স্পেনের উত্তর আফ্রিকান ভূখণ্ড সেউতায় মরক্কো থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রবেশের ঘটনা ইউরোপে অভিবাসন ও সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।

ঘটনাটি নিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক মহলে কঠোর সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের দাবি উঠলেও, সেউতার এই ঘটনাকে সরাসরি ধর্মীয় কোনো সংকট হিসেবে দেখার বিষয়ে সতর্ক থাকার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা।

সেউতায় সাম্প্রতিক সীমান্ত পরিস্থিতিতে মরক্কো থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রবেশের চেষ্টা করেন। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক হিসাবে সংখ্যাটি প্রায় ৬০ হাজার হলেও পরবর্তী বিভিন্ন প্রতিবেদনে এ সংখ্যা আরও বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

রয়টার্সের ৭ আগস্টের প্রতিবেদনে সেউতায় প্রবেশকারীর সংখ্যা প্রায় ৭২ হাজার বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একই ঘটনায় বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে; সেউতার প্রেসিডেন্ট পরবর্তীতে মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ১০০ বলে জানিয়েছেন।

বিপুলসংখ্যক মানুষের হঠাৎ আগমনে ছোট এই ভূখণ্ডে খাদ্য, আশ্রয়, চিকিৎসা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়।

আরও পড়ুন

অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে লিবিয়ায় ‘সামুদ্রিক উদ্ধার কেন্দ্র’ করবে ইইউ

ঘটনার পর স্পেন সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ জোরদার করে। অনেক প্রাপ্তবয়স্ক অভিবাসী পরে মরক্কোতে ফিরে গেলেও শিশু ও কিশোরসহ কিছু মানুষ সেউতায় থেকে যায়। এ পরিস্থিতিতে অপ্রাপ্তবয়স্কদের শনাক্তকরণ ও প্রত্যাবাসন নিয়েও স্পেন ও মরক্কোর মধ্যে আলোচনা হয়েছে।

ইউরোপে মুসলিম জনসংখ্যা গত এক দশকে বেড়েছে—এটি পরিসংখ্যানভিত্তিক তথ্য। ২০২৫ সালের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ইউরোপে মুসলিম জনসংখ্যা ১৬ শতাংশ বেড়ে প্রায় ৪ কোটি ৬০ লাখে পৌঁছায়।

তবে মোট জনসংখ্যার অনুপাতে এই বৃদ্ধি ছিল এক শতাংশেরও কম; ২০২০ সালে ইউরোপের প্রায় ৬ শতাংশ মানুষ মুসলিম ছিলেন। গবেষণাটিতে আরও বলা হয়েছে, এই বৃদ্ধির বড় একটি অংশ অভিবাসনের সঙ্গে সম্পর্কিত, বিশেষ করে সিরিয়াসহ মুসলিম-অধ্যুষিত দেশগুলো থেকে ইউরোপে আসা মানুষের কারণে।

এই জনমিতিক পরিবর্তন ইউরোপের অভিবাসন ও পরিচয় রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে ডানপন্থি ও কট্টর ডানপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোর একটি অংশ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং ইউরোপীয় সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষার আলোচনায় মুসলিম অভিবাসনকে গুরুত্ব দিয়ে থাকে। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের বিভিন্ন নথিতেও ইউরোপে ডানপন্থি রাজনৈতিক শক্তির উত্থান এবং তাদের অভিবাসন ও একীভূতকরণ নীতিকে কঠোর করার দাবির বিষয়টি উঠে এসেছে।

তবে মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং ইসলামপন্থি উগ্রবাদকে এক বিষয় হিসেবে দেখা ঠিক নয়। ইউরোপে বসবাসকারী মুসলিমদের বিপুল অংশ সাধারণ নাগরিক, কর্মজীবী, শিক্ষার্থী বা দীর্ঘদিনের বাসিন্দা।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের মৌলিক অধিকার সংস্থা ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদনে ১৩টি দেশে প্রায় ১০ হাজার মুসলিমের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে জানিয়েছে, মুসলিমদের একটি বড় অংশ ধর্ম, ত্বকের রং বা জাতিগত পরিচয়ের কারণে বৈষম্য ও হয়রানির মুখোমুখি হচ্ছেন।

অন্যদিকে, কিছু ইউরোপীয় রাজনৈতিক গোষ্ঠী মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অভিবাসন এবং ইসলামপন্থি রাজনৈতিক মতাদর্শ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। ইউরোপীয় পার্লামেন্টে ২০২০ সালে দাখিল করা একটি প্রশ্নেও মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও কিছু উগ্র ইসলামপন্থি গোষ্ঠীর বিস্তার নিয়ে উদ্বেগের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।

তবে এটি ছিল একজন ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্যের রাজনৈতিক প্রশ্ন; এটিকে ইউরোপের সব দেশের অভিন্ন অবস্থান হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।

ফলে সেউতা সংকটের প্রেক্ষাপটে মুসলিম জনসংখ্যার বিষয়টি আলোচনায় এলেও দুটি বিষয় আলাদা করে দেখা জরুরি: একদিকে অনিয়মিত অভিবাসন ও সীমান্ত নিরাপত্তার প্রশ্ন, অন্যদিকে ইউরোপের দীর্ঘমেয়াদি জনমিতিক পরিবর্তন। এই দুই বিষয়কে সরাসরি এক করে দেখলে বাস্তব পরিস্থিতির চেয়ে রাজনৈতিক ব্যাখ্যাই বেশি গুরুত্ব পেতে পারে।

মরক্কো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হওয়ায় সেউতার ঘটনায় অভিবাসন ও ধর্মীয় পরিচয়ের বিষয়টি রাজনৈতিক আলোচনায় এসেছে। ইউরোপের কয়েকটি ডানপন্থি দল অনিয়মিত অভিবাসনের সঙ্গে মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়টি যুক্ত করে কঠোর অভিবাসন নীতির দাবি করছে।

তবে অনিয়মিত অভিবাসন এবং মুসলিম পরিচয়কে এক করে দেখার সুযোগ নেই। ইউরোপের মুসলিম জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ বহু বছর ধরে সেখানে বসবাস করছেন, অনেকে ওই দেশগুলোর নাগরিক এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ বৈধভাবে কাজ ও ব্যবসা করছেন। ফলে কোনো সীমান্ত সংকটের দায় পুরো একটি ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর ওপর চাপানো তথ্যভিত্তিক হবে না।

সেউতার ঘটনাতেও যারা মরক্কো থেকে প্রবেশের চেষ্টা করেছেন, তাদের প্রত্যেকের ধর্মীয় পরিচয় সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশিত হয়নি। তাই ঘটনাটিকে সরাসরি ‘ইসলামায়ন’ হিসেবে চিহ্নিত করার বদলে অনিয়মিত অভিবাসন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও মানবপাচারের দিকগুলো আলাদাভাবে দেখা জরুরি।

ইউরোপের বিভিন্ন দেশে মুসলিম জনসংখ্যা গত কয়েক দশকে বেড়েছে। তবে দেশভেদে হিসাবের পদ্ধতি আলাদা হওয়ায় সংখ্যাগুলো তুলনা করার সময় সতর্কতা প্রয়োজন।

ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের ২০২১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, প্রায় ৩৯ লাখ মানুষ নিজেদের মুসলিম হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন, যা মোট জনসংখ্যার ৬.৫ শতাংশ। জার্মানিতে মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ৫৫ থেকে ৫৬ লাখ, যা মোট জনসংখ্যার আনুমানিক ৬ থেকে ৭ শতাংশের কাছাকাছি।

ফ্রান্সে ধর্মীয় পরিচয়ের তথ্য সরকারি আদমশুমারিতে নিয়মিতভাবে সংগ্রহ করা হয় না। বিভিন্ন গবেষণা ও জরিপে দেশটির মুসলিম জনসংখ্যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮ থেকে ১০ শতাংশ বলে অনুমান করা হয়।

স্পেন ও ইতালিতে মুসলিম জনসংখ্যা আনুমানিক ৪ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। নেদারল্যান্ডস ও বেলজিয়ামেও উল্লেখযোগ্য মুসলিম জনগোষ্ঠী রয়েছে। সুইডেনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন গবেষণা ও সংজ্ঞা অনুযায়ী হিসাবের মধ্যে পার্থক্য দেখা যায়।

এই পরিসংখ্যানগুলো থেকে ইউরোপের মুসলিম জনসংখ্যার একটি সামগ্রিক ধারণা পাওয়া গেলেও এগুলোকে সরাসরি অনিয়মিত অভিবাসনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা ঠিক নয়। কারণ মুসলিম জনসংখ্যার মধ্যে স্থানীয় নাগরিক, দ্বিতীয় বা তৃতীয় প্রজন্মের পরিবার এবং বৈধ অভিবাসী—সবাই রয়েছেন।

সেউতার ঘটনা ইউরোপের অভিবাসন নীতির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশ সীমান্ত সুরক্ষা বাড়ানোর পাশাপাশি মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছে।

স্পেনও মানবপাচার ও অনিয়মিতভাবে মানুষ ইউরোপে প্রবেশ করানোর সঙ্গে জড়িত চক্রগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছে। ইউরোপীয় পর্যায়েও মরক্কোর মতো গুরুত্বপূর্ণ উৎস ও ট্রানজিট দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

অন্যদিকে মানবাধিকার সংগঠনগুলো মনে করিয়ে দিচ্ছে, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি আশ্রয়প্রার্থীদের অধিকার, শিশুদের সুরক্ষা এবং বিপজ্জনক সমুদ্রপথে মানুষের প্রাণহানি ঠেকানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পেতে হবে।

সেউতার ঘটনা ইউরোপের সামনে একটি কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরেছে। একদিকে রাষ্ট্রগুলোর সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ও অনিয়মিত প্রবেশ ঠেকানোর অধিকার রয়েছে। অন্যদিকে সাগরপথে বিপজ্জনক যাত্রা করা মানুষের জীবন রক্ষা এবং আশ্রয়প্রার্থীদের মানবিক অধিকার নিশ্চিত করাও জরুরি।

এ কারণে সেউতার ঘটনাকে শুধু অভিবাসন সংকট কিংবা শুধু ধর্মীয় পরিবর্তনের প্রশ্ন হিসেবে দেখলে পুরো পরিস্থিতি বোঝা কঠিন হবে। এর সঙ্গে সীমান্ত নিরাপত্তা, মানবপাচার, ইউরোপের শ্রমবাজার, জনমিতিক পরিবর্তন এবং শরণার্থী সুরক্ষার মতো একাধিক বিষয় জড়িত।

মুসলিম জনসংখ্যা নিয়ে ইউরোপে রাজনৈতিক বিতর্ক থাকতেই পারে। কিন্তু একটি ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর সামগ্রিক উপস্থিতিকে অনিয়মিত অভিবাসন বা নিরাপত্তা ঝুঁকির সমার্থক হিসেবে দেখলে বিষয়টি যেমন বিভ্রান্তিকর হয়, তেমনি ইউরোপের অভিবাসন সমস্যার প্রকৃত কারণগুলোও আড়ালে পড়ে যায়।

সেউতার সাম্প্রতিক পরিস্থিতি তাই ইউরোপের জন্য শুধু একটি সীমান্ত সংকট নয়; এটি অভিবাসন নীতি, মানবিক দায়িত্ব এবং রাজনৈতিক মেরুকরণের মধ্যে ভারসাম্য খোঁজারও একটি বড় পরীক্ষা।

এমআরএম