দেশের বর্তমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা এবং মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে রাখার লক্ষ্যে সরকারি ব্যয়ে বড় ধরনের কাটছাঁট শুরু করেছে সরকার। এর অংশ হিসাবে প্রাধিকারপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাদের সুদমুক্ত বিশেষ ঋণের বিপরীতে কেনা গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ ও জ্বালানি ভাতা ৫০ শতাংশ হ্রাস করা হতে পারে। এ নির্দেশনা কার্যকর হলে কর্মকর্তারা এই খাতে মাসিক ৫০ হাজার টাকার পরিবর্তে ২৫ হাজার টাকা প্রাপ্য হবেন।

সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের বাজেট অনুবিভাগ-১ (শাখা-১) থেকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবকে লেখা এক চিঠিতে এ তথ্য জানানো হয়।

সরকারের উপ-সচিব মোহাম্মদ জাকির হোসেন স্বাক্ষরিত এ সংক্রান্ত একটি চিঠি ইতোমধ্যে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সব গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে পাঠানো হয়েছে। ওই চিঠিতে জানানো হয়, সীমিত সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা, মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসা এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার লক্ষ্যে প্রাধিকারপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তারা যারা সুদমুক্ত ঋণ গ্রহণের পর গাড়ি সেবা নগদায়নের আওতায় মোটর রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় হিসাবে আর্থিক সহায়তা পাচ্ছেন, তা কিছুটা হ্রাস করার সুযোগ রয়েছে। এ প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মোটরযান রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় মাসিক ৫০ হাজার টাকার পরিবর্তে ২৫ হাজার টাকা হারে নির্ধারণের বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার প্রেক্ষিতে মোটরযান রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় সংকোচন বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষাপূর্বক প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।

এদিকে এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাবেক এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় ২৫ হাজার টাকায় গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ করা বাস্তবসম্মত নয়। তবে অনেকে সুদমুক্ত গাড়ির ঋণ অন্য খাতে বিনিয়োগ করে বাড়তি টাকাও আয় করেন। আবার অনেকে গাড়ি নিয়ে ভাড়া দিয়েছেন, অথচ সরকারি টাকাও নেন। এসব বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া বেশি জরুরি। এখানে কিছু ফাঁকি আছে।

এ বিষয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এ ধরনের কৃচ্ছ্রসাধন নীতি অত্যন্ত ইতিবাচক এবং সময়োপযোগী। আমলাতন্ত্র ও সরকারি উচ্চপর্যায়ের ব্যয়ে লাগাম টানার এই বার্তাটি প্রশাসনিক জবাবদিহিতার জন্য জরুরি ছিল। তবে মনে রাখতে হবে, শুধু গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ ভাতা অর্ধেক করাই সংকটের স্থায়ী সমাধান নয়। আমাদের মূল সমস্যা হলো বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা, অতিরিক্ত ব্যয় এবং বড় বড় মেগা প্রকল্পের অপচয়। প্রকৃত সুফল পেতে হলে উন্নয়ন খাতের এই বড় অপচয়গুলো কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে এবং একই সঙ্গে কর ফাঁকি রোধ করতে হবে।

উল্লেখ্য, আর্থিক চাপ কমাতে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরেও ব্যয় সংকোচন নীতিমালা গ্রহণ করেছে সরকার। কৃচ্ছ্রসাধনের অংশ হিসাবে সম্প্রতি নতুন অর্থবছরের পরিচালন ও উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়নে কঠোর ব্যয় নিয়ন্ত্রণের নির্দেশনা দিয়ে জরুরি পরিপত্র জারি করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ। এতে নতুন গাড়ি কেনা, বিদেশ সফর, ভূমি অধিগ্রহণ এবং নতুন ভবন নির্মাণসহ বেশ কয়েকটি খাতে ব্যয় সীমিত বা স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ওই পরিপত্রে বলা হয়েছে, চলতি অর্থবছরে সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, রাষ্ট্রায়ত্ত, পাবলিক সেক্টর করপোরেশন ও রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানিগুলোর পরিচালন ও উন্নয়ন বাজেটের বিভিন্ন খাতে বরাদ্দ ব্যয়ের ক্ষেত্রে নতুন বিধিনিষেধ কার্যকর হবে।