ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) শিক্ষার্থী সাজিদ আব্দুল্লাহ হত্যাকাণ্ডের এক বছর পেরিয়ে গেলেও মামলার তদন্তে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমান। তিনি দ্রুত তদন্ত শেষ করে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে সিআইডির প্রতি তাগিদ দিয়েছেন।

এদিকে তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন হলেও মামলার রহস্য উদ্ঘাটন না হওয়ায় বিচারহীনতার আশঙ্কা থেকে ক্ষোভ জানিয়েছেন সাজিদের পরিবার ও শিক্ষার্থীরা। তারা দ্রুত খুনিদের শনাক্ত করে বিচার নিশ্চিতের দাবি জানান।

জানা যায়, গত বছরের ১৭ জুলাই বিকেল পৌনে ৫টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহ আজিজুর রহমান হলের সামনের পুকুর থেকে সাজিদ আব্দুল্লাহর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে ৩ আগস্ট ভিসেরা রিপোর্টে সাজিদকে শ্বাসরোধ করে হত্যার বিষয়টি উঠে আসে। রিপোর্টে তার মৃত্যুর সময় ছিল পোস্টমর্টেমের অন্তত ৩০ ঘণ্টা আগে অর্থাৎ ১৬ জুলাই দিনগত রাত আনুমানিক সাড়ে ৩টায়।

পরদিন ৪ আগস্ট সাজিদের বাবা আহসান হাবিবুল্লাহ অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে ইবি থানায় হত্যা মামলা দায়ের করে। পরে মামলাটি পরিবারের দাবির প্রেক্ষিতে ইবি থানার পুলিশ থেকে সিআইডিতে হস্তান্তর করা হয়।

সিআইডির তদন্তেও এ মামলার কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় ক্যাম্পাসে একের পর এক বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচিতে উত্তাল হয়ে ওঠে। বিচার দাবিতে দফায় দফায় আন্দোলন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা। পরে বাধ্য হয়ে তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সিআইডিকে দিয়ে কিছুদিন পরপর ছাত্র নেতৃবৃন্দ ও সাংবাদিকদের সামনে মামলার অগ্রগতি নিয়ে ব্রিফিং করাতো।

কিন্তু প্রায় ১০ মাস সিআইডি মামলার তদন্তকাজ করেও শিক্ষার্থীদের আশাব্যঞ্জক কোনো ফল দিতে পারেনি। গত কয়েকমাস ধরে সিআইডির ব্রিফিংও বন্ধ রয়েছে। এভাবেই দীর্ঘ ১০ মাস পেরোলেও সাজিদ হত্যার কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় সাজিদের বাবার আবেদনে গত মে মাসে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সাইফুল ইসলামকে পাল্টে মহব্বত হোসেনকে দেওয়া হয়েছে।

এদিকে সাজিদ হত্যাকাণ্ড নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে রয়েছে নানান অমিমাংসিত প্রশ্ন। সেগুলো হলো— হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার সময় হলে সিসিটিভি ক্যামেরা না থাকা, অন্যান্য এলাকার সিসিটিভি ফুটেজের গরমিল, হত্যাকাণ্ডের রাতে সাজিদের রুম সিলগালার পরও এক কর্মকর্তার রুমে প্রবেশ, হলে নতুন করে সিসিটিভি ক্যামেরা লাগালে প্রভোস্টের বিনা অনুমতিতে এক কর্মকর্তার মোবাইলে এক্সেস নিয়ে ফুটেজ ডিলিট, হত্যাকাণ্ডের রাতে মেইন গেট দিয়ে ভ্যানে শোয়ানো এক ব্যক্তিসহ চারজনের প্রবেশ, সাজিদের মৃত্যুর পরও কয়েকবার তার মোবাইলে কল রিসিভ হওয়া, সিআইডি ৮ মাস ধরে সাজিদের মোবাইল ফোনের লক খুলতে না পারা এবং সাজিদের কাছের বন্ধু ইনসানের ফোন ক্লোনের ঘটনা।

এসব প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে না পারায় বিষয়টিকে তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দুর্বলতা এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত সিআইডি কর্মকর্তাদের উদাসীনতা হিসেবেই দেখছেন শিক্ষার্থীরা।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মুহিব্বুল্লাহ নোমান বলেন, সাজিদ আমার বন্ধু ছিল। বিচারহীনতার নিকৃষ্টতম উদাহরণ সাজিদের হত্যাকাণ্ড। অথচ ৫ই আগস্টের পর ভেবেছিলাম এই সংস্কৃতি বদলে যাবে। কিন্তু ১ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনও হত্যার বিচার হওয়া তো দূরে থাক, খুনিরা পর্যন্ত চিহ্নিত হয়নি। এটা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও সিআইডির চরম গাফিলতি ছাড়া আর কিছু না। এই বিচারহীনতার দৃষ্টান্ত আমাদেরকে প্রতিনিয়ত বিষিয়ে তুলছে। আমরা নিজেরাও এখন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। ঠিক কবে আমরা এই হত্যাকাণ্ডের বিচার পাব আমরা? ঠিক কবে?

সাজিদের পিতা আহসান হাবিবুল্লাহ বলেন, আমার ছেলের হত্যাকাণ্ডের বিচারের কোনো অগ্রগতি নাই। এক বছর পূর্তি হয়েছে, আজ পর্যন্ত বিচার পেলাম না। সিআইডির সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ আছে। কিন্তু কোনো আপডেট খবর পাই না। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই। আমার কাছে সিআইডি, পুলিশ প্রশাসন এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সবারই গাফিলতি মনে হচ্ছে। আগামী রোববারে আমি একটা সংবাদ সম্মেলন করব।

মামলার দায়িত্বপ্রাপ্ত সিআইডি ইন্সপেক্টর মহব্বত হোসেন বলেন, তদন্তের দায়িত্ব পেয়ে গত দুই মাসে প্রাথমিকভাবে ডকেট পর্যালোচনা করছি। কিছু সাক্ষীকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। আমি ইতোমধ্যে ঘটনাস্থলে তিনবার গিয়েছি। একবার সরাসরি এবং বাকি দুবার গোপনে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। আমরা তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছি। তবে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়ার মতো পর্যায়ে এখনও আমরা পৌঁছাতে পারিনি। আরও সময় প্রয়োজন। একটা রেজাল্ট অবশ্যই আসবে, তবে একটু দেরি হবে। এটাকে আমাদের গাফিলতি বলা হলে, সেটা জোরপূর্বক বলা হবে। আমরা সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সঙ্গে চেষ্টা চালাচ্ছি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমান বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই আমি প্রতিনিয়ত সিআইডির সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। তাদেরকে দ্রুত তদন্ত শেষ করে রিপোর্ট প্রদান করার জন্য তাগিদ দিয়েছি। হত্যাকারীরা যাতে দ্রুত সময়ের মধ্যে চিহ্নিত হয় এবং তাদের যথাযথ শাস্তি যেন নিশ্চিত হয় সে ব্যাপারে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।

তিনি বলেন, ইতোমধ্যে শিক্ষিকা রুনা হত্যাকাণ্ডের অধিকতর তদন্তের জন্য উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটিও গঠন করেছি ৷ প্রয়োজনে সাজিদ হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারেও এমন কমিটি গঠন করব।

ইরফান উল্লাহ/কেএইচকে/জেআইএম