দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলো গরুর মাংস খাওয়ার দিক থেকে একেবারে চ্যাম্পিয়ন। সবচেয়ে বেশি উৎপাদন করে ব্রাজিল কিন্তু বছরে মাথাপিছু ৫০ কেজি গরুর মাংস খেয়ে তালিকার শীর্ষে কোন দেশ? আপনি যা ভাবছেন, ঠিক তাই।

বিশ্বের সর্বোচ্চ মাথাপিছু গরুর মাংস ভোক্তা দেশগুলো মূলত দক্ষিণ আমেরিকায়। এই অঞ্চলে গরুর মাংস শুধু একটি খাবার নয়, এটি পরিবার, ঐতিহ্য ও জাতীয় পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখন বিশ্বকাপের কল্যাণে বিফ লাভার খেলোয়াড়দের গরুর মাংস খাওয়ার নানা তথ্য সামনে আসছে।

একজন আর্জেন্টাইন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ গড়ে ৫০ কেজির মতো গরুর মাংস খান

আসলে মেসি বা নেইমারের দেশে শুধু খেলোয়াড় বা অ্যাথলিট নয়, গরুর মাংস সবাই খায় বিশ্বের সবচেয়ে বেশি। আর সেদিক থেকে আর্জেন্টিনা আছে তালিকার শীর্ষে। বছরে একজন আর্জেন্টাইন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ গড়ে ৫০ কেজির মতো গরুর মাংস খান।

২০২৫ সালে মাথাপিছু গরুর মাংস খাওয়ার পরিমাণ (আনুমানিক)

আর্জেন্টিনা: বছরে ৪৭–৫০ কেজি

উরুগুয়ে: বছরে ৪৫–৪৮ কেজি

ব্রাজিল: বছরে ৩৬–৪০ কেজি

যুক্তরাষ্ট্র: বছরে ২৬–২৮ কেজি

অস্ট্রেলিয়া: বছরে ১৮–২২ কেজি

আর্জেন্টিনার সবচেয়ে জনপ্রিয় খাবারের ধরন হলো আসাদো (Asado)। এটি ঐতিহ্যবাহী বারবিকিউ

আর্জেন্টিনার মানুষ কীভাবে গরুর মাংস খায়?

আর্জেন্টিনার সবচেয়ে জনপ্রিয় খাবারের ধরন হলো আসাদো (Asado)। এটি ঐতিহ্যবাহী বারবিকিউ, যা সাধারণত সপ্তাহান্তে বা ছুটির দিনে পরিবার ও বন্ধুদের নিয়ে আয়োজন করা হয়। কাঠ বা কয়লার আগুনে ধীরে ধীরে বিভিন্ন অংশের গরুর মাংস গ্রিল করা হয়। আসাদো শুধু খাবার নয়, বরং একসঙ্গে সময় কাটানো ও আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার একটি সামাজিক অনুষ্ঠান।

জনপ্রিয় কিছু গরুর মাংসের কাট হলো—

বিফে দে চোরিজো : মোটা সারলয়েন স্টেক।

ওহো দে বিফে :রিবআই স্টেক।

ভাসিও : ফ্ল্যাঙ্ক স্টেক।

তিরা দে আসাদো : ছোট ছোট করে কাটা গরুর পাঁজর।

স্টেক খেতে পছন্দ করে আর্জেন্টাইনরা

মাতামব্রে: পাতলা মাংস, যা গ্রিল করা বা ভেতরে পুর দিয়ে রোল করে রান্না করা হয়।

এছাড়াও তারা পছন্দ করে—

মিলানেসা : ব্রেডক্রাম্ব মাখিয়ে ভাজা গরুর মাংস।

এম্পানাদা দে কার্নে : মশলাদার গরুর মাংস দিয়ে তৈরি পেস্ট্রি।

চোরিপান: গ্রিল করা সসেজের স্যান্ডউইচ, যা সাধারণত মূল বারবিকিউর আগে পরিবেশন করা হয়।

আর্জেন্টিনার মানুষের কাছে গরুর মাংসের গুরুত্ব

জাতীয় ঐতিহ্য: দেশের বিস্তীর্ণ পাম্পাস তৃণভূমি গবাদিপশু পালনকে আর্জেন্টিনার ইতিহাস ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত করেছে।

সামাজিক সংস্কৃতি: আসাদো এমন একটি আয়োজন, যেখানে পরিবার ও বন্ধুরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা একসঙ্গে খাওয়া, গল্প করা ও উদযাপন করে।

জাতীয় গর্ব: প্রাকৃতিক ঘাসে লালিত গরুর কারণে আর্জেন্টিনার গরুর মাংস বিশ্বজুড়ে উচ্চমানের হিসেবে পরিচিত।

দৈনন্দিন জীবনের অংশ: মূল্য বৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার পরিবর্তন এলেও গরুর মাংস এখনও অধিকাংশ পরিবারের নিয়মিত খাদ্যতালিকায় রয়েছে।

আর্জেন্টিনায় গরুর মাংস পরিবেশন মানে শুধু একটি খাবার নয়; এটি অতিথিপরায়ণতা, পারিবারিক বন্ধন, সামাজিক ঐক্য এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা একটি ঐতিহ্যকে ধরে রাখার প্রতীক।

এদিকে বিশ্বকাপের আরেক জনপ্রিয় দেশ ব্রাজিল বিশ্বের সবচেয়ে বেশি গরুর মাংস উৎপাদনকারী, রপ্তানিকারক। প্রতিবছর দেশটি ২.৯ মিলিয়ন মেট্রিক টনেরও বেশি গরুর মাংস রপ্তানি করে, যা ব্রাজিলকে বিশ্বের সর্ববৃহৎ রপ্তানিকারক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বিফের সবচেয়ে বড় উৎপাদনকারী দেশও ব্রাজিল।

বিশ্বকাপের আরেক জনপ্রিয় দেশ ব্রাজিল বিশ্বের সবচেয়ে বেশি গরুর মাংস উৎপাদনকারী

২০২৫ সালে ব্রাজিল কত গরুর মাংস উৎপাদন করেছে?

২০২৫ সালে ব্রাজিল প্রায় ১০.৫ থেকে ১১ মিলিয়ন মেট্রিক টন (কারকাস ওজন সমতুল্য) গরুর মাংস উৎপাদন করেছে বলে ইউএসডিএ এবং ব্রাজিলের কৃষি সংস্থাগুলোর অনুমান। এর ফলে দেশটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ উৎপাদনকারী হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছে।

একই বছরে ব্রাজিল ৩ মিলিয়ন মেট্রিক টনেরও বেশি গরুর মাংস রপ্তানি করে নতুন রেকর্ড গড়ে, যা বিশ্বের শীর্ষ রপ্তানিকারক হিসেবে তাদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করে।

ব্রাজিল এত বেশি গরুর মাংস উৎপাদন করে কেন?

এর পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে—

বিশাল ভূমি ও চারণভূমি: মাতো গ্রোসো, গোইয়াস, মাতো গ্রোসো দো সুল, পারা ও মিনাস জেরাইসসহ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে বিস্তীর্ণ চারণভূমি আছে।

অনুকূল আবহাওয়া: উষ্ণ জলবায়ু ও মৌসুমি বৃষ্টিপাতের কারণে বছরের বেশিরভাগ সময় গবাদিপশু খোলা মাঠে চরতে পারে।

বিশাল গবাদিপশুর সংখ্যা: ব্রাজিলে ২৩ কোটিরও বেশি গরু রয়েছে, যা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ গবাদিপশুর ভাণ্ডার।

ঘাসে লালিত গরু: ব্রাজিলের অধিকাংশ গরু প্রাকৃতিক ঘাসে বেড়ে ওঠে, ফলে উৎপাদন খরচ তুলনামূলকভাবে কম হয়।

উচ্চ আন্তর্জাতিক চাহিদা: চীন, যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত, চিলি ও ফিলিপাইনের মতো দেশগুলো বিপুল পরিমাণ ব্রাজিলীয় গরুর মাংস আমদানি করে।

আধুনিক মাংস শিল্প: জেবিএস (JBS), মারফ্রিগ (Marfrig) ও মিনার্ভা ফুডস (Minerva Foods)-এর মতো বড় প্রতিষ্ঠান উন্নত প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানি ব্যবস্থা পরিচালনা করে।

ব্রাজিলে ২৩ কোটিরও বেশি গরু আছে
গরুর মাংস ব্রাজিলের অর্থনীতির একটি বড় খাত

ব্রাজিলের জন্য গরুর মাংস এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?

গরুর মাংস ব্রাজিলের অর্থনীতির একটি বড় খাত। গবাদিপশু পালন, মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং রপ্তানি অবকাঠামোতে দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ, বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে শক্তিশালী চাহিদার কারণে ব্রাজিল আজ বিশ্বের শীর্ষ গরুর মাংস রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে।

সূত্র: ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউ, এপিএলএফ

ছবি: ইন্সটাগ্রাম