রংপুরে সপরিবারে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী হত্যাকাণ্ড নিয়ে পুলিশের বয়ানে অসংগতি ও নানান প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। এ নিয়ে দ্বিতীয় দফায় সংবাদ সম্মেলন ডাকেন রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ। দুই আসামির জবানবন্দির বরাতে তিনি হত্যাকাণ্ডের নতুন বর্ণনা দেন। এ সময় পুলিশের বয়ানে অসংগতি ও তদন্ত নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের কোনো জবাব না দিয়েই সটকে পড়েন কমিশনার। তাঁর এমন আচরণে উপস্থিত সাংবাদিকেরা অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
আজ বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনারের কার্যালয়ে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। কমিশনার বলেন, আসামিদের জবানবন্দিতে কিছু নতুন তথ্য এসেছে। ঘটনার দিন সকালে গণপতি চক্রবর্তী ছাদে হাটতে যান। সেখানে আসামি সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধকে দেখে তিনি ধমক দেন। পরে আত্মসম্মানের ভয়ে গলায় গামছা পেঁচিয়ে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ গণপতিকে হত্যা করেন। তাঁর স্ত্রী-মেয়েকে বাড়ির ছাদেই হত্যা করা হয়। পরে মরদেহ টেনে সিঁড়ির দিকে নেওয়া হয়।
এর আগে গত রোববার পুলিশ কমিশনার জানিয়েছিলেন, ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় গণপতি ও তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যা করেন সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ দাস। তাঁরা পাশের বাড়ি থেকে গণপতির বাড়ির ছাদে গিয়ে ইয়াবা সেবন করছিলেন বলেও জানিয়েছিল পুলিশ। পুলিশের ওই বয়ান নিয়ে বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা, পাশের বাড়ির ছাদ ব্যবহার এবং হত্যার পর আবার ইয়াবা সেবনের মতো বিষয় নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
আজ সংবাদ সম্মেলনে কমিশনার বলেন, আসামিরা পানির ট্যাংকের আড়ালে বসে ইয়াবা সেবন করছিলেন। পরে গণপতি তাঁদের দেখে ফেললে তাঁকে গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করা হয়। শব্দ শুনে মা-মেয়ে ছাদে এলে তাদেরও হত্যা করা হয়। পরে সিসিটিভিতে ধরা পড়ার আশঙ্কায় বাড়ির বিদ্যুতের তার কেটে দেওয়া হয়।
গণপতির শিশু ছেলে প্রিয়মকে হত্যার বর্ণনাতেও নতুন তথ্য দিয়েছেন কমিশনার। তিনি বলেন, প্রিয়ম ঘুম থেকে উঠে সিদ্ধার্থকে দেখে প্রশ্ন করেছিল, ‘সিদ্ধার্থ দাদা, তুমি এখানে কেন?’ এরপর তাকে হত্যা করা হয়। যদিও রোববারের বক্তব্যে পুলিশ বলেছিল, ঘুমন্ত অবস্থায় শিশু প্রিয়মকে হত্যা করা হয়।
সব মিলিয়ে পুলিশের বয়ানে হত্যার সময়, ধরন, আলামত, শিশুটিকে হত্যার পরিস্থিতি এবং ঘটনাস্থলের বিদ্যুৎ-সংযোগ নিয়ে একাধিক প্রশ্নের জন্ম হয়। তবে সংবাদ সম্মেলন ডেকে কমিশনার সাংবাদিকদের প্রশ্নের কোনো জবাব না দেওয়ায় অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে।
সময় টিভির রংপুর ব্যুরো প্রধান নাজমুল ইসলাম নিশাত বলেন, ‘সংবাদ সম্মেলনের রেওয়াজ হলো, আয়োজকের বক্তব্য শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া। কিন্তু আজ কমিশনার বক্তব্য শেষে সাংবাদিকেরা প্রশ্ন করতেই আনুষ্ঠানিকভাবে সংবাদ সম্মেলন শেষ না করেই ওঠে চলে যান। প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে চলে যাওয়ায় পুলিশের দায়বদ্ধতার জায়গাটি শূন্য হয়ে গেছে। বিষয়টি সাংবাদিকদের জন্যও অস্বস্তিকর।’
দ্য ডেইলি স্টারের রংপুর আঞ্চলিক প্রতিনিধি এস দিলীপ রায় বলেন, ‘এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডে তথ্যের গড় মিল রয়েছে। পুলিশ আগে যে তথ্য দিয়েছিল বাস্তবে মাঠের তথ্যের সঙ্গে মিল খুঁজে পাচ্ছি না। তাই কিছু প্রশ্ন তৈরি করেছিলাম, অনেক সাংবাদিকই প্রশ্ন তৈরি করেছেন। কিন্তু কমিশনার উত্তর না দিয়েই চলে গেলেন। এতে হত্যাকাণ্ড নিয়ে আরও ধূম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে। সাংবাদিকদের সঙ্গ অনেকটা তামাশাই করলেন কমিশনার।’








