মিয়ানমারের সামরিক জান্তা সরকারের হাতে বন্দি দেশটির গণতন্ত্রকামী নেত্রী অং সান সু চির কোনো খোঁজ মিলছে না অনেকদিন ধরে। পাঁচ বছর আগে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তার সরকারকে উৎখাত করা হয়। এরপর থেকেই কারাবন্দি তিনি। বর্তমানে ৮১ বছর বয়সী এই নেত্রী আদৌ বেঁচে রয়েছেন কি না, তা নিয়ে গভীর সংশয় দেখা দিয়েছে। বিশ্বজুড়ে এখন একটাই প্রশ্ন—সু চি কি বেঁচে আছেন, নাকি মারা গেছেন?

ছেলের আকুতি: ‘প্রমাণ দেন’

সু চির ছেলে কিম আরিস কয়েক মাস ধরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ঘুরছেন। তিনি বিভিন্ন দেশের প্রেসিডেন্ট ও মন্ত্রীদের কাছে একটিই দাবি জানাচ্ছেন। তা হলো, মিয়ানমারের সামরিক সরকার যেন সু চির বেঁচে থাকার প্রমাণ (প্রুফ অব লাইফ) দেয়।

২০২২ সালের শেষের দিকে সু চির শেষ আনুষ্ঠানিক উপস্থিতি দেখা গিয়েছিল। এরপর থেকে তার আইনজীবীদেরও তার সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি। সম্প্রতি সু চির ১৫ বছর বয়সী প্রিয় কুকুর ‘তাইচিতো’ ইয়াঙ্গুনের বাড়িতে মারা গেছে। সু চি যখন ২০১০ সালে কারামুক্ত হন, তখন ছেলে কিম আরিস তাকে কুকুরটি উপহার দিয়েছিলেন। শেষ দিন পর্যন্ত বিশ্বস্ত কুকুরটি সু চির ফেরার অপেক্ষায় ছিল।

আরও পড়ুন

অং সান সুচি ৫ বছর পর কারামুক্ত, থাকবেন গৃহবন্দি

নোবেলজয়ী থেকে বন্দিজীবন

অং সান সু চি বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত রাজনৈতিক বন্দি। আশির দশক থেকে শুরু করে ২০১০ সাল পর্যন্ত তিনি মিয়ানমারের সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে অহিংস আন্দোলন করে দীর্ঘ সময় গৃহবন্দি ছিলেন। ১৯৯১ সালে তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কার পান।

২০১৫ সালে তার দল ক্ষমতায় আসার পর রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর সামরিক বাহিনীর নির্যাতনের পক্ষে সাফাই গাইলে সু চির আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ন হয়। এরপর ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সামরিক জান্তা আবার ক্ষমতা দখল করে এবং সু চিকে কারাগারে পাঠায়।

চলতি বছরের এপ্রিলে জান্তা সরকার দাবি করেছিল, সু চিকে কারাগার থেকে সরিয়ে গৃহবন্দি করা হয়েছে। তবে কূটনীতিকদের তার সঙ্গে দেখা করার অনুরোধ বারবার প্রত্যাখ্যান করা হচ্ছে। কূটনীতিকেরা সু চির অবস্থা জানতে চাইলে জান্তা কর্মকর্তারা কেবল বলেন, তিনি ‘ভালো আছেন’।

মিয়ানমারের সামরিক অভ্যুত্থানের নেতা সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইং গত মার্চে নিজেকে দেশের প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেন। সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিী এবং জাতিসংঘের বিশেষ দূত জুলি বিশপ তার সঙ্গে বৈঠকে সু চির প্রসঙ্গ তোলেন। কূটনীতিকদের মতে, সু চির নাম শুনলেই প্রচণ্ড ক্ষোভে ফেটে পড়েন জান্তা প্রধান।

আরও পড়ুন

‘বিদ্রোহীরা ব্যবহার করে’ বলে মিয়ানমারে স্যানিটারি প্যাড নিষিদ্ধ!

বেঁচে থাকা নিয়ে গভীর সংশয়

জান্তা প্রধানের এমন প্রতিক্রিয়া দেখে কূটনীতিকদের একাংশের আশঙ্কা, সু চি হয়তো আর বেঁচে নেই অথবা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক অবস্থায় আছেন। যে কারণে জান্তা সরকার তার বেঁচে থাকার প্রমাণ দিতে পারছে না।

অবশ্য লন্ডনের ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের মিয়ানমার বিশেষজ্ঞ মরগান মাইকেলস ভিন্ন কথা বলছেন। তার মতে, সু চির মৃত্যুর মতো বড় খবর গোপন রাখা অসম্ভব। জান্তা প্রধানের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক বিদ্বেষের কারণেই সু চিকে এভাবে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে রাখা হতে পারে।

জান্তার ভয়

মিয়ানমারের অ্যাসিস্ট্যান্স অ্যাসোসিয়েশন ফর পলিটিক্যাল প্রিজনার্স (এএপিপি) জানিয়েছে, দেশটিতে বর্তমানে ১৪ হাজার ৫১৭ জন রাজনৈতিক বন্দি রয়েছেন। চলতি বছরেই কারাগারে চিকিৎসাবঞ্চিত হয়ে ৬০ জনের বেশি রাজনৈতিক বন্দি মারা গেছেন।

সু চি কারাগারে অযান্য সাধারণ বন্দিদের মতোই মানবেতর পরিস্থিতিতে রয়েছেন। অন্য বন্দিরা সুবিধা পায় না বলে তিনি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত (এসি) সেলে থাকতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন বলে জানা গেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামরিক জান্তা বাহিনী সশস্ত্র বিদ্রোহের চেয়ে সু চির অহিংস আন্দোলনকে বেশি ভয় পায়। সু চিকে মুক্তি দিলে বা তার খোঁজ মিললে দেশের জনগণের অবাধ্যতা আন্দোলন আবার তীব্র হতে পারে, যা জান্তার ক্ষমতাকে নাড়িয়ে দেবে। এই ভয়ের কারণেই হয়তো সু চিকে পৃথিবীর নজর থেকে পুরোপুরি আড়াল করে রাখা হয়েছে।

সূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট
কেএএ/