রেম যমুনার ঘাটে এসে বসেছে রিতু। মাথায় হাত দিয়ে নিঃশব্দে নদীর দিকে তাকিয়ে আছে। রাজু কথা দিয়েছিল–সূর্য ওঠার আগেই ঘাটে পৌঁছাবে। আজ তারা একসঙ্গে পালিয়ে যাবে। সেই বিশ্বাসেই ছোট্ট একটি ব্যাগ নিয়ে গভীর রাতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছে রিতু। একের পর এক নৌকা ওপার থেকে এপারে ভিড়ছে। মাঝিদের হাঁকডাক, যাত্রীদের কোলাহল–সবই চলছে আগের মতো। শুধু আসছে না রাজু। প্রতিটি নৌকা ঘাটে ভিড়লেই রিতুর বুকের ভেতর আশার ঢেউ ওঠে, আবার মুহূর্তেই তা ভেঙে পড়ে। অপেক্ষা দীর্ঘ হতে হতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামে। তবু রাজুর দেখা নেই। অপেক্ষার প্রহর গুনতে গুনতে রিতুর মনে ভেসে ওঠে দুই মাস আগের এক পড়ন্ত বিকেলের স্মৃতি। সেদিন এই একই ঘাট থেকে নৌকায় চড়ে বগুড়া যাচ্ছিল রিতু। নৌকায় উঠতে একটু ভয় পাচ্ছিল সে। ঠিক তখনই এক তরুণ হাত বাড়িয়ে বলেছিল, ‘সাবধানে, আমার হাতটা ধরুন।’
রিতু সংকোচ নিয়ে হাত বাড়াতেই তরুণটি তাকে নিরাপদে নৌকায় তুলে দিয়েছিল। সেই ছিল রাজুর সঙ্গে প্রথম পরিচয়।
বিস্তীর্ণ যমুনার বুক চিরে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছিল নৌকা। নদীর বুকে জেগে থাকা বালুচরগুলো সাদা কাশফুলে ঢাকা। দূরে কয়েকটি কুকুর নিশ্চিন্তে হাঁটছে। একপাল হাঁস জলের ওপর ভেসে বেড়াচ্ছে। ছোট ছোট মাছধরা নৌকায় জেলেরা জাল ফেলছে। মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে সাদা বকের ঝাঁক। পড়ন্ত বিকেলের সোনালি আলোয় পুরো নদী যেন এক জীবন্ত ছবিতে পরিণত হয়েছিল। প্রকৃতির সেই অপার্থিব সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে রিতু বলেছিল, ‘এক্সকিউজ মি, আমাকে একটা ছবি তুলে দেবেন?’
রাজু হেসে উত্তর দিয়েছিল, ‘শিওর, হোয়াই নট?’
‘থ্যাংক ইউ।’
‘ইটস ওকে।’
সেই ছবিই হয়ে উঠেছিল তাদের পরিচয়ের প্রথম উপলক্ষ। ঘাটে পৌঁছে রাজু বিনয়ের সঙ্গে রিতুর ফেসবুক আইডি চেয়েছিল। শ্যামলা বর্ণের ছিমছাম গড়নের মেয়েটিকে প্রথম দেখাতেই ভালো লেগেছিল তার। বাসায় ফিরে রাজু মেসেজ করল, ‘হাই, বাসায় পৌঁছেছেন?’
রিতু প্রথমে চিনতে না পেরে লিখল, ‘কে আপনি?’
‘আমি আপনার অপূর্ব মুহূর্তের ফটোশ্রমিক।’
রিতুর ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল, ‘ও আচ্ছা, আপনি!’
‘জি, আমি রাজু। কেমন আছেন?’
‘ভালো আছি। একটু আগেই বাসায় পৌঁছেছি। আপনাকে ধন্যবাদ।’
‘ধন্যবাদ কেন?’
‘আমাকে সাহায্য করলেন, আবার ছবিও তুলে দিলেন।’
‘এটা তো আমার দায়িত্ব ছিল। একটা কথা বলি?’
‘শিওর।’
‘পড়ন্ত বিকেলের সেই প্রকৃতির মাঝেও আপনার হাসিটাই সবচেয়ে সুন্দর ছিল।’
রিতু মৃদু হেসে লিখেছিল, ‘ওটার কৃতিত্ব কিন্তু আপনার।’
‘কীভাবে?’
‘আপনি এত সুন্দর করে ছবিটা তুলেছেন বলেই।’
‘না, ছবি সুন্দর হয়েছে কারণ আপনি সুন্দর।’
‘মোটেও না। আপনার চোখ আর হাতের ছোঁয়াতেই ছবিটা সুন্দর হয়েছে।’
রাজু শুধু লিখেছিল, ‘ধন্যবাদ।’
সেই দিনের কথোপকথন ধীরে ধীরে রূপ নিয়েছিল প্রতিদিনের অপেক্ষায়। পরিচয়ের মাত্র কয়েক দিনেই তারা ভালোবাসার সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। আর আজ, সেই সম্পর্কের টানেই রিতু আবার ফিরে এসেছে প্রেম যমুনার ঘাটে, রাজুর অপেক্ষায়। কিন্তু রাজু আসেনি।
ঘাটের ছাউনিতে বসে রিতু নিজের সঙ্গে নিজেই কথা বলছে, ‘বাড়ি ফিরে গেলে বাবা আমাকে মেরে ফেলবেন। আমি কোথায় যাব? না, আর ফিরে যাওয়ার পথ নেই। আজ না হোক কাল রাজু আসবেই। সে আমাকে নিজের চেয়েও বেশি ভালোবাসে। মাসখানেক কথোপকথনে আমি তাকে চিনেছি। সে আমাকে ফেলে যেতে পারে না...’
কিন্তু দিন গড়িয়ে যায়। একদিন, দুইদিন, তারপর একসপ্তাহ। রাজুর কোনো খোঁজ নেই। ততদিনে রিতুর মুখে একফোঁটা অন্নও ওঠেনি। অথচ ক্ষুধা বা তৃষ্ণার অনুভূতিও যেন হারিয়ে গেছে। সারাক্ষণ নদীর ওপারের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। প্রতিটি নৌকা ঘাটে ভিড়লেই বুকের ভেতর আশা জাগে–এই বুঝি রাজু এলো। কিন্তু প্রতিবারই সে ভুল প্রমাণিত হয়। অপেক্ষা দীর্ঘ হতে হতে একসময় একমাস পেরিয়ে যায়। ঘাটের মানুষ তার পরিচয় জানতে চায় কিন্তু কোনো উত্তর দেয় না। পুলিশ তাকে থানায় নিয়ে বাড়িতে পৌঁছে দিতে চায় কিন্তু সে পরিচয় দেয় না। সেখান থেকে ওঠে না।
একদিন রাজু তার স্ত্রীকে নিয়ে মাদারগঞ্জ ঘাটে আসে। সেখান থেকে নৌকায় করে বগুড়া যাবে। তিন বছর আগেই তার বিয়ে হয়েছে।
নৌকা যমুনার বুক চিরে এগিয়ে চলেছে। নদীর ঢেউয়ের দিকে তাকিয়ে রাজুর মনে ভেসে উঠছে রিতুর মুখ। সে রিতুকে ভালোবেসেছিল–এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু সেই ভালোবাসার কোনো পরিণতি ছিল না। দ্বিতীয় বিয়ের কথা প্রকাশ পেলে চাকরি হারানোর আশঙ্কা ছিল। দায়িত্ব, সংসার আর চাকরির নিরাপত্তার কাছে একদিন আবেগকে হার মানাতে হয়েছিল। তাই পালিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েও সে আর ঘাটে আসেনি। এই অপরাধবোধ আজও তাকে তাড়া করে ফেরে। নৌকা ঘাটে ভিড়তেই রাজু এক হাতে লাগেজ আর অন্য হাতে স্ত্রীর হাত ধরে নামল। কয়েক কদম এগোতেই তার চোখ আটকে গেল ঘাটের ছাউনির দিকে। একটি মেয়ে বসে আছে। শরীরে ময়লা, ছেঁড়া কাপড়। চুল জট বেঁধে এলোমেলো। কতদিন গোসল করেনি বোঝার উপায় নেই। শুকনো মুখ, কঙ্কালসার দেহ। গালে হাত রেখে সে শূন্য দৃষ্টিতে নদীর দিকে তাকিয়ে আছে। প্রথমে রাজু চিনতে পারেনি। কিন্তু একটু কাছে যেতেই বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। মেয়েটি আর কেউ নয়–রিতু।
রাজুর হাত থেকে লাগেজ মাটিতে পড়ে গেল। তার মনে পড়ে গেল একমাস আগে দেওয়া সেই প্রতিশ্রুতির কথা। সে-ই তো রিতুকে বলেছিল, ‘ঘাটে চলে এসো, আমরা একসঙ্গে চলে যাব।’
রিতু এসেছিল। কিন্তু রাজু আসেনি। আজও রিতুর কাঁধে সেই ব্যাগ। যেন সে এখনো অপেক্ষা করছে, অথবা অপেক্ষা করতে করতেই সময়ের কাছে হার মেনে সবকিছু ভুলে গেছে। রাজুর চোখ ভিজে উঠল। পা দুটো সামনে এগোতে চাইছে না। তবু সাহস সঞ্চয় করে কাছে গিয়ে কাঁপা গলায় বলল, ‘চলুন, আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দিই।’
রিতু তার দিকে তাকাল। সেই দৃষ্টিতে কোনো পরিচয় নেই, কোনো ভালোবাসা নেই–শুধু গভীর ঘৃণা আর অসহায় ক্ষোভ। সে রাজুকেও অন্য সবার মতো অকথ্য ভাষায় গালাগালি করল। তারপর থুথু ছুড়ে দিলো তার দিকে। একটিও বাড়তি কথা বলল না। রাজু নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। মনে হলো, তার মাথার ওপরের পুরো আকাশটা যেন ভেঙে পড়েছে। রাজুর আর বুঝতে বাকি রইল না–অপেক্ষা মানুষটিকে ভেতর থেকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। শেষ চেষ্টা হিসেবে পাশের দোকান থেকে কিছু রুটি আর কলা কিনে এনে রিতুর সামনে বাড়িয়ে দিলো। সে কখনো হেসে উঠছে, কখনো নদীর ওপারে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলছে, ‘ও আসবে... এই নৌকাতেই আসবে...’ পরক্ষণেই মাটিতে পড়ে থাকা রুটিগুলো নদীর দিকে ছুড়ে দিয়ে আবার ছাউনির কোণে গুটিসুটি মেরে বসে পড়ল। রাজু আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। ভারী পায়ে স্ত্রীকে নিয়ে সিএনজিতে উঠে রওয়ানা দিলো। কিন্তু সারা পথ তার বুকের ভেতর একটাই বাক্য প্রতিধ্বনিত হতে লাগল, ‘সৃষ্টিকর্তা আমাকে কোনো দিন ক্ষমা করবেন না। আমার বিশ্বাসঘাতকতার কারণেই আজ রিতুর এই পরিণতি। যে মেয়েটি আমাকে বিশ্বাস করে সবকিছু ছেড়ে এসেছিল, আজ সে পথের পাগলি। আমি তাকে শুধু প্রতারণাই করিনি, তার পুরো জীবনটাই ধ্বংস করে দিয়েছি। পৃথিবীর কোনো শাস্তিই আমার এই অপরাধের সমান হতে পারে না। আমি নিজেকে কোনো দিন ক্ষমা করতে পারব না। এ জীবনে আমি কিভাবে এ দৃশ্য ভুলে থাকব? আমি সুখে থাকব, আরেকজন পথের পাগলি হয়ে পথে পথে জীবন কাটাবে–এটা কী করে হয়?’
সিএনজি ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে গেল। রাজু আর একবারও পেছনে তাকানোর সাহস পেল না। কিন্তু তার মনে হচ্ছিল, ঘাটের ছাউনির নিচে একটি মেয়ে এখনো ছোট্ট ব্যাগটি বুকে জড়িয়ে নদীর ওপারের দিকে তাকিয়ে আছে। প্রতিটি নৌকা ভিড়লেই হয়তো তার মনে হয়–এই বুঝি রাজু এলো। যমুনার ঢেউ আজও তীরে আছড়ে পড়ে। নৌকা আসে, নৌকা যায়। মাঝিদের হাঁকডাক থামে না। শুধু থেমে গেছে একটি মেয়ের জীবন, একটি বিশ্বাস, একটি অপূর্ণ ভালোবাসা। তারপর থেকে মানুষ সেই ঘাটকে শুধু নৌকা পারাপারের ঘাট বলে না। তারা চেনে–‘প্রেম যমুনার ঘাট’ নামে। যেখানে প্রতিদিন নৌকা ফিরে আসে, শুধু ফিরে আসে না একটি প্রতিশ্রুতি।
আরও পড়ুন
অপূর্ণ বর্ষা
এসইউ








