রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি পরীক্ষায় হলে প্রবেশের আগে জমা রাখা একটি আইফোন ১৩ হারিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের রাবি শাখার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে সংগঠনটি জানিয়েছে, তারা শুরু থেকেই ভুক্তভোগীকে সহযোগিতা করছে এবং ফোন উদ্ধারে পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে।

অভিযোগকারীর দাবি, গত ১৭ জানুয়ারি সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১২টার মধ্যে মোবাইল ফোনটি ছাত্রশিবিরের হেফাজত থেকে হারিয়ে যায়। তবে ঘটনার প্রায় পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও তিনি ফোনটি ফেরত পাননি। একই সঙ্গে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কোনো ক্ষতিপূরণও পাননি বলে অভিযোগ করেন।

অন্যদিকে, ছাত্রশিবিরের দাবি, ঘটনার পর থেকেই তারা ভুক্তভোগীকে সহযোগিতা করছে এবং পুলিশের মাধ্যমে ফোন উদ্ধারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি, বিষয়টিকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করারও অভিযোগ করেছে সংগঠনটি।

‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার’ নামে একটি ফেসবুক গ্রুপে অভিযোগকারী লিখেছেন, “আমার পরীক্ষার হলে মোবাইল ফোন নিয়ে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। তাই বাধ্য হয়ে ছাত্রশিবিরের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের কাছে আমার ফোনটি জমা রাখি। পরীক্ষা শেষে বের হয়ে যখন তাদের কাছে ফোনটি ফেরত চাই, তখন তারা জানায় যে ফোনটি হারিয়ে গেছে। এরপর তারা আমাকে নিয়ে থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে। কিন্তু জিডিতে সম্পূর্ণ দোষ আমার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে উল্লেখ করা হয় যে, ফোনটি আমার অজান্তে হারিয়ে গেছে।”

তিনি আরো লিখেছেন, “প্রথমে সংশ্লিষ্টরা ফোনটি খুঁজে পাওয়ার আশ্বাস দেন। পরে উদ্ধার সম্ভব না হলে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়। কিন্তু প্রায় পাঁচ মাস পার হলেও তিনি ফোন কিংবা কোনো ক্ষতিপূরণ পাননি। এছাড়া বিষয়টি নিয়ে ছাত্রশিবিরের একাধিক দায়িত্বশীলের সঙ্গে যোগাযোগ করেও কার্যকর কোনো সমাধান পাননি বলে অভিযোগ করেন।”

এ বিষয়ে শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি মুজাহিদ ফয়সাল বলেন, “এডমিশন হেল্প ক্যাম্প থেকে সাধারণত তথ্যসেবা, পানি, অভিভাবকদের বসার ব্যবস্থা এবং প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়ে থাকে। পাশাপাশি উপহার হিসেবে কলম ও চাবির রিং দেওয়া হয়েছিল। ফোন বা ব্যাগ রাখা আমাদের নির্ধারিত সেবার অংশ ছিল না। কিন্তু সেদিন হলে ফোন ও ব্যাগ নিয়ে ঢুকতে না দেওয়ায় পরীক্ষার্থীদের বারবার অনুরোধে বুথে কয়েকশ ফোন ও ব্যাগ রাখা হয়। শত শত পরীক্ষার্থী তাদের জিনিসপত্র ফেরত পেলেও প্রচণ্ড ভিড়ের মধ্যে একটি ফোন হারিয়ে যায়। এরপর ভুক্তভোগীকে নিয়ে প্রক্টর অফিসে যাওয়া হয় এবং প্রক্টরের পরামর্শে থানায় জিডি করা হয়।”

তিনি আরো বলেন, “জিডিতে ‘চুরি’ নয়, ‘হারিয়ে যাওয়া’ উল্লেখ করা হয়েছে, কারণ আইন অনুযায়ী চুরি লিখতে হলে মামলা করতে হয়। এরপর থেকে প্রক্টর অফিস ও ছাত্রশিবির নিয়মিত থানার সঙ্গে যোগাযোগ রেখে ফোন উদ্ধারের অগ্রগতি জানতে চেয়েছে। তার ভাষ্য, মোবাইল বা ল্যাপটপ উদ্ধারে অনেক সময় ছয় মাস থেকে এক বছরও লেগে যায়। কিন্তু ভুক্তভোগী সময় না দিয়ে বারবার ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন। সম্প্রতি পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা জানিয়েছে, উদ্ধারের চেষ্টা এখনো চলমান রয়েছে।”

একইসঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, “একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল নোংরা রাজনীতি করতে চাইছে। গণহারে পোস্ট দিয়ে তারা তাদের হলে অবৈধভাবে সিট দখলের ইস্যু আড়াল করার চেষ্টা করছে। আমরা আশাবাদী, পুলিশ প্রশাসন ও প্রক্টরিয়াল বডির প্রচেষ্টায় ভুক্তভোগীর ফোন উদ্ধার হবে এবং দায়ী ব্যক্তিকেও আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।”

শাখা ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি মেহেদী হাসান বলেন, “ভর্তি পরীক্ষার সময় তাদের বুথে কোনো ব্যাগ বা ব্যক্তিগত জিনিসপত্র রাখার নির্দেশনা ছিল না। সেখানে কেবল অভিভাবকদের বসার ব্যবস্থা এবং পরীক্ষার্থীদের জন্য বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা ছিল।”

তিনি আরো বলেন, “তবে ওই ছেলেটি অনেক অনুরোধ করায় তার ব্যাগটি রাখা হয়। আমরা টোকেন ছাড়া কখনো কোনো মোবাইল ফোন গ্রহণ করি না। পরে সে এসে দাবি করে, তার ফোনটি ব্যাগের ভেতরে ছিল। বিষয়টি জানার সঙ্গে সঙ্গেই বুথে দায়িত্বে থাকা সদস্যরা তাকে নিয়ে থানায় গিয়ে জিডি করেন। এরপর ওই শিক্ষার্থীর সঙ্গে আমার আর সরাসরি যোগাযোগ হয়নি।”

তবে অভিযোগকারী আবদুল্লাহর দাবি, সেখানে মোবাইল ফোন জমা রাখার ব্যবস্থাও ছিল এবং ফোন জমা দেওয়ার পর তিনি একটি টোকেন পেয়েছিলেন। তার ভাষ্য, “পরীক্ষা শেষে আমি টোকেন দেওয়ার পর তারা ১০–১৫ মিনিট অপেক্ষা করিয়ে জানায়, ‘ভাই, ফোন তো মিসিং। ফোন পাওয়া যাচ্ছে না।’ এরপর আমার টোকেনটিও আর ফেরত দেওয়া হয়নি। আমি কোনো ব্যাগ জমা দিইনি, শুধু মোবাইল ফোনটি জমা দিয়েছিলাম। পরে বিজয়-২৪ হলের ভিপি ভাইসহ আরেকজন আমাকে প্রক্টর অফিসে নিয়ে যান। প্রক্টরের পরামর্শে থানায় গিয়ে জিডি করি। কিন্তু জিডিতে এমনভাবে লেখা হয়, যেন ফোনটি আমার অজান্তে হারিয়ে গেছে। অথচ ফোনটি তাদের দায়িত্বে থাকা অবস্থায় হারিয়েছিল।”

আবদুল্লাহ আরো বলেন, “সেদিন রাতেই তিনি সালাহউদ্দিন আম্মারের সঙ্গে দেখা করেন। প্রক্টর তাকে বিষয়টি সমাধানের ব্যবস্থা করতে বলেছিলেন। প্রথমে সাত দিন, পরে আরো তিন মাস সময় চাওয়া হয়। তিন মাস পর আবার যোগাযোগ করলে সালাহউদ্দিন আম্মার তাকে বলেন, ‘আমি শিবিরের কেউ নই, আমি স্বতন্ত্র। আপনি শিবিরের দায়িত্বশীলদের সঙ্গে কথা বলুন।’ এরপর তিনি শাখা ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি মেহেদী হাসানের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি ‘আচ্ছা, দেখতেছি’ বলে আর কোনো সাড়া দেননি।”

সবশেষে আবদুল্লাহ জানান, তিনি শাখা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (রাকসু) সভাপতি (ভিপি) জাহিদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, “আমি বিশ্ববিদ্যালয় শিবিরের কেউ নই, আমি কিছু করতে পারব না।” পরে তিনি শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি মুজাহিদ ফয়সালের সঙ্গেও যোগাযোগ করেন বলে জানান। মুজাহিদ জিডির কাগজ নিলেও এরপর আর কোনো যোগাযোগ করেননি এমনটাই দাবি করেন অভিযোগকারী ।