বিশ্ববাজারে ইতিহাসের সব রেকর্ড ভেঙে ফেলার পর হঠাৎ বড় ধরনের পতনের মুখে পড়েছে সোনার দাম। গত কয়েক মাস ধরে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবান এই ধাতুর দাম ক্রমাগত কমছে। এর মধ্যেই বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও ডলারের শক্তিশালী অবস্থানের কারণে সোনার দাম আরও ১৬ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে।

চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি আউন্স সোনার দাম ইতিহাসের সর্বোচ্চ ৫ হাজার ৫৯৫ ডলারে উঠেছিল। তবে সেই রেকর্ড ভাঙা দামের পর থেকে এখন পর্যন্ত সোনার দাম প্রায় ২৭ শতাংশ কমে গেছে। এর ফলে সোনা এখন আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বিয়ার মার্কেট’ বা মন্দার বাজারে প্রবেশ করেছে।

আরও পড়ুন

অস্থির সময়ে সোনায় বিনিয়োগ কি বুদ্ধিমানের কাজ?

সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, কোনো সম্পদের দাম যদি তার সাম্প্রতিক সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে খুব কম সময়ের মধ্যে ২০ শতাংশ বা তার বেশি কমে যায়, তবে তাকে মন্দার ক্ষেত্র বলা হয়। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দীর্ঘ সময় ধরে সোনার দাম একটানা বাড়ার পর বাজার এখন কিছুটা বিরতি নিচ্ছে। ফলে দাম আরও ১৬ শতাংশ কমে আউন্সপ্রতি ৩ হাজার ৪০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ ডলারের ঘরে নেমে আসতে পারে।

১ আউন্স = প্রায় ২.৪৩ ভরি

দরপতনের কারণ ও বিশ্লেষকদের মতামত

ভারতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বিনিয়োগ সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান জিওজিৎ ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের কমোডিটি রিসার্চ প্রধান হারীশ ভি এই বিষয়ে তার মতামত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদী দিক থেকে বিচার করলে সোনার বাজার এখনো ইতিবাচক। তবে গত এক থেকে দুই বছরে সোনার দাম যেভাবে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে, সেই তুলনায় এখন দাম কিছুটা কমে যাওয়া বা মূল্য সংশোধন হওয়া খুবই স্বাভাবিক ঘটনা।

তিনি অনুমান করছেন যে, সোনা আবার নতুন করে চাঙ্গা হওয়ার আগে এই দরপতন আউন্সপ্রতি ৩ হাজার ৪০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ ডলারের স্তরে গিয়ে থামতে পারে। সেখানে এটি একটি শক্ত ভিত্তি খুঁজে পাবে বলে তিনি মনে করেন।

চলতি বছরে সোনার এই বড় পতনের পেছনে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এক ধরনের দ্বিমুখী আঘাত হিসেবে কাজ করছে। একদিকে বাজারে তেলের দাম বেশি হওয়ায় বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি ও মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার বৃদ্ধির চিন্তা বাড়ছে। অন্যদিকে, মার্কিন ডলারের মান বাড়ার কারণে অন্যান্য দেশের মুদ্রার ক্রেতাদের কাছে সোনা কেনার আকর্ষণ কমে গেছে।

আরও পড়ুন

সোনার দামে রেকর্ড পতন, এই সুযোগ থাকবে কতদিন?

শুধু গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে হিসাব করলে আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম ২৩ শতাংশ ক্র্যাশ করেছে বা ধসে গেছে। আজকেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে নতুন করে পাল্টাপাল্টি হামলা হওয়ার পর তেলের দাম ৪ শতাংশ বেড়েছে। আর এর ফলেই আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম ১.৫ শতাংশ কমে ৪ হাজার ৫৭ ডলারে নেমে এসেছে।

স্যামকো সিকিউরিটিজের রিসার্চ প্রধান অপূর্ব শেঠ বলেন, সোনার দাম ধরে রাখার জন্য ৪ হাজার ০০০ ডলারের স্তরটি একটি অত্যন্ত জরুরি ও প্রধান ভিত্তি। তবে বাজার যদি সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে পড়ে বা কোনো কারণে সাময়িক আতঙ্ক তৈরি হয়, তবে দাম ৩ হাজার ৫০০ ডলারেও নেমে যেতে পারে।

দাম কমার অন্যান্য কারণ

সোনার দামের পতন ঠেকিয়ে রাখার আরেকটি বড় কারণ হলো বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সোনা কেনা। হারীশ ভি বলেন, অনেক দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের রিজার্ভের জন্য সোনা জমা করা অব্যাহত রেখেছে। এটি প্রমাণ করে যে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি চাপের মুখে থাকবে ও এই পরিস্থিতিতে সোনা একটি নিরাপদ আশ্রয় বা ‘সেফ-হ্যাভেন’ সম্পদ হিসেবেই সবার প্রথম পছন্দ।

এইচএসবিসি জানিয়েছে, উচ্চ মূল্যের কারণে গত বছর ও চলতি বছরের প্রথমার্ধে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সোনা কেনা কিছুটা সীমিত করলেও দীর্ঘমেয়াদে দামের একটি সর্বনিম্ন সীমা ধরে রাখতে তারা মূল ভূমিকা পালন করবে।

ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের (ডব্লিউজিসি) ২০২৬ সালের জুন মাসের জরিপ অনুসারে, আগামী ১২ মাসে বিশ্বব্যাপী কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো তাদের সোনার রিজার্ভ আরও বাড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে। সংকটের সময় সোনার ভালো পারফরম্যান্স, দীর্ঘমেয়াদী মূল্যের স্থায়িত্ব ও তহবিলের বৈচিত্র্যকরণ সোনাকে বিনিয়োগের জন্য আকর্ষণীয় করে তুলেছে। ডব্লিউজিসির তথ্যমতে, গত এক দশকের গড় ৫০০ টনের তুলনায় গত চার বছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো বছরে গড়ে ১ হাজার টন সোনা সংগ্রহ করেছে।

ইনভেসেট পিএমএস-এর বিজনেস হেড হর্ষল দশানী দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যমাত্রা সম্পর্কে বলেন, আগামী ১২ মাসের মধ্যে সোনার দাম ৪ হাজার ৭০০ থেকে ৫ হাজার ২০০ ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে। এর পেছনে কাজ করছে ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর রেকর্ড ৩৩৭ টন সোনা কেনা, যুক্তরাষ্ট্রের মোট ফেডারেল ঋণ জিডিপির প্রায় ১২৫ শতাংশে পৌঁছানো, উন্নত বাজারগুলোর আর্থিক অবস্থার অবনতি ও ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণ। তার মতে, সোনার দাম যদি ৩ হাজার ৯০০ থেকে ৪ হাজার ডলারের ঘরে নেমে আসে, তবে তা সোনা কেনার দারুণ সুযোগ।

সূত্র: বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (ভারত)

এসএএইচ