দুপুর ঠিক পৌনে একটা। পুরানা পল্টনের মোড়ে ট্রাফিক সিগনালে আটকে থাকা রিকশার হাতল ধরে হাঁপাচ্ছিলেন ৪২ বছর বয়সী আবুল কাসেম। কপালে জমে থাকা ঘাম গামছা দিয়ে মুছে নিয়ে আকাশের দিকে তাকালেন।জুলাইয়ের চড়া রোদ আর বাতাসে অস্বাভাবিক আর্দ্রতা মিলে যেন এক নারকীয় পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ডিজিটাল থার্মোমিটারে ঢাকার তাপমাত্রা তখন ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কিন্তু বাতাসে অতিরিক্ত জলীয় বাষ্পের কারণে ‘অনুভূত তাপমাত্রা’ বা ‘হিট ইনডেক্স’ ৪৪ ডিগ্রি ছাড়িয়ে গেছে।কাসেম মিয়া বললেন, “বাবা, রিকশা চালানো তো দূরের কথা, এই গরমে শ্বাস নেওয়াই কঠিন হয়ে যায়। দুই ক্ষ্যাপ মারলেই মাথা ঘোরে। আগে দিনে সাত-আটশো টাকা কামাইতাম, এখন এই গরমে শরীর সায় দেয় না। দুপুরে গ্যারেজে গিয়ে শুয়ে থাকি। আয় অর্ধেক হয়ে গেছে।”ঠিক বাংলাদেশ সময় যখন দুপুর একটা, যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন শহরের তাপমাত্রা তখন আরামদায়ক ১৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সেখানকার এক বিশ্ববিদ্যালয়ের শীতাতপনিয়ন্ত্রিত গবেষণাগারে বসে কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের জটিল সমীকরণ মেলাচ্ছেন অধ্যাপক উইলিয়াম স্মিথ। কাসেম মিয়ার মতো তীব্র ঘাম বা হিটস্ট্রোকের ভয় তাকে তাড়া করছে না। কাসেম মিয়া লড়ছেন আজকের দিনের ভাতের জন্য। আর স্মিথ লড়ছেন আগামী দশকের প্রযুক্তির রূপরেখা আঁকতে।গ্রীষ্মকালে মাটি চৌচিরআবুল কাসেম আর উইলিয়াম স্মিথের এই যাপিত জীবনের ব্যবধান কেবল দুই ব্যক্তির গল্প নয়; এটি আসলে বিশ্বের উত্তর আর দক্ষিণ গোলার্ধের এক নির্মম বাস্তবতার প্রতিফলন।বিশ্বের মানচিত্রের দিকে তাকালে একটি অদ্ভুত ও অস্বস্তিকর প্যাটার্ন চোখ এড়ায় না। পৃথিবীর যত ধনী ও বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতে উন্নত দেশ, তার প্রায় সবই নাতিশীতোষ্ণ বা শীতপ্রধান অঞ্চলে অবস্থিত।অন্যদিকে, আফ্রিকার সাহারা-নিম্ন অঞ্চল, দক্ষিণ এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার মতো গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বা গরমের দেশগুলো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে দারিদ্র্য, রোগবালাই আর অনগ্রসরতার বৃত্তে বন্দি।এই ভৌগোলিক বিভাজন কি স্রেফ কাকতালীয়, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে জলবায়ু, ইতিহাস, মানুষের কর্মক্ষমতা ও অর্থনীতির এক গভীর রহস্য? বিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ ও ইতিহাসবিদেরা যুগ যুগ ধরে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন।তথ্য-উপাত্তের কঠিন সত্য বিশ্বব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পৃথিবীর ৩০টি সবচেয়ে ধনী দেশের মধ্যে ২৫টিই অবস্থিত শীতপ্রধান বা নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে। বিপরীতে, পৃথিবীর সবচেয়ে দরিদ্র ৩০টি দেশের প্রায় সবকটিই চরম ভাবাপন্ন গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বা উপ-গ্রীষ্মমণ্ডলীয় জলবায়ুর অন্তর্গত।তাকানো যাক বিজ্ঞান ও গবেষণার সূচকের দিকেও। ১৯০১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিজ্ঞানে (পদার্থ, রসায়ন ও চিকিৎসাবিজ্ঞান) যত নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে, তার প্রায় ৯৫ শতাংশই গেছে উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের শীতপ্রধান দেশগুলোতে। বিশ্বের মোট গবেষণা ও উন্নয়ন ব্যয়ের ৮৮ শতাংশেরও বেশি খরচ হয় এই শীতল অঞ্চলের দেশগুলোতে। আর বিশ্বের প্রায় ২০০ কোটি মানুষ, যারা চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করেন, তাদের সিংহভাগের ঠিকানা এই উষ্ণমণ্ডল।রোগের অদৃশ্য শৃঙ্খল হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ জেফ্রি স্যাক্স তার একাধিক গবেষণায় দেখিয়েছেন, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলের দারিদ্র্যের অন্যতম প্রধান অনুঘটক হলো এখানকার তীব্র ‘রোগের বোঝা’। উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়া মশার মতো ভেক্টর বা রোগবাহক পতঙ্গ এবং বিভিন্ন পরজীবী ব্যাকটেরিয়া-ভাইরাসের বংশবৃদ্ধির জন্য স্বর্গরাজ্য।শীতের দেশে আরামদায়ক আবহাওয়াআজকের ঢাকার বাস্তবতাই ধরা যাক। বৃহস্পতিবারের (১৬ জুলাই) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বুলেটিন বলছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৩০৯ জন। এ বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে প্রাণ গেছে ৩২ জনের। এই যে প্রতি বছর বর্ষা আর গরমে ডেঙ্গুর এই তাণ্ডব, এটি কি কোনো শীতল দেশের মানুষকে পোহাতে হয়?ইউরোপ বা উত্তর আমেরিকায় মাইনাস তাপমাত্রার শীতকাল প্রাকৃতিকভাবেই এই জীবাণু এবং মশার লার্ভা ধ্বংস করে দেয়। ফলে সেখানে রোগব্যাধির প্রকোপ কম।মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশিষ্ট উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ জেফ্রি স্যাক্সের মতে, “যে দেশে ম্যালেরিয়া বা ডেঙ্গুর মতো মহামারি নিয়মিত হানা দেয়, সেই দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি স্বাভাবিকের চেয়ে প্রতি বছর ১.৩ শতাংশ কম হয়।” একটি শিশু যদি শৈশবে বারবার ডেঙ্গু, টাইফয়েড বা পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়, তবে তার মস্তিষ্কের ও শারীরিক গঠন ব্যাহত হয়। তার স্কুল কামাই হয়। বড় হয়ে সে আর দশটা সুস্থ মানুষের মতো উৎপাদনশীল নাগরিক হতে পারে না। ফলে জেনারেশনের পর জেনারেশন এই রোগের ফাঁদে আটকে থাকে। চিকিৎসা করাতে গিয়ে সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবার এক নিমেষে দরিদ্র হয়ে পড়ে।গরমে কি আসলেই মনোযোগ কমেএটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং বিতর্কিত একটি বিষয়। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে, অতিরিক্ত তাপমাত্রা মানুষের চিন্তাশক্তি ও শারীরিক উৎপাদনশীলতাকে সরাসরি প্রভাবিত করে।গরমে বেড়ে ওঠা শিশুরাহার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক জিসুং পার্ক ও তার দল যুক্তরাষ্ট্রের হাজার হাজার শিক্ষার্থীর ওপর একটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা চালান। সেখানে দেখা যায়, যেসব বছর গ্রীষ্মকালে পরীক্ষার দিনগুলোতে তাপমাত্রা বেশি ছিল, সেসব বছরের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার ফলাফল তুলনামূলক খারাপ হয়েছে।  গবেষণায় দেখা গেছে, তাপমাত্রা ২২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে চলে গেলে মানুষের মস্তিষ্কের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কমতে শুরু করে। আর তাপমাত্রা যখন ৩২ ডিগ্রি ছাড়িয়ে যায়, তখন মানুষের কাজের গতি ও মনোযোগ প্রায় ১৫ শতাংশ হ্রাস পায়।আমাদের দেশের দিকে তাকানো যাক। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক কারখানাগুলো বা প্রত্যন্ত অঞ্চলের সরকারি স্কুলগুলোতে গ্রীষ্মকালে যখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং চলে, তখন সেখানকার শ্রমিক ও শিক্ষার্থীদের অবস্থা কী হয়? ঘামে ভিজে, হাঁসফাঁস করতে করতে কি জটিল কোনো গণিত সমাধান করা বা সূক্ষ্ম কাজ করা সম্ভব?সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের একটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, তীব্র গরমের কারণে ২০২৪ সালে বাংলাদেশে উৎপাদনশীলতা বাবদ প্রায় ১.৭৮ বিলিয়ন ডলার ক্ষতি হয়েছে, যা দেশের মোট জিডিপির প্রায় ০.৪ শতাংশ। প্রতিবেদন অনুসারে, তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হলে কর্মক্ষমতা আশঙ্কাজনক হারে কমে যায়। স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের প্রভাষক ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ তানিয়া রহমান বলেন, “গরমে মানুষের মেজাজ খিটখিটে থাকে, ঘুমের মান নষ্ট হয়। রাতে ভালো ঘুম না হলে পরদিন মস্তিষ্কের কার্যকারিতা অর্ধেক কমে যায়। শীতের দেশের মানুষ এই দিক থেকে এক বিশাল প্রাকৃতিক সুবিধা পায়। আরামদায়ক ঠাণ্ডা আবহাওয়া তাদের দীর্ঘ সময় ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে মনোযোগ দিয়ে কাজ করতে সাহায্য করে।”উপনিবেশবাদের নীল নকশাভৌগোলিক কারণ কি তবে মানুষের নিয়তি? এখানেই তীব্র আপত্তি তুলেছেন আধুনিক কালের সেরা অর্থনীতিবিদেরা। ২০২৪ সালে অর্থনীতিতে নোবেল বিজয়ী তিন বিজ্ঞানী দারোন আসেমোগলু, জেমস রবিনসন ও সাইমন জনসন তাদের কালজয়ী গ্রন্থ ‘হোয়াই ন্যাশনস ফেইস’-এ দেখিয়েছেন, জলবায়ু কোনো চিরন্তন নিয়তি নয়। আসল ব্যবধানটা গড়ে দিয়েছে ‘ইতিহাস এবং প্রতিষ্ঠান’।ধনী দেশের চিত্র১৫০০ থেকে ১৯৫০ সালের মধ্যবর্তী সময়ে ইউরোপীয় শক্তিগুলো যখন বিশ্বজুড়ে তাদের উপনিবেশ স্থাপন করছিল, তখন তারা জলবায়ু দেখেই তাদের শোষণের ধরন নির্ধারণ করেছিল।বসতি স্থাপনকারী উপনিবেশকানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড বা আমেরিকার উত্তর অংশের জলবায়ু ছিল ইউরোপের মতোই শীতল। সেখানে রোগবালাইয়ের ভয় কম থাকায় ইউরোপীয়রা সপরিবারে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করেছিল। যেহেতু তারা সেখানে নিজেরা থাকবে, তাই তারা সেখানে এমন সব প্রতিষ্ঠান ও আইন তৈরি করল যা মানুষের অধিকার, সম্পত্তির অধিকার এবং শিক্ষার বিস্তার ঘটায়। এগুলোকে বলা হয় ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান’।লুণ্ঠনকারী উপনিবেশ গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চল যেমন সাব-সাহারান আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়া (যার মধ্যে বাংলাদেশও রয়েছে) ছিল গরম ও রোগবালাইয়ে পূর্ণ। এখানে ইউরোপীয়রা স্থায়ীভাবে থাকতে চায়নি। তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল এখান থেকে সোনা, রুপা, মসলা, নীল, তুলা ও চা লুটে নিজেদের দেশে নিয়ে যাওয়া। তাই তারা এখানে গড়ে তুলল ‘লুণ্ঠনকারী প্রতিষ্ঠান’। জমিদার প্রথা, জোরপূর্বক খাজনা আদায়, স্থানীয় কুটির শিল্প (যেমন আমাদের মসলিন) ধ্বংস করার মাধ্যমে তারা এই অঞ্চলের মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছিল।আজকে আমরা যে অনুন্নত শাসনব্যবস্থা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দুর্নীতির মুখোমুখি হই, তা আসলে সেই ঔপনিবেশিক লুণ্ঠনকারী ব্যবস্থারই রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার। বাংলার ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, মুঘল আমলে এই সুবে বাংলাকেই বলা হতো ‘জান্নাতুল বিলাত’ বা ‘পৃথিবীর স্বর্গ’।১৭৫৭ সালের আগেও বাংলার তাঁতি ও কৃষকদের সমৃদ্ধি দেখে বিশ্ব বিস্মিত হতো। তখনো এ দেশের জলবায়ু গরমই ছিল। কিন্তু তখনকার উন্নত উৎপাদন ব্যবস্থা ইংরেজদের কুখ্যাত শোষণে ধূলিসাৎ হয়ে যায়। অর্থাৎ, গরম আবহাওয়া আমাদের দরিদ্র করেনি, লুণ্ঠন ও শোষণের ইতিহাস আমাদের এই অবস্থায় এনে দাঁড় করিয়েছে।জেরেড ডায়মন্ডের তত্ত্বপুলিৎজার পুরস্কারজয়ী বিজ্ঞানী জেরেড ডায়মন্ড তার বিখ্যাত বই ‘গানস, জার্মস অ্যান্ড স্টিল’-এ এক অভিনব ভৌগোলিক তত্ত্ব দিয়েছেন। তার মতে, ইউরোপ ও এশিয়ার (ইউরেশিয়া) মানচিত্রটি পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তৃত। অন্যদিকে আফ্রিকা ও আমেরিকার মানচিত্র উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত।আগামীর বিশ্ব বদলে দেবে মানবসভ্যতার চিত্রপূর্ব-পশ্চিমে বিস্তৃত হওয়ায় ইউরেশিয়ার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তের অক্ষাংশ ও জলবায়ু প্রায় একই রকম ছিল। ফলে চীনের উদ্ভাবিত প্রযুক্তি, শস্য বা গৃহপালিত পশু সহজেই ইউরোপ বা ভারতে ছড়িয়ে পড়তে পেরেছিল। কিন্তু উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত আফ্রিকায় এক অঞ্চলের ফসল অন্য অঞ্চলের জলবায়ুর সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারত না।ফলে আফ্রিকার এক এলাকার প্রযুক্তি অন্য এলাকায় ছড়াতে হাজার বছর লেগে গেছে।পাশাপাশি, ইউরেশিয়ায় গরু, ঘোড়া, ভেড়া ও শূকরের মতো গৃহপালিত পশুর প্রাচুর্য ছিল। এদের সংস্পর্শে থেকে ইউরোপীয়দের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েছিল। এই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাই পরবর্তীতে ইউরোপীয়দের বিশ্বজয়ে সাহায্য করে, যখন তাদের নিয়ে যাওয়া জীবাণুতে আমেরিকার কোটি কোটি আদিবাসী মারা যায়।ডায়মন্ডের মতে, ইউরোপীয়রা জন্মগতভাবে বেশি বুদ্ধিমান ছিল না, তারা কেবল ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ইতিহাসের এক বিশেষ সুবিধা পেয়েছিল।মাটির পুষ্টি ও শক্তির অর্থনীতিবিজ্ঞান বলছে, মাটির উর্বরতার পেছনেও জলবায়ুর ভূমিকা রয়েছে। শীতপ্রধান অঞ্চলের মাটি তৈরি হয়েছে প্রাচীন হিমবাহের পলি দিয়ে, যা পুষ্টি উপাদানে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। অন্যদিকে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে এত ভারী বৃষ্টিপাত হয় যে, তা মাটির ওপরের স্তরের প্রয়োজনীয় পুষ্টি ধুয়ে নিয়ে যায়।ব্যতিক্রম শুধু আমাদের গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনার অববাহিকা, যেখানে প্রতি বছর নতুন পলি এসে মাটিকে উর্বর করে তোলে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে সেই আশীর্বাদই এখন অভিশাপ হয়ে দাঁড়াচ্ছে নিয়মিত বন্যা, খরা ও লবণাক্ততার কারণে। তাছাড়া, অষ্টাদশ শতাব্দীতে যখন শিল্পবিপ্লব শুরু হয়, তখন এর মূল জ্বালানি ছিল কয়লা। কয়লার খনিগুলো মূলত ইউরোপ ও আমেরিকার উত্তর অংশেই বেশি ছিল। শক্তির এই ভৌগোলিক প্রাচুর্যই তাদের শিল্পের দিক দিয়ে শত বছর এগিয়ে দেয়। আর গরমের দেশগুলো পরিণত হয় কেবল কাঁচামাল সরবরাহের সস্তা উৎসে।সিঙ্গাপুর কীভাবে ‘অভিশাপ’ কাটালোগ্রীষ্মমণ্ডলীয় আবহাওয়ার এই তথাকথিত অভিশাপকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে বেশ কিছু দেশ। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় উদাহরণ সিঙ্গাপুর। ঠিক নিরক্ষরেখার ওপরে অবস্থিত এই দ্বীপরাষ্ট্রটি একসময় ছিল তীব্র গরম, ম্যালেরিয়া আর দারিদ্র্যে জর্জরিত এক অনুন্নত বন্দর। ১৯৬৫ সালে যখন মালয়েশিয়া থেকে সিঙ্গাপুর আলাদা হয়ে যায়, তখন অনেকেই ভেবেছিলেন এই দেশ টিকবে না। কিন্তু দেশটির প্রতিষ্ঠাতা লি কুয়ান ইউ এক অবিশ্বাস্য বিপ্লব ঘটালেন। যাকে একবার প্রশ্ন করা হয়েছিল, বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার কোনটি? তিনি এক মুহূর্তও না ভেবে উত্তর দিয়েছিলেন ‘এয়ার কন্ডিশনার’ বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র। সিঙ্গাপুরের সরকারি অফিস, আদালত ও স্কুল-কলেজগুলোতে প্রথম দিন থেকেই এসি বাধ্যতামূলক করা হয়। লি কুয়ান ইউ জানতেন, গ্রীষ্মের গরমে মানুষের শারীরিক ও মানসিক কর্মক্ষমতা কমে যায়। এসি ব্যবহারের মাধ্যমে তারা ঘরের ভেতরের তাপমাত্রা ২১-২২ ডিগ্রিতে নামিয়ে আনেন, যা মানুষের সর্বোচ্চ কর্মদক্ষতার জন্য আদর্শ।উত্তর কেন ধনী, দক্ষিণ কেন দরিদ্র?তবে শুধু এসি নয়, সিঙ্গাপুর তার শিক্ষা ব্যবস্থায় বিপুল বিনিয়োগ করে, দুর্নীতিকে কঠোরভাবে দমন করে এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করে। অর্থাৎ, জলবায়ুর প্রতিকূলতাকে তারা প্রযুক্তি ও সুশাসনের মাধ্যমে জয় করেছে। একই পথ ধরে আজ তাইওয়ান ও দক্ষিণ কোরিয়াও বিশ্বের প্রথম সারির উন্নত দেশে পরিণত হয়েছে।বাংলাদেশের জন্য বার্তাজলবায়ুর এই বিভাজন আগামী দিনে আরও ভয়ঙ্কর রূপ নিতে চলেছে। আইপিসিসির সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলোতে বারবার সতর্ক করা হচ্ছে যে, গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সবচেয়ে বড় শিকার হবে আমাদের মতো গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দেশগুলো। অথচ এই উষ্ণায়নের জন্য আমাদের ঐতিহাসিক দায় নেই বললেই চলে।ভবিষ্যতের যেসব বিপদ কড়া নাড়ছে শ্রমিকদের কর্মক্ষমতা হ্রাস: তাপমাত্রা এভাবে বাড়তে থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ তার মোট কর্মঘণ্টার উল্লেখযোগ্য অংশ হারাবে। বিশেষ করে নির্মাণ শ্রমিক, কৃষক এবং রিকশাচালকরা দুপুরের তীব্র গরমে কাজ করতে পারবেন না।ওয়েট-বাল্ব তাপমাত্রার হুমকি: বাতাসে আর্দ্রতা ও তাপমাত্রা যদি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছায় (যাকে ওয়েট-বাল্ব তাপমাত্রা বলা হয়) যেখানে মানুষের শরীর আর ঘামের মাধ্যমে নিজেকে ঠাণ্ডা করতে পারে না, তবে ঘরের বাইরে কাজ করা মানুষের জন্য তা সরাসরি মৃত্যুর কারণ হতে পারে।কৃষি বিপর্যয়: অনিয়মিত বর্ষা এবং অসময়ের খরা আমাদের খাদ্য নিরাপত্তাকে চরম ঝুঁকিতে ফেলবে।নিয়তি বনাম লড়াই তুর্কি বংশোদ্ভূত মার্কিন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক দারোন আসেমোগলুর ভাষ্য হচ্ছে, “জলবায়ু কোনো নিয়তি নয়। সিঙ্গাপুর প্রমাণ করেছে যে সঠিক প্রতিষ্ঠান, বিজ্ঞান ও সুশাসন থাকলে পৃথিবীর সবচেয়ে উত্তপ্ত অঞ্চলও বিশ্বের শীর্ষে উঠতে পারে।”বাংলাদেশ এই নিয়তির কাছে আত্মসমর্পণ করতে পারে না। আমাদের তরুণ জনগোষ্ঠীর যে বিশাল জনমিতিক সুবিধা রয়েছে, তাকে কাজে লাগাতে হলে কিছু বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে:সবুজ নগর পরিকল্পনা: ঢাকা শহরের তাপমাত্রা আশেপাশের গ্রামীণ অঞ্চলের চেয়ে ৩ থেকে ৪ ডিগ্রি বেশি, যাকে বলা হয় ‘আরবান হিট আইল্যান্ড ইফেক্ট’। আমাদের দ্রুত নগরের ফাঁকা জায়গায় গাছ লাগাতে হবে। জলাশয়গুলো রক্ষা করতে হবে এবং ছাদবাগান বাধ্যতামূলক করতে হবে।ভূগোল কি প্রকৃতির বৈষম্য?শ্রমিকবান্ধব কাজের পরিবেশ: পোশাক কারখানা ও অন্যান্য কলকারখানায় ভেন্টিলেশন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করতে হবে। অতিরিক্ত গরমের দিনগুলোতে কাজের সময় পরিবর্তন করে সকাল বা সন্ধ্যায় নিয়ে যাওয়ার নীতি প্রণয়ন করা দরকার। শিক্ষায় বিনিয়োগ ও প্রযুক্তির ব্যবহার: স্কুল-কলেজগুলোর অবকাঠামো এমনভাবে তৈরি করতে হবে যেন গরমে শিক্ষার্থীরা ক্লাসে মনোনিবেশ করতে পারে। শিক্ষার মানোন্নয়ন ও গবেষণায় জিডিপির বরাদ্দ বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার: দুর্নীতি রোধ ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ছাড়া কোনো ভৌগোলিক সুবিধাই কাজে আসবে না। আমাদের ঐতিহাসিকভাবে পাওয়া শোষণমূলক প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে ভেঙে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জনবান্ধব করে তুলতে হবে।শীতের দেশে বিজ্ঞানীর প্রাচুর্য আর গরমের দেশে দারিদ্র্যের হাহাকার- এই দৃশ্যটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তৈরি হওয়া এক বৈষম্যের চিত্র। এর পেছনে জলবায়ুর যেমন ভূমিকা আছে, তার চেয়ে অনেক বেশি ভূমিকা আছে ইতিহাসের ট্র্যাজেডি আর ঔপনিবেশিক লুণ্ঠনের। কিন্তু আজ যখন আমরা একুশ শতকের এক চতুর্থভাগ পেরিয়ে ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে ভবিষ্যতের দিকে তাকাই, তখন বুঝতে পারি-প্রকৃতি আমাদের ওপর যে কর চাপিয়েছে, মানুষ তার মেধা, সুশাসন আর প্রযুক্তি দিয়ে তা শোধ করতে পারে। আবুল কাসেমদের ঘামঝরা ক্লান্ত দুপুরগুলোকে যদি আমরা সুপরিকল্পিত শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ল্যাবের উদ্ভাবনী শক্তিতে রূপান্তর করতে পারি, তবেই ঘুচবে উত্তর-দক্ষিণের এই হাজার বছরের বিভাজন।ভূগোল আমাদের পথ আগলাতে পারে, কিন্তু গন্তব্য নির্ধারণ করার ক্ষমতা কেবল আমাদেরই হাতে। লেখক: ভিডিও বিভাগ প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল